আশা ভোঁসলে : বলিউডের কণ্ঠের মহাপ্রয়াণ

Date:

একজন কিংবদন্তি শিল্পী প্রয়াত হলেন। আশা ভোঁসলে ছিলেন ভারতীয় সংস্কৃতির প্রতীক। তিনি ৯২ বছর বয়সে মারা গেলেন। বহুবার তাঁর মৃত্যুর গুজব ছড়ালেও এবার খবরটি নিশ্চিত করেছেন তাঁর ছেলে।

ভারতীয় চলচ্চিত্রের প্লেব্যাক গানের অপ্রতিদ্বন্দ্বী এই সম্রাজ্ঞী হার্ট অ্যাটাক করেছিলেন। মুম্বাইয়ের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর কাজের জীবন আট দশকেরও বেশি দীর্ঘ। ১২,০০০-এরও বেশি গানের ভাণ্ডার নিয়ে তাঁর এই প্রস্থানে বলিউড সংগীতের একটি যুগের অবসান ঘটালো।

ভারতীয় চলচ্চিত্রের অনন্য সব অভিনেত্রী আশা ভোঁসলের কন্ঠে ঠোঁট মেলাতেন অবিস্মরণীয় সব গানে। বলিউডে তার ব্যাপক উপস্থিতির সম্মানে ১৯৯৭ সালে ইংরেজি ইন্ডি রক ব্যান্ড কর্নারশপ (Cornershop) তাদের জনপ্রিয় গান ‘ব্রিমফুল অফ আশা’ (Brimful of Asha) নির্মাণ করে। ব্রিটিশ সঙ্গীতশিল্পী বয় জর্জের (Boy George) সাথে যৌথ কাজ তাঁকে আন্তর্জাতিক সম্মান এনে দিয়েছিলো।

আশার কণ্ঠের সংক্রামক জাদুতে শ্রোতা ভক্তরা আনন্দে নাচতো গাইতো। এভাবেই তাঁর গান হয়ে উঠেছিল কয়েক প্রজন্মের বন্ধু। এই মহান শিল্পীর মৃত্যুর খবরে সোশ্যাল মিডিয়ায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। অজস্র মানুষ শ্রদ্ধা নিবেদন করছেন। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী তাঁকে “ভারতের অন্যতম আইকনিক এবং বহুমুখী কণ্ঠস্বর” বলেছেন। এক্স-এ (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, তাঁর “অসাধারণ সঙ্গীত যাত্রা” দেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে সমৃদ্ধ করেছে এবং “বিশ্বের অগণিত মানুষের হৃদয়” জয় করেছে।

অভিনেত্রী ও রাজনীতিবিদ হেমা মালিনী তাঁর শোক প্রকাশ করে বলেন, গায়িকার এই মৃত্যু “আমার জন্য বিশেষভাবে কষ্টের কারণ আশা-জির সাথে আমার সম্পর্ক বিশুদ্ধ আবেগের—তিনি তাঁর অনন্য কণ্ঠ ও শৈলী দিয়ে আমার অভিনীত চলচ্চিত্রের অনেক গানকে অত্যন্ত জনপ্রিয় করে তুলেছেন।”
সুরকার শঙ্কর মহাদেবন বলেন, “আজ প্রতিটি ভারতীয় সুরপ্রেমীর হৃদয় ভেঙে গেছে।” তিনি আরও যোগ করেন , “যতদিন মানবসভ্যতা টিকে থাকবে” ততদিন “কখনো বিলীন হবে না” আশা’র সুর। “তাঁর অবিশ্বাস্য কণ্ঠস্বর সারা বিশ্বে প্রতিধ্বনিত হয়ে তিনি চিরকাল বেঁচে থাকবেন।” – এই বাক্যের মধ্য দিয়ে মহাদেবন তাঁর শ্রদ্ধা জানান।
এই শ্রদ্ধাঞ্জলিগুলো আশা ভোঁসলের অসাধারণ শিল্পসত্তার প্রতি এক ব্যাপক স্বীকৃতিরই প্রতিফলন। রোমান্টিক ধীরলয়ের গান থেকে শুরু করে তারুণ্যে উজ্জ্বল ও প্রাণ চঞ্চল গান—সবকিছুতেই সমান দক্ষ ছিলেন আশা। তাই সব ধরনের সুরকারদের কাছে হয়ে উঠেছিলেন প্রধান নির্ভরতা।

তাঁর কণ্ঠের ব্যাপ্তি এবং প্রাণবন্ত শৈলী প্রত্যেক গানকে এক উৎসবে পরিণত করেছিল। কয়েক প্রজন্ম ধরে বলিউডের সুরের সত্যিকারের সংজ্ঞা তৈরি করেছে তাঁর গায়ন ভঙ্গি। ‘দম মারো দম’ থেকে শুরু করে ‘পিয়া তু আব তো আজা’ পর্যন্ত তাঁর বহুমুখীতা ছিল অসীম। তিসরি মঞ্জিল, কাফেলা, ইয়াদোঁ কি বারাত, ইজাজত এবং সাগরের মতো চলচ্চিত্রে তাঁর স্মরণীয় কাজ রয়েছে। কিংবদন্তি সুরকার খৈয়ামের সুরে ‘উমরাও জান’-কে তাঁর ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা কাজ হিসেবে গণ্য করা হয়।

সহোদরা লতা মঙ্গেশকরের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা এক নিজস্ব পথ তৈরি করেছিলেন ভোঁসলে। যেখানে মঙ্গেশকর ছিলেন শাস্ত্রীয় আভিজাত্য এবং নিখুঁত গায়কীর প্রতীক, সেখানে ভোঁসলে তাঁর গানে সাহসী আর গতিশীল ।

সুরকার রাহুল দেব বর্মনের সাথে ভোঁসলের জুটি ছিল বলিউডের অন্যতম আইকনিক সমন্বয়। তাঁদের সুরের জগৎ এই শিল্পে বিপ্লব ঘটিয়েছিল। বর্মনের পরীক্ষামূলক ও বৈচিত্র্যময় সুরের সাথে তাঁর কণ্ঠ ছিল একদম যুৎসই, যার ফলে তৈরি হয়েছে অজস্র কালজয়ী গান—তা সে বিষণ্ণ সুরই হোক বা উচ্ছ্বল কোনো সুর। ভোঁসলে এবং বর্মন পঁচিশ বছরেরও বেশি সময় ধরে এক অসাধারণ সংগীতের উত্তরাধিকার তৈরি করেছেন। আশা একবার স্মৃতিচারণ করে বলেছিলেন, বর্মনই তাঁর ভেতরের সেরা প্রতিভাকে বের করে এনেছিলেন। ২০২৩ সালে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “কেবল পঞ্চমই [বর্মনের আদর করে ডাকা নাম] গায়িকা হিসেবে আমার কণ্ঠের ব্যাপ্তিকে আবিষ্কার করেছেন। পঞ্চম যতক্ষণ না আমাকে আমার নিজের কণ্ঠের গভীরতা খুঁজতে শিখিয়েছেন… ততক্ষণ আমি জানতামই না যে আমার গলায় এতোটা নমনীয়তা আছে।”

১৯৩৩ সালের ৮ সেপ্টেম্বর মহারাষ্ট্রের গোয়ারে জন্মগ্রহণ করা আশা ভোঁসলে বিখ্যাত মঙ্গেশকর পরিবারের সন্তান ছিলেন। অভিনেতা ও শাস্ত্রীয় সংগীতশিল্পী বাবা দীননাথ মঙ্গেশকর। তাঁর সাহচর্যে সাঙ্গীতিক পরিবেশে বেড়ে ওঠা আশার সংগীতযাত্রা শুরু হয় খুব অল্প বয়সেই। ১৯৪৩ সালে মারাঠি চলচ্চিত্র ‘মঝা বাল’-এর মাধ্যমে তিনি তাঁর প্রথম গানটি গেয়েছিলেন। পঞ্চাশ আর ষাটের দশকে তাঁর কর্মজীবন সাফল্যের চূড়ায় পৌঁছায়। তিনি চলচ্চিত্র, গজল, ভজন, কাওয়ালি ও পপসহ বিভিন্ন ধারার গানে একজন বহুমুখী শিল্পী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। ওপি নায়ার, আর ডি বর্মন এবং এসডি বর্মনের সাথে তাঁর কাজগুলো তাঁকে ঘরে ঘরে পরিচিত করে তোলে। ‘আইয়ে মেহেরবান’ (১৯৫৮), ‘পর্দে মে রেহনে দো’ (১৯৬৮) এবং ‘দম মারো দম’ (১৯৭১)-এর মতো জনপ্রিয় গানগুলো তাঁর কর্মযজ্ঞের কয়েকটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ মাত্র।মোহাম্মদ রফি, কিশোর কুমার এবং মান্না দে-র মতো কিংবদন্তিদের সাথে তাঁর গাওয়া দ্বৈত গানগুলো চিরকালের ধ্রুপদী সৃষ্টি। ভোঁসলের ব্যক্তিগত জীবনও তাঁর কর্মজীবনের মতোই ঘটনাবহুল।

মাত্র ষোলো বছর বয়সে তিনি প্রতিবেশী গণপতরাও ভোঁসলের সাথে পালিয়ে বিয়ে করেন। অসুখী, অস্থির দাম্পত্য জীবনের সমাপ্তি ঘটে বিচ্ছেদে। মঙ্গেশকর পরবর্তীতে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে জানান, গণপতরাও তাঁকে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছিলেন এবং বছরের পর বছর যোগাযোগ করতে দেননি। ফিল্ম হিস্টোরিয়ান নাসরিন মুন্নি কবিরের কাছে মঙ্গেশকর বলেন, গণপতরাও তাঁর প্রতিভাকে কাজে লাগিয়ে মুনাফা করার আশায় তাঁকে বিভিন্ন সংগীত পরিচালকদের কাছে নিয়ে যেতেন। তাঁর ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতেন। এইসব আচরণ তাঁকে চরম দুর্দশার মুখে ফেলেছিল।

১৯৬০ সালে আশা তাঁর স্বামীকে ত্যাগ করেন। তখন তিনি তিন সন্তান নিয়ে সিঙ্গেল মাদার। পরবর্তীতে তিনি রাহুল দেব বর্মনের সাথে জুটি বাঁধেন। ১৯৮০ সালে তারা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। ১৯৯৪ সালে ৫৪ বছর বয়সে বর্মণ মৃত্যুবরণ করেন।

আশা প্রায় ধারাবাহিক ভাবেই তাঁর বোনের সাথে তুলনার সম্মুখীন হতেন। এটি তাঁদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতার গুজবকে উসকে দিত। দুই বোন একই ভবনে বসবাস করা এবং তাঁদের মধ্যে হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও, কেউ কেউ দাবি করেন, বড় বোন লতা ছোটো বোনের ক্যারিয়ারে বাধা সৃষ্টি করেছিলেন। আশা নিজেও একবার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, বোনের সাহায্য পেলে তিনি আরও আগে উন্নতি করতে পারতেন। লতা অবশ্য তাঁদের মধ্যকার এই দূরত্বের জন্য বোনের স্বামীর প্রভাবকে দায়ী করেছিলেন। যদিও জনমানসে এই প্রতিদ্বন্দ্বিতার ধারণাটি এখনো টিকে আছে৷ তবে অনেকের মতে এটিকে অতিরঞ্জিত করা হয়েছে।
১৯৭১ সালে ভোঁসলে চলচ্চিত্র সাহিত্যিক রাজু ভারতনকে বলেছিলেন: “দিনশেষে আমরা দুজনেই সংগীতের উত্তরাধিকার… এবং আশীর্বাদ পেয়েছি। এতে কোনো সন্দেহ নেই যে দিদি [হিন্দিতে বড় বোন] আমার চেয়ে এগিয়ে থেকে শুরু করেছিলেন, কিন্তু সেটি আমাকে তার সমকক্ষ হওয়ার জন্য আরও বেশি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ করে তুলেছিল।” নিত্য পরিবর্তনশীল সংগীত শৈলীর সাথে নিজের কণ্ঠকে মানিয়ে নেওয়ার অসাধারণ ক্ষমতার জন্য ভোঁসলে সমাদৃত ছিলেন।
বছরের পর বছর ধরে তিনি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পপ শিল্পীদের সাথে কাজ করেছেন।

ক্রিকেটের প্রতি আশার ভালোবাসা সবার জানা। এই খেলাটি ছিল তার অন্যতম প্রিয় শখ। ২০০৭ সালে অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটার ব্রেট লির সাথে তাঁর যৌথ কাজ ছিল এক চমৎকার মুহূর্ত। তাঁরা ‘ইউ আর দ্য ওয়ান ফর মি’ (You’re the One for Me) গানটির জন্য একসঙ্গে কাজ করেছিলেন, যা ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগের (আইপিএল) উদ্বোধনী আসরে প্রদর্শিত হয়েছিল। তাঁর জীবনী গ্রন্থ লেখক ভারতন লিখেছেন, “আশার সাথে যেকোনো সাক্ষাৎ মানেই যেন একটি টক শো। অবশ্যই তিনিই সব কথা বলবেন, কেবল গান গাওয়ার জন্যই কথার সেই স্রোতে বিরতি দেবেন। আপনি তাকে নিয়ে যতটা খুশি মজা করতে পারতেন—তিনি একজন উদার মনের মানুষের মতো তা হাসিমুখে মেনে নিতেন।”

২০২৩ সালে দুবাইয়ে একটি লাইভ কনসার্টের মাধ্যমে ভোঁসলে তাঁর ৯০তম জন্মদিন উদযাপন করেন। অনুষ্ঠানের আগে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “৯০ বছর বয়সে মঞ্চে তিন ঘণ্টা দাঁড়িয়ে গান গাইতে পারা একটি আশীর্বাদ।” আশা কখনোই কাজ থামিয়ে দেননি। ২০২০ সালে তিনি অনলাইন ট্যালেন্ট শো ‘আশা কি আশা’ চালু করেন। নাতনি জানাইয়ের উৎসাহে একটি ইউটিউব চ্যানেলও শুরু করেন। এখানে তিনি তাঁর কর্মজীবনের গল্প বলতেন। তাঁর ১,৬০,০০০-এর বেশি সাবস্ক্রাইবার রয়েছে।
২০২৩ সালে ভোঁসলে বলেছিলেন, ” সংগীতই আমার নিঃশ্বাস। আমি সারা জীবন এই ভাবনা নিয়েই কাটিয়েছি। আমি গানকে অনেক কিছু দিয়েছি। কঠিন সময়গুলো পার করে আসতে পেরে আমার ভালো লাগছে। অনেক সময় আমার মনে হয়েছে আমি টিকে থাকতে পারব না, কিন্তু আমি পেরেছি।”
তাঁর শেষ রেকর্ড করা গানগুলোর একটিতে তিনি ব্রিটিশ ভার্চুয়াল ব্যান্ড গোরিলাজ (Gorillaz)-এর সাথে তাদের ২০২৬ সালের অ্যালবাম ‘দ্য মাউন্টেন’-এ কাজ করেন, যার কেন্দ্র ভাবনা শোক এবং মরণশীলতা।

‘দ্য শ্যাডোয়ি লাইট’ (The Shadowy Light) নাম সেই ট্র্যাকের। একদল আন্তর্জাতিক সংগীতশিল্পীর সাথে তাঁর চিরচেনা কণ্ঠস্বর মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছিল। একজন মাঝির অজানার উদ্দেশ্যে আত্মা নিয়ে যাওয়ার দৃশ্যটি মৃত্যু এবং পরকালকে ফুটিয়ে তোলার রূপক হিসেবে ব্যবহৃত। এই যৌথ কাজ বলিউডি সঙ্গীতের স্বর আশা ভোঁসলের কর্মজীবনের একটি শক্তিশালী সমাপ্তি হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে।
গানের ধারা, দেশের সীমানা এবং সময়ের মতো নিত্য পরিবর্তনশীল প্রাকৃতিক ঘটনাকে অতিক্রম করবার চিরস্থায়ী ক্ষমতা তাঁর সহজাত বিদ্যা। এই বিপুল জীবন তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। দু:খ, ব্যথা সয়েও জীবনের পথে তিনি স্থির ছিলেন। সম্রাজ্ঞীর মতোই তাঁর এই প্রয়াণ ভারতীয় উপমহাদেশ স্মরণে রাখবে।

( বিবিসি’র বারো এপ্রিল প্রকাশিত নিবন্ধ অবলম্বনে)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Share post:

সাবস্ক্রাইব

spot_img

সম্পাদকের নির্বাচিত

আরও পড়ুন
আরও পড়ুন

রঘু রাই : প্রণম্য আলোকচিত্রীর মহাপ্রয়াণ

এই লেখাটি যখন লিখছি প্রণম্য আলোকচিত্রী রঘু রাইয়ের নশ্বর...

আর্টেমিস টু চন্দ্রাভিযান সম্পর্কে আমাদের যা জানা দরকার

আর্টেমিস ২-এর নভোচারীরা চাঁদের বাঁকা প্রান্তের আড়ালে পৃথিবীকে ডুবে...