দুর্গা ও মহিষাসুরের যুদ্ধ: হিন্দু পুরানের পৌরাণিক কাহিনি

Share post:

Date:

হিন্দু পুরাণের অন্যতম বিখ্যাত কাহিনি হলো দেবী দুর্গা ও মহিষাসুরের যুদ্ধ। এই যুদ্ধ প্রকৃত পক্ষে দেবতা ও অসুরের মধ্যকার যুদ্ধ। প্রচণ্ড এই যুদ্ধে দেবী দুর্গা মহিষাসুরকে পরাজিত করেন।

কিন্তু কীভাবে শুরু হয়েছিল এই যুদ্ধ? কে ছিল এই মহিষাসুর? কেনো তিনি ছিলেন অপরাজিত? কেন দেবতারা পর্যন্ত তাঁকে পরাজিত করতে পারেননি? আর কীভাবে দেবী দুর্গার আবির্ভাব ঘটেছিল? শেষ পর্যন্ত কীভাবে পরাজিত হলো মহিষাসুর?

এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায় হিন্দু ধর্মের বিভিন্ন পৌরাণিক গ্রন্থে। বিশেষ করে দেবীমাহাত্ম্য বা চণ্ডী গ্রন্থে মহিষাসুরবধের কাহিনি বিস্তারিতভাবে বর্ণিত হয়েছে।

দূর্গা ও মহিষাসুরের যুদ্ধ
দূর্গা ও মহিষাসুরের যুদ্ধের কাল্পনীক ছবি, ছবি: Anondobazar

মহিষাসুরের পরিচয়

হিন্দু পুরাণে মহিষাসুরের পরিচিতির প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো অসাধারণ শক্তি এবং মহিষের রূপ ধারণ করার ক্ষমতা।

পুরাণের কাহিনিতে মহিষাসুরকে অত্যন্ত ক্ষমতাবান ও উচ্চাকাঙ্ক্ষী হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। তিনি নিজের শক্তি বৃদ্ধির পাশাপাশি দেবতাদের ওপরও আধিপত্য করতে চেয়েছিলেন।

এই লক্ষ্যেই তিনি কঠোর তপস্যা শুরু করেন। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল দেবতাদের কাছ থেকে এমন বর লাভ করা, যার মাধ্যমে তিনি অমর হয়ে উঠতে পারেন।

মহিষাসুরের উত্থান

পৌরাণিক কাহিনি অনুযায়ী, মহিষাসুরের কঠোর তপস্যায় মহাদেব ব্রহ্মা সন্তুষ্ট হয়ে তাঁর সামনে উপস্থিত হন। ব্রহ্মা তার কাছে এই কঠোর তপস্যার কারন জানতে চান, এবং তাঁকে বর চাইতে বলেন। মহিষাসুর তন ব্রহ্মার কাছে অমরত্বের বর প্রার্থনা করেন।

কিন্তু অমরত্ব দেওয়া সম্ভব নয় বলে ব্রহ্মা অপারগতা প্রকাশ করেন এবং অন্য বর চাইতে বলেন। চতুর মহিষাসুর তখন বর চান, যেন কোনো পুরুষ মানুষ তাকে হত্যা করতে না পারে।

আরও পড়ুন: ঢাকার ধামরাইয়ের রথের মেলার ইতিহাস ও ঐতিহ্য অনুসন্ধান

মহিষাসুর মনে করেছিলেন, কোনো নারী তাঁকে কখনো পরাজিত করতে পারবে না। আর পুরুষ মানুষ যদি হত্যা করতে না পারে তাহলে তাহলে তিনি এক অর্থে অমরই লাভ করবেন।  তাই এই বর পাওয়ার পর তাঁর আত্মবিশ্বাস বহুগুণ বেড়ে যায়।

কিন্তু এই আত্মবিশ্বাস এক সময় ধীরে ধীরে অহংকারে পরিণত হয়। তিনি নিজের ক্ষমতার অপব্যবহার শুরু করেন এবং দেবতাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন।

দূর্গা ও মহিষাসুরের যুদ্ধ
দূর্গা ও মহিষাসুরের যুদ্ধের কাল্পনীক ছবি, ছবি: The House Of Ram

স্বর্গ-মর্ত দখল

বরলাভের পর মহিষাসুর তার শক্তিশালী বাহিনী নিয়ে মর্ত দখল করে ফেলেন। এমন কি তার ভয়াবহ সংঘর্ষে দেবতারা পর্যন্ত পরাজিত হন। তিনি স্বর্গ দখল করে দেবরাজ ইন্দ্রকেও সিংহাসনচ্যুত করেন।

এর ফলে দেবতারা স্বর্গরাজ্য থেকে বিতাড়িত হন। তারা নিজেদের আবাসস্থল ও ক্ষমতা হারান। তারা পালিয়ে বেড়াতে থাকেন। মহিষাসুর স্বর্গে তার আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেন।

আরও পড়ুন: শিলাইদহঃ প্রসঙ্গ রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়, রবীন্দ্র একাডেমী ও পর্যটন কেন্দ্র

পরাজিত দেবতারা তখন তিন মহাদেব ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও শিবের কাছে সাহায্য চান। তাঁরা বুঝতে পারেন, মহিষাসুরকে পরাজিত করতে হলে এমন এক শক্তির প্রয়োজন, যিনি তাঁর বরকে অতিক্রম করতে পারবেন।

যেহেতু কোনো পুরুষ মহিষাসুরকে পরাজিত ও হত্যা করতে পারবে না কাজেই কেবল মাত্র একজন নারীর পক্ষেই তাঁকে পরাজিত ও হত্যা করা সম্ভব। এই পরিস্থিতিতে দেবতারা কঠোর তপস্যায় বসলেন।

দূর্গা ও মহিষাসুরের যুদ্ধ
দূর্গা ও মহিষাসুরের যুদ্ধের কাল্পনীক ছবি, ছবি: Hindu Mirror

দেবী দূর্গার আর্বিভাব

দেবীমাহাত্ম্য অনুসারে, দেবতাদের সম্মিলিত তেজ ও শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ করে এক মহাশক্তির আবির্ভাব ঘটালেন। তিনিই দেবী দুর্গা।

বিভিন্ন দেবতার শক্তি মিলিত হয়ে তাঁর ঐশ্বরিক রূপ গঠন করে। এইভাবে দেবী হয়ে ওঠেন অসীম শক্তির অধিকারী।

দশজন প্রধান দেবতা তাদের মহাশক্তিশালী অস্ত্র দেবীকে দান করলেন।

দেবতারা তাঁকে নানা অস্ত্র উপহার দেন। শিব দেন ত্রিশূল, বিষ্ণু দেন সুদর্শন চক্র এবং ইন্দ্র দেন বজ্র।

অন্যান্য দেবতার কাছ থেকেও তিনি বিভিন্ন অস্ত্র ও অলংকার লাভ করেন। দেবী তার দশ হাতে এই অস্ত্র গ্রহণ করলেন।

এই রূপ তাঁর বহুমুখী শক্তির প্রতীক। তাঁর বাহন সিংহ, যা সাহস ও বীরত্বের পরিচায়ক হিসেবে বিবেচিত হয়।

দেবীর আবির্ভাবের মধ্য দিয়ে পুরাণে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা তুলে ধরা হয়েছে। সম্মিলিত শক্তি অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে। মহিষাসুরের মতো শক্তিশালী প্রতিপক্ষের মোকাবিলায় দেবতাদের সম্মিলিত শক্তিই দুর্গার রূপ নেয়।

দূর্গা ও মহিষাসুরের যুদ্ধ
দূর্গা ও মহিষাসুরের যুদ্ধের কাল্পনীক ছবি, ছবি: Sangbad Protidin

দেবী দূর্গা ও মহিষাসুরের যুদ্ধ

দেবী দুর্গার আবির্ভাবের খবর মহিষাসুরের কাছে পৌঁছায়। তিনি তার বিশাল অসুর বাহিনী নিয়ে দেবীকে আক্রমণের জন্য আসেন। এরপর দেবী ও অসুরবাহিনীর মধ্যে তুমুল যুদ্ধ শুরু হয়।

দেবী দুর্গা ও অসুররাজ মহিষাসুরের মধ্যকার যুদ্ধটি ছিল চরম উত্তেজনাপূর্ণ এবং আধ্যাত্মিক তাৎপর্যে ভরপুর।

দেবী মহিষাসুরের একের পর এক আক্রমণ প্রতিহত করেন। তাঁর অস্ত্রের আঘাতে অসুরবাহিনীর বহু বীর যোদ্ধা পরাজিত হয়।

যুদ্ধের বর্ণনায় দেবীকে একই সঙ্গে সাহসী, কৌশলী ও অপরাজেয় যোদ্ধা হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।

তবে মহিষাসুরও সহজে হার মানেনি। সে তার নিজের শক্তির ওপর নির্ভর করে বারবার বিভিন্ন কৌশলে দেবীর বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যান। কিন্তু দেবীর মহাশক্তি ও কৌশলের সামনে তার বাহিনী বারবার পরাজিত হয়।

একপর্যায়ে মহিষাসুর নিজেই সরাসরি যুদ্ধে নামে। শুরু হয় দেবী ও অসুরের মধ্যে চূড়ান্ত সংঘর্ষ।

মহিষাসুরের মায়া যুদ্ধ

নিজের বিশাল সৈন্যদল এবং সেনাপতিদের পতন দেখে ক্রোধে উন্মত্ত হয়ে মহিষাসুর স্বয়ং দেবীর সঙ্গে যুদ্ধ করতে এগিয়ে আসে। তিনি মহিষের রূপ ধারণ করে দেবীর ওপর প্রচণ্ড হামলা চালান। তাঁর ক্ষুরের আঘাতে পৃথিবী ও শিং দিয়ে পর্বত উপড়ে ফেলতে থাকেন। কিন্তু দেবী প্রতিটি আক্রমণের জবাব দেন।

দেবী যখন তাকে পাশ বা দড়ি দিয়ে বেঁধে ফেলেন, তখন সে তার ঐন্দ্রজালিক মায়া বলে রূপ পরিবর্তন করতে শুরু করে:

বন্ধন থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য মহিষাসুর হঠাৎ সিংহ রূপ ধারণ করে। দেবী সঙ্গে সঙ্গে তার মাথা কাটার জন্য তলোয়ার উঁচিয়ে ধরেন।

এরপর মহিষাসুর হাতে ঢাল-তলোয়ার নিয়ে একজন পুরুষ যোদ্ধার রূপ নেয়। দেবী তাঁর বাণ দিয়ে তার ঢাল-তলোয়ার ভেঙে দেন।

পরক্ষণেই মহিষাসুর এক বিশাল হাতিতে পরিণত হয়ে দেবীকে আক্রমণ করেন, দেবী তাঁর তলোয়ার দিয়ে হাতির শুঁড়টি কেটে ফেলেন।

সবশেষে মায়াবী মহিষাসুর আবার ভয়ঙ্কর মহিষ রূপে ফিরে যায় এবং প্রবল গর্জন করতে থাকে।

মহিষাসুরের এই তাণ্ডব দেখে দেবী দুর্গা পরম তৃপ্তিতে তাঁর দিব্য পাত্র থেকে সুধাপান (মধু) করেন এবং অট্টহাস্য দিয়ে সেই বিখ্যাত শ্লোকটি বলেন:

“গর্জ গর্জ ক্ষণং মূঢ় মধু যাবৎ পিবাম্যহম।

ময়া ত্বয়ি হতেঽত্রৈব গর্জিষ্যন্ত্যাশু দেবতাঃ।।”

(অর্থ: ওরে মূঢ়! আমি যতক্ষণ মধু পান করছি, ততক্ষণ তুই যত পারিস গর্জন করে নে। আমি তোকে বধ করার পরেই দেবতারা আনন্দ উল্লাসে গর্জন করে উঠবেন)।

আরও পড়ুন: প্রাণের ঠাকুর শ্রী শ্রী অনুকূল চন্দ্র

মহিষাসুরের মৃত্যু

এই কথা বলেই দেবী শূন্যে লাফিয়ে উঠে মহিষাসুরের পিঠের ওপর চড়ে বসেন। তিনি তাঁর চরণ দিয়ে অসুরের ঘাড় চেপে ধরেন এবং তীব্র শক্তিতে তার বুকে ত্রিশূল বিদ্ধ করেন।

দেবীর পায়ের চাপে ও ত্রিশূলের আঘাতে মহিষের মুখ থেকে অসুরের আসল পুরুষ রূপটি অর্ধেক বেরিয়ে আসে। সেই অর্ধেক নিষ্ক্রান্ত অবস্থায় যুদ্ধ করতে থাকা মহিষাসুরের মাথাটি দেবী তাঁর বিশাল তলোয়ার দিয়ে কেটে দ্বিখণ্ডিত করেন।

মহিষাসুরকে বধ করার কারণেই দেবী দুর্গা ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ নামে পরিচিত। এই নামের অর্থ মহিষাসুরকে দমনকারী বা বধকারী দেবী।

মহিষাসুরের মৃত্যুর সাথে সাথেই অবশিষ্ট অসুরবাহিনী ভয়ে চিৎকার করতে করতে পালিয়ে যায় এবং ধ্বংস হয়ে যায়।

দূর্গাপূজার সাথে মহিষাসুরবধের সম্পর্ক

দেবী দুর্গা ও মহিষাসুরের যুদ্ধ দুর্গাপূজার অন্যতম প্রধান বিষয়। দুর্গাপূজার প্রতিমায় সাধারণত দেবীকে দশভুজা রূপে দেখানো হয়। তাঁর হাতে বিভিন্ন অস্ত্র থাকে এবং পায়ের কাছে মহিষাসুরকে দেখা যায়।

দেবী দুর্গা ও মহিষাসুরের যুদ্ধ হিন্দু পুরাণের একটি গুরুত্বপূর্ণ কাহিনি। মহিষাসুরের ক্ষমতার উত্থান, দেবতাদের পরাজয়, দুর্গার আবির্ভাব এবং শেষ পর্যন্ত অসুরের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে এই আখ্যানের পরিণতি ঘটে।

ধর্মীয় বিশ্বাসে এই যুদ্ধ অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে শুভ শক্তির বিজয়ের প্রতীক। একই সঙ্গে এটি সাহস, ন্যায় ও অহংকারের পরিণতি সম্পর্কে ভাবতে শেখায়।

যুগে যুগে প্রতিমাশিল্প, সাহিত্য ও দুর্গাপূজার নানা আয়োজনে এই কাহিনি নতুনভাবে প্রকাশ পেয়েছে। তাই দেবী দুর্গা ও মহিষাসুরের যুদ্ধ শুধু একটি পৌরাণিক সংঘর্ষের গল্প নয়; এটি হিন্দু ধর্মীয় ঐতিহ্য ও বাঙালি সংস্কৃতিরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গসহ বিভিন্ন অঞ্চলে প্রতিমাশিল্পীরা মহিষাসুরবধের দৃশ্যকে নানা শৈলীতে ফুটিয়ে তোলেন। এর মাধ্যমে পৌরাণিক কাহিনি প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মানুষের কাছে পৌঁছে যায়।

আরও পড়ুন: ইতিহাসের পাতা, গির্জার আঙিনায় স্নিগ্ধ বিকেল

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সাবস্ক্রাইব

spot_img

সম্পাদকের নির্বাচিত

আরও পড়ুন
আরও পড়ুন

দুর্গাপূজা: ধর্মীয় ঐতিহ্য থেকে সর্বজনীন উৎসব

দুর্গাপূজা বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়ের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক উৎসব। প্রতি বছর শরৎকালে দেবী দুর্গার আরাধনাকে কেন্দ্র করে মণ্ডপে মণ্ডপে পূজা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও নানা আয়োজন করা হয়। হিন্দু ধর্মীয় বিশ্বাসে দেবী দুর্গা অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে শুভ শক্তির বিজয়ের প্রতীক।

নভেরার জন্য এলিজি

১৯৪৭ এ ধর্মের ভিত্তিতে ভারত-পাকিস্তান ভাগ হলেও পূর্বপাকিস্তানের ভাষা...

‘বার্স্ট অফ জয়’ : পুলিৎজার জয়ী ছবির শিক্ষা

ডিজিটাল ক্যামেরা ওয়ার্ল্ড অনলাইনে প্রকাশিত টম মে প্রণীত প্রতিবেদন...

ব্যাটারি রিকশা: আমাদের ভাবনা

ব্যাটারি রিকশা নিয়ে অনেক ধরনের আলাপ চলে আসছে গত...