নরসিংদীর পথে পথে

Share post:

Date:

যাবেন?

যাবো- ঠিক ১৫ মিনিটে আমি আর রুকাইয়া মিলে প্ল্যান করলাম নরসিংদী ঘুরতে যাবো।

সারা সপ্তাহ কাজ আর পড়াশুনার চাপে থাকি দুজনেই। তাই বাড়তি একদিন সরকারি ছুটিছাটা পেলেই ঘুরতে বেরিয়ে পড়ি। ঢাকার আশে পাশে ঘুরে ঘুরে দেখি। বিশেষ করে ঐতিহাসিক স্থাপনা, প্রকৃতি, মানুষ আর তাদের জীবনযাত্রা দেখতে আমি খুব পছন্দ করি।

ঢাকার আশেপাশে এতো জায়গা থাকতে নরসিংদী কেনো? এই প্রশ্নটা আমাকে অনেকে করেছেন। খুব সহজ উত্তর হলো একদিনেই আসা-যাওয়া করা যায় এবং নরসিংদী প্রাচীন ঐতিহ্যের জন্যে বিখ্যাত। কিছুদিন আগেই নারায়ণগঞ্জ ঘুরে এসেছি, আর নারায়ণগঞ্জ পার হলেই নরসিংদী- তাই ছুটির দিনে লোভ সামলাতে পারলাম না নতুন একটা জায়গা ঘুরে দেখার।

প্রথমেই আমাদের প্রিয় ট্র্যাভেল গাইড চ্যাটজিপিটি মহাশয়কে জিজ্ঞেস করলাম, নরসিংদী যাওয়ার বাস কোথা থেকে ছাড়বে। ও আমাদেরকে একদম সারাদিনের প্ল্যান বানিয়ে দিলো। কীভাবে যাবো, কী কী দেখবো, কোথায় খাবো ও কীভাবে বাড়ি ফিরবো। সেই সাথে আরেকটু ঘেটেঘুটে আনুমানিক খরচ-পাতিও জেনে নিলাম।

দুরের পথে যাওয়ার জন্য আমি পায়ে সবসময় নরম আর ফ্ল্যাট জুতো পরি। আবহাওয়া পূর্বাভাস বলছিলো সারাদিনেই গরম থাকবে, তাই সুতির জামা বেছে নিলাম। সাথে নিলাম ছাতা, রুমাল এবং পানির বোতল।

যাওয়ার দিন সকাল ৭টা ১০ মিনিটের মেট্রো ধরে সোজা সচিবালয়, আর সেখান থেকে রিক্সা নিয়ে গুলিস্তান। আহাদ পুলিশ বক্সের সামনে থেকেই নরসিংদীর বাস ছাড়ে। আমরা ঠিক করেছিলাম পাঁচদোনা নামবো। পাঁচদোনা নরসিংদী জেলার সদর উপজেলার ছোট্ট একটা ইউনিয়ন।

বাইরে কোথাও ঘুরতে গেলে যতটা না গন্তব্য আমাকে মুগ্ধ করে, তার চেয়ে অনেক বেশি মুগ্ধ করে পথ চলার রাস্তা। দু পাশের সবুজ সবুজ সারি সারি গাছ, নদীনালা, প্রকৃতি, মানুষের চলা, ভ্যান-রিক্সার পাশ কাটিয়ে চলে যাওয়া এসব দেখতে দেখতেই চলে এলাম পাঁচদোনা।

মেঘনা নদী

ঢাকা থেকে পাঁচদোনা আসতে আমাদের সময় লেগেছে দেড় ঘণ্টা। রাস্তা ফাঁকা ছিলো, আর ছুটির দিনের সকাল হওয়ায় কোনোরকম ঝামেলা ছাড়াই পৌঁছে গেলাম। বাস স্ট্যান্ডে নেমেই মনে হলো এই মুহুর্তে গরম গরম পরোটা না খেলে এক পা-ও হাঁটা যাবে না।

আমাদেরকে রাস্তার যে পাশে নামিয়ে দিয়েছিলো, সে পাশে তেমন কোনো হোটেল বা রেস্টুরেন্ট চোখে পড়লো না। ঢাকার বাইরে কোথাও গেলে চেষ্টা করি একদম লোকাল দোকানপাটে খাওয়া-দাওয়া করতে। খুব আহামরি নামি দামি হোটেলে যেতে চাই না।

তো খাবার দোকান খুঁজতে খুঁজতে রাস্তা পার হলাম। হয়েই দেখলাম কাকলি মিষ্টির দোকান। ভাবলাম ঢুকে পড়ি, মিষ্টির দোকানের নাস্তা অনেক দিন খাওয়া হয় না।

ওমা, ভিতরে ঢুকে দেখি, শুধু মিষ্টি নয়, ভাত-আলুভর্তা, খিচুড়ি, সবজি, করল্লা ভাজা থেকে গরুর মাংস, সব রয়েছে এইটুকু ছোট্ট দোকানে। যেহেতু সারাদিন হাঁটাহাঁটির ব্যাপার রয়েছে তাই ঠিক করলাম ভাত না খেয়ে পরোটাই খাবো। সাথে অর্ডার করলাম গরুর মাংস, মিষ্টি আর ডিম ভাজা।

প্রচণ্ড গরম লাগছিলো। খাবার দোকানে একটা লাইট জ্বললেও ফ্যান চলছিলো না। জিজ্ঞেস করলে বললো সারাদিন ইলেক্ট্রিসিটি তেমন থাকেই না। আইপিএসে কোনোমতে একটা লাইট জ্বেলে রেখেছে, কিন্তু ফ্যান চালানোর উপায় নেই। কি আর করা, গরমে ঘামতে লাগলাম।

কিছুক্ষণ বাদেই চলে এলো গরম গরম পরোটা, ডিম ভাজা, গরুর মাংস আর মিষ্টি। বাসার বাইরে একদম বাড়ির স্টাইলে রান্না গরুর মাংস যে কতো বছর পর খেলাম হিসেব নেই। এতো গরমেও খাবারের স্বাদ আমাদেরকে গরমের কষ্ট ভুলিয়ে দিলো। যে ছেলেটা খাবার দিচ্ছিলো, তার সাথে টুকটাক গল্প করতে করতেই খাওয়া সেরে বেরিয়ে পড়লাম।

পাঁচদোনা থেকে আমাদের প্ল্যান ছিলো লক্ষ্মণ সাহার জমিদারবাড়ি দেখতে যাবো। সে জন্য অটো ধরে যেতে হবে পলাশ উপজেলার ডাঙ্গা বাজারে। আবার রাস্তা পার হয়ে অটো খুঁজতে লাগলাম। এখানে একটু বিড়ম্বনার শিকার হতে হলো, অবশ্য বিড়ম্বনা না হলে ভ্রমণের আর মজা কী!!

আমরা যেহেতু দুটো মেয়ে গিয়েছিলাম ঘুরতে, আর আমাদের দেখেই বোঝা যাচ্ছিলো এলাকায় নতুন, অটোওয়ালারা মোটামুটি ঝাঁপিয়ে পড়লো আমাদের উপর। প্রথমে একজন অস্বাভাবিক বেশি ভাড়া চাইলো। আমরা তো ভাড়া সম্পর্কে মোটামুটি ধারণা নিয়ে এসেছি। তাই উনার অটোতে উঠলাম না। আরেকজনের অটো ভাড়া করতে গেলে উনি কোনোভাবেই ভাড়া বলবেন না, এদিকে আমাদের জোরাজুরি করতে লাগলেন অটোতে ওঠার জন্য। এসব জোরাজুরির মধ্যেই দেখলাম বৃদ্ধ একজন অটো ড্রাইভার আমাদের দিকে তাকিয়ে আছেন। উনাকে ডাঙ্গা বাজার বলতেই বললেন, দুইজন ৬০ টাকা দেবেন মামা। আমরা উঠে বসলাম।

এদিকে অন্য এক অটোতে উঠে বসার জন্য ওখানকার অটো ড্রাইভাররা আমাদের যেতে দেবে না। সে এক তুলকালাম কাণ্ড। পরে একটু চড়া সুরে কথা বলে সেখান থেকে পার পেলাম।

ডাঙ্গা বাজার যাওয়ার পুরো রাস্তাটা এতো সুন্দর! একটুও ভাঙাচোরা নেই। আর দু’পাশের রাস্তা ধরে সারি সারি গাছ। ভীষণ আনন্দ হচ্ছিলো। নতুন একটা জায়গা এক্সপ্লোর করার আনন্দ, নতুন লোকালিটি দেখার আনন্দ।

ডাঙ্গা বাজার পৌঁছে আমাদেরকে আবার অটো নিতে হলো, তবে লক্ষ্মণ সাহার জমিদারবাড়ি বললে তেমন কেউই চিনতে পারলো না। তাদেরকে বলতে হলো উকিলবাড়ি যাবো। আসার আগেই লক্ষ্মণ সাহার জমিদারবাড়ি নিয়ে অনলাইনে ঘাটাঘাটি করছিলাম। জানতে পারলাম লক্ষ্মণ সাহার উত্তরাধিকারেরা ভারত ভাগের আগেই ভারতে চলে যান। এদিকে ছিলেন শুধু মেঝো ছেলে বৌদ্ধ নারায়ণ সাহা যিনি এই বাড়িটি এক উকিলের কাছে বিক্রি করে দেন। ফলে, লোকাল মানুষের কাছে এটি উকিলবাড়ি নামেই পরিচিত।

লক্ষ্মণ সাহার বাড়ি পৌঁছাতে গিয়ে আমাদের বেশ বেগ পেতে হলো। প্রচণ্ড ভাঙা রাস্তা, মানুষের ভিটেবাড়ির উপর দিয়েই যাচ্ছিলাম। যে অটো ড্রাইভার আমাদের নিয়ে যাচ্ছিলো, সে হুট করে জিজ্ঞেস করলো, আপনাদের সাথে কি আর কেউ আছে না আপনেরা একা দুইজন মেয়ে মানুষ? আমি কণ্ঠ শান্ত রেখেই বললাম, আমরা দুইজনেই মামা, আমাদের সাথে আর কেউ নাই।

তখন অটোওয়ালা বলে উঠলো, জায়গাটা তো ভালো না ম্যাডাম, আপনেরা একারা হইলে বেশিক্ষণ থাইকেন না। কথাটা শুনে একটু ভয়ই লাগলো। লক্ষ্মণ সাহার বাড়ি পৌঁছে ভয়টা আরেকটু বেড়ে গেলো কারণ বাড়ির ভিতরে নানা ধরনের লোকজন আছে। দোতলায় অনেকেই সিগারেট খাচ্ছিলেন। দুইটা মেয়ে উপরে আর ওঠার সাহস পেলাম না।  আমরা বুদ্ধি করে অটো ড্রাইভারকে বললাম, আপনি কি এখানে কিছুক্ষণ দাঁড়াবেন? তাহলে আমরা আপনার অটোতেই আবার ফিরবো। ছেলেটা ভালো ছিলো, বললো আপনেরা ঘুরেন, আমি আছি।

ভিক্টোরিয়ান বারান্দাসহ কি যে চমৎকার একটা দোতলা ভবন দেখলাম, চোখ ফেরাতে মন চাইছিলো না। ভিতরের সিড়ি ভাঙা বললো একজন। এমন কারুকার্যখচিত দালান দেখলে আমার মন উড়ে যায় শত শত বছর আগের দিনের কল্পনায়। কেমন ছিলো তখনকার দিনের মানুষেরা? কেমন কাটতো তাদের দিন? এই বারান্দায় কি রূপসী কোনো নারী আটপৌরে বসনে দাঁড়িয়ে থাকতো? কিসের অপেক্ষায় থাকতো সে?

লক্ষ্মণ সাহার জমিদার বাড়ি

এসব এলেবেলে ভাবনায় ছেদ পড়লো রুকাইয়ার ডাকে, আপু চলেন ফেরত যাই। ব্যাস, আবার সেই অটোতে ওঠা, ভাঙা রাস্তায় চলা শুরু। তবে এবার আর ডাঙ্গা বাজার নয়, সরাসরি পাঁচদোনা। যাওয়ার পথে অটো ড্রাইভারের সাথে তুমুল আড্ডা হলো। ৪ বছর ধরে গাড়ি চালাচ্ছে সে। নানা গল্প করতে করতে বললো এই এলাকায় মেয়েই বেশি, কিন্তু সবাই ঘরে থাকে। আমদের মত এমন সাহস করে কেউ বের হয় না।

গল্প করতে করতেই পাঁচদোনা চলে এলাম। আমাদের কপাল খারাপ যে আমরা বুধবার গিয়েছি ঘুরতে। আর বুধবারেই ভাই গিরিশচন্দ্রের বাড়িটা বন্ধ থাকে। ফলে ওটা আর দেখার সৌভাগ্য হয়নি।

পাঁচদোনায় অটো পরিবর্তন করে এবারে আমাদের গন্তব্য মাধবদী। মাধবদী নরসিংদীর বেশ গুরুত্বপুর্ণ একটা পৌরসভা কারণ এখানে প্রচুর পরিমাণে পোশাকশিল্পের কারখানা দেখলাম। ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জের সাথে যোগাযোগ ব্যবস্থাও বেশ ভালো। তবে এলাকাটা আর ঘুরে দেখলাম না, কারণ এখন আমাদের গন্তব্য জমিদার নবীনচন্দ্র সাহার তৈরি ঐতিহাসিক বালাপুর জমিদারবাড়ি!

মাধবদী বাস স্ট্যান্ড থেকে রিক্সা নিয়ে আমরা চলে এলাম গরুর হাঁট নামের এক জায়গায়, এখান থেকে সিএনজি ধরে সোজা বালাপুর বাজার। বাজারের ভিতরের রাস্তা কাটা থাকায় আস্তে ধীরে রাস্তা পার হয়ে সামনে পেলাম সুপ্রাচীন সেই ঐতিহাসিক বালাপুর জমিদার বাড়ি আর তার বিখ্যাত ভিক্টোরিয়ান বারান্দা। আর এই জমিদারবাড়ির ঠিক পাশেই রয়েছে বিখ্যাত বালাপুর নবীন চন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয়।

সংরক্ষণের অভাবে এতো সুন্দর ঐতিহাসিক স্থাপনাটির যে বেহাল দশা দেখলাম, তাতে ভীষণ মন খারাপ হলো। জমিদারবাড়ির সামনে রীতিমত গরু-মুরগি চড়ে বেড়াচ্ছে।

মন খারাপের সাথে সাথে শরীরও ক্লান্ত লাগছিলো। সকাল থেকে এদিক সেদিক করতে করতে পেটের খাবারও হজম হয়ে গেছে। এদিকে দুপুরের কটকটে রোদ। সামনে এক কাকীর দোকান পেলাম। কাকীকে বললাম দুটো ড্রিংকো দিতে। ইলেক্ট্রিসিটির সমস্যা এতোই প্রকট যে ঠাণ্ডা কিছুই তেমন পাওয়া যাচ্ছে না। ড্রিংকো খেতে খেতে আমরা জিজ্ঞেস করলাম কাকীকে যে মেঘনা নদীর পাড় এখান থেকে কতদূর?

লোকাল মানুষদের সাথে আন্তরিকভাবে কথা বললে উনারা জান উজাড় করে দেন, এই অভিজ্ঞতা আমার আগেও আছে। কাকীকে মেঘনা নদীর কথা জিজ্ঞাসা করতেই, একজন লোককে ডেকে বলে দিলেন, এই দুই মাইয়ারে রিক্সা ঠিক করে দাও, মেঘনা নদীর পাড়ে লইয়া যাবে।

ভিআইপি অনুভূতি হচ্ছিলো। তারপর রিক্সা নিয়ে গাছের ছায়ার পাশ কাটিয়ে আমরা চলে গেলাম সোজা মেঘনা নদীর পাড়ে, ভর দুপুরে!

ছোটবেলায় হুমায়ুন কবিরের লেখা মেঘনার ঢল কবিতাটা খুব মনে পড়ছিলো।

“শোন্ মা আমিনা, রেখে দে রে কাজ ত্বরা করি মাঠে চল,

এল মেঘনায় জোয়ারের বেলা এখনি নামিবে ঢল।

নদীর কিনার ঘন ঘাসে ভরা

মাঠ থেকে গরু নিয়ে আয় ত্বরা

করিস না দেরি- আসিয়া পড়িবে সহসা অথই জল

মাঠ থেকে গরু নিয়ে আয় ত্বরা মেঘনায় নামে ঢল।”

নদীর পাড়ের মানুষের জীবনযাত্রা সম্পর্কে একদমই ধারণা  ছিলো না। দেখলাম, প্রচণ্ড বৃদ্ধ এক কাকু তার নৌকা সারাই করছেন আলকাতরা দিয়ে। কথা বলতে চাইলাম, পাত্তাই দিলেন না। তারই পাশে ছোটো ছোটো ছেলেমেয়েরা বসে আমড়া বিক্রি করছে। জিজ্ঞেস করলাম, তোমাদের স্কুল নেই? ওরা বললো, আজ ছুটি। তাই গাছ থেকে আমড়া পেড়ে বিক্রি করতে বসেছে। আমি একটা আমড়া চাইলাম। বললাম, কতো টাকা দেবো?

ওরা একে ওপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করে বললো, ১০টাকা। দিলাম। এরপর ওদের চোখ মুখের অভিব্যক্তি দেখার মতো ছিলো! গাছের আমড়া, এখানে বিকেলে ঝুড়ি নিয়ে বসলে হয়তো ২/৩টাকায় বেচতে পারে। সেখানে ১০টাকা পেয়ে সবগুলোর চোখে মুখে খুশি আর ধরছিলো না।

আমি নদীর পাড়ে বসে আমড়া খেতে খেতে ঢেউয়ের আছড়ে পড়া দেখতে লাগলাম। একই পাড়ে একপাশে হাঁসেরা গোসল করছে, আরেক পাশে মানুষেরা। কেউ কাপড় ধুচ্ছে তো কেউ থালাবাসন। এ এক অপূর্ব দৃশ্য যা ভাষায় বর্ণনা করা যায় না। তারপর আশে পাশের লোকজন দেখি সবাই কাছে পিঠেই বসে আছেন। গল্প শুরু করলাম।

তারা প্রবল আগ্রহে জিজ্ঞেস করলেন, এইখানে ক্যান আইছেন? এইখানে তো কেউ আসে না। বললাম, আপনাদের দেখতে আসছি। তারপর একটা ২০/২২ বছরের ছেলের সাথে গল্প করতে করতে জানতে পারলাম চর নিয়ে কি প্রচণ্ড মারামারি হয়। দূরে হাত দিয়ে ইশারা করে দেখালো, ঐ যে চর, ঐডা নিয়া সেদিন মারামারি হইয়া ২২ জন মরছে।

আমি জিজ্ঞাসা করলাম কারা বেশি শক্তিশালী? বললো চরের ঐ পারের লোকজনেরাই আমগোরে মারে। আরো নানারকম গল্প করতে করতে দেখলাম বেলা গড়িয়ে যাচ্ছে। নরসিংদীর মূল আকর্ষন উয়ারী-বটেশ্বর যেতে হবে। অনিচ্ছায় হাঁটা শুরু করলাম মেঘনা নদীর পাড় ধরে।

হাঁটতে হলো অনেকক্ষণ। আশে পাশে রিক্সা-ভ্যান কিছুই ছিলো না। অনেকটা পথ হেঁটে, রোদে পুড়ে আমরা একটা রিক্সা পেলাম যেটা সোজা মাধবদী যাবে। মাধবদী পৌঁছে বাস ধরলাম বেলাবোর উদ্দেশ্যে, নামবো বারৈচা বাজার, সেখান থেকে যাবো সেই বিখ্যাত প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন উয়ারী-বটেশ্বর দেখতে।

বাসে উঠে আমি আর রুকাইয়া দুজনেই ঘুম। মাধবদী থেকে বেলাবো যেতে ঘণ্টা দেড়েক লাগবে। বারৈচা বাজারের আগের স্টপেজ মরজাল, ওখানে নামলেও হতো। কিন্তু মনে করলাম বারৈচা বাজারটাও ঘুরে দেখি। নির্বিঘ্নে এক ঘুম দিয়ে বারৈচা নামলাম। ততক্ষণে পেটে ইঁদুর দৌঁড়াদৌঁড়ি করছে।

বাস স্ট্যান্ডে নেমেই একটা বড় হোটেল দেখলাম। ভিতরে ঢুকেই একজন কর্মীর দারুণ আন্তরিক অভ্যর্থনায় মনটা ভালো হয়ে গেলো। কিন্তু এখানেওএকই অবস্থা, ইলেক্ট্রিসিটি নেই। তবুও, আমাদেরকে একটা ফ্যান ছেড়ে দিলো, লাইটও জ্বেলে দিলো। হাত মুখ ধুয়ে অর্ডার করলাম চিংড়ি ভুনা, হাঁসের মাংস আর ভাত। নরসিংদীর দুটো হোটেলে খেয়েছি, দুটোরই রান্না অসাধারণ। স্বাদ একদম ঘরের খাবারের মতো।

উয়ারি বটেশ্বর

খেয়ে দেয়ে একটু রেস্ট নিয়ে চড়া রোদে রিক্সা ঠিক করলাম, যাবো উয়ারী-বটেশ্বর। কিন্তু রিকশাওয়ালা বললো, উয়ারী আর বটেশ্বর দুটো আলাদা গ্রাম। উয়ারীতেই যায় মানুষ দেখতে।

তারপর আর কি, আড়িয়াল খাঁ নদীর সৌন্দর্য দেখতে দেখতে রিক্সায় উড়তে উড়তে গ্রামের আঁকাবাঁকা পথ ধরে পৌঁছে গেলাম কাঙ্ক্ষিত সেই উয়ারী-বটেশ্বরে। প্রাচীন যুগের মাটির নিচের সেই দূর্গম নগরী, আনুমানিক আড়াই হাজার পূর্বের নিদর্শন এখানে পাওয়া গেছে।

তবে, গিয়ে হতাশ হতে হলো, এখন তেমন কিছুই দেখার নাই ওখানে। অল্প কিছু জিনিস সাজিয়ে রেখেছে, তাও আবার একজনের বাড়ি পার হয়ে ঢুকতে হয়। বেশিক্ষণ না থেকে, ঝটপট কিছু ছবি তুলে আবার হাঁটা শুরু, ততক্ষণে সূর্য পশ্চিমে হেলে পড়তে শুরু করেছে। আমরা একটা রিক্সা নিয়ে সোজা আসলাম বটেশ্বর বাজার, সেখান থেকে মরজাল বাস স্ট্যান্ড। এখন আমাদের গন্তব্য ঢাকা।

মরজাল বাস স্ট্যান্ডে পৌঁছে গলা শুকাচ্ছিলো, রুকাইয়াকে বললাম, আইসক্রিম খাবো। আমাদের যে কোনো ট্যুরে টাকা পয়সা ম্যানেজমেন্টের দায়িত্ব রুকাইয়ার। ও বললো, আপনাকে না একটু আগে এত্তোগুলা ভাত খাওয়ালাম? আবার কিসের আইসক্রিম? এতো টাকা নেই, বাজেট ফেইল! ওর কাছে খানিকক্ষণ ঘ্যানঘ্যান করে একটা আইসক্রিম বাগিয়ে বাসের দিক গেলাম। গিয়েই অবাক, মাধবদী থেকে যেই বাসে করে আমরা এসেছিলাম, ঠিক সেই বাসই এখন ঢাকা যাবে। সেই বাসের কান্ট্রাক্টর এবং হেল্পার সেই আগের দুইজন। উনারা আমাদের দেখেই চিনতে পারলেন আর খুব করে বললেন আমাদের বাসে করে চলেন।

বিকেল সাড়ে ৫টায় বাসে উঠলাম। তখনও জানি না কপালে কি ভোগান্তি লেখা আছে। কিছুক্ষণ পরেই বুঝলাম রাস্তায় বিশাল জ্যাম। ঢাকা যে কতক্ষণে পৌঁছাবো কোনো ঠিক নেই। এদিকে ফোনে খুব বেশি চার্জও নেই। ফোনের নেট বন্ধ করে এবার অপেক্ষা করতে লাগলাম, যেই ফেরিওয়ালা আসে তার কাছ থেকেই ১০ টাকার খাবার কিনি। রুকাইয়া অবাক চোখে আমার দিক তাকিয়ে আছে! আর আমি খেয়েই যাচ্ছি। একবার বুট মাখা, একবার শসা মাখা হাবিজাবি যা পাচ্ছি!!

যেহেতু জ্যামে অনেকক্ষণ আটকা, আমি চঞ্চল মানুষ তাই নিজেকে খাওয়ার মধ্যেই ব্যস্ত রাখছিলাম! কিন্তু তাও বা কতক্ষণ! বাস চলেই না তো চলেই না! এর মধ্যে বাসের সেই কনট্রাক্টর মামা আমাদের নিজের টাকায় বাদাম কিনে দিলেন, ভেবেছেন ছোটো দুটো মানুষ ঘুরতে এসেছে! আসলে এটা ছিলো উনার আন্তরিকতা!

এই বাসটা মাঝপথে বললো ঢাকা যাবে না। তখন এই কন্ট্রাক্টরই আমাদের আরেকটা বাসে ভালো সিট দেখে তুলে দিয়েছেন। উনার আন্তরিকতায় দারুণ অবাক হয়েছি। ঢাকার বাইরে যেকোনো শহরে গেলেই এমন আন্তরিকতা চোখে পড়ে, সোশ্যাল মিডিয়ার নীল সাদা জীবনের বাইরে কি যে চমৎকার একটা জীবন আছে তা ভ্রমণে না বের হলে বোঝার উপায় নেই। যাই হোক, অবশেষে আমরা ঢাকায় পৌঁছালাম রাত সাড়ে ১০টায়। তারপর যার যার গন্তব্যে। বাসায় ফিরে ক্লান্ত-শ্রান্ত, তবু মনের কোণে ছোট্ট একটু প্রশান্তি, ভ্রমণ এতো আনন্দের!!

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সাবস্ক্রাইব

spot_img

সম্পাদকের নির্বাচিত

আরও পড়ুন
আরও পড়ুন

দ্য ফ্রেডরিক ফ্রিটজ ক্যাপ, বাংলার আলোকচিত্রের এক কালজয়ী নাম

১৮৮০-এর দশকের শুরুর দিকের কথা। ক্যালকাটা (কলকাতা) থেকে প্রকাশিত...

তারেক মাসুদ : তেরো আগস্ট স্মরণে

তারেক মাসুদ জন্মেছিলেন ১৯৫৭ সালের ছয় ডিসেম্বর। ফরিদপুর জেলার...

ইতিহাসের পাতা, গির্জার আঙিনায় স্নিগ্ধ বিকেল

আজও পুরান ঢাকার বিকেল মানেই কোলাহল। সরু রাস্তায় রিকশার...