লেখা: আনহেল দি মারিয়া
ভাষান্তর: রোহণ ভট্টাচার্য
আমার আজও স্পষ্ট মনে আছে যে, রিয়াল মাদ্রিদের কাছ থেকে আসা সেই চিঠিটা খোলার আগেই ছিঁড়ে টুকরো-টুকরো করে ফেলেছিলাম।
দিনটা ছিল ২০১৪ বিশ্বকাপের ফাইনালের দিন সকাল, ঠিক বেলা ১১টা। আমি তখন ট্রেইনারের টেবিলে বসে পায়ে ইনজেকশন নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। কোয়ার্টার ফাইনালের খেলায় আমার উরুর পেশি ছিঁড়ে গিয়েছিল, কিন্তু পেইনকিলার নিয়ে ব্যথা ছাড়াই দৌড়াতে পারছিলাম। আমাদের ট্রেইনারদের পরিষ্কার বলে দিয়েছিলাম, “যদি আমার শরীর ভেঙে গুঁড়িয়ে যায়, তো যাক। আমার কিচ্ছু যায়-আসে না। আমি শুধু আজকের ম্যাচটা খেলতে চাই।”
যখন পায়ে বরফ ঘষছি, তখন আমাদের টিম ডক্টর দানিয়েল মার্তিনেজ হাতে একটা খাম নিয়ে ঘরে ঢুকলেন। বললেন, “দেখো আনহেল, এই চিঠিটা রিয়াল মাদ্রিদ থেকে এসেছে।”
আমি বললাম, “কী বলছ এসব?”
তিনি বললেন, “ওরা জানিয়েছে যে, তুমি খেলার মতো অবস্থায় নেই। তাই আজ তোমাকে মাঠে না নামাতে ওরা আমাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।”
আমি মুহূর্তের মধ্যে পুরো ব্যাপারটা ধরে ফেললাম। বিশ্বকাপের পর রিয়াল যে হামেস রদ্রিগেজকে সই করাতে চায়, সেই গুঞ্জন ততদিনে সবার মুখে-মুখে। বুঝলাম, ওর জন্য জায়গা ফাঁকা করতেই ওরা আমাকে বিক্রি করে দেবে। তাই ওরা চায়নি যে ওদের এই ‘সম্পদ’ কোনোভাবে চোট পেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হোক। ফুটবল ব্যবসার এই সহজ অথচ নিষ্ঠুর দিকটা কেমন আমাদের চোখ এড়িয়ে যায়!
দানিয়েলকে বললাম চিঠিটা আমার হাতে দিতে। ওটা আর খুলেও দেখিনি। স্রেফ কুচি কুচি করে ছিঁড়ে ফেলে বললাম, “আবর্জনার বাক্সে ফেলে দিন। এখানে আমি খেলব কি খেলব না, সেই সিদ্ধান্ত নেব শুধু আমিই।”
আগের রাতে আমার ঠিকঠাক ঘুম হয়নি। কারণ, ব্রাজিলিয়ান সমর্থকরা সারা রাত আমাদের হোটেলের বাইরে বিকট শব্দে আতশবাজি ফাটিয়েছে। তবে চারপাশ যদি পুরোপুরি নিস্তব্ধও থাকত, তাহলেও বোধহয় আমি ঘুমাতে পারতাম না। বিশ্বকাপের ফাইনালের আগের রাতের অনুভূতিটা ভাষায় প্রকাশ করা অসম্ভব— যেন সারা জীবনের স্বপ্ন চোখের সামনে, একদম হাতের নাগালে।
আমি মনে-প্রাণে সেদিন মাঠে নামতে চেয়েছিলাম, এমনকি তার জন্য যদি আমার কেরিয়ারও শেষ হয়ে যেত, তাতেও আমার আফসোস ছিল না। কিন্তু দলের জন্য কোনো অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি করতে চাইনি। তাই সকাল-সকাল উঠে দেখা করতে গেলাম, আমাদের ম্যানেজার আলেহান্দ্রো সাবেল্লার সঙ্গে। তার সঙ্গে আমার সম্পর্কটা ছিল বড়ই আন্তরিক। ভালোই জানতাম, যদি তাকে বলি যে আমি প্রথম একাদশে থাকতে চাই, তবে হয়ত আমাকে খেলানোর জন্য তার উপর মানসিক চাপ তৈরি করা হয়ে যাবে। আমি বুকে হাত রেখে সততার সঙ্গে বললাম, তার যাকে উপযুক্ত মনে হয়, তাকেই যেন খেলানো হয়।
“যদি আমি হই, তবে আমিই খেলব। আর যদি অন্য কেউ হয়, তবে সে-ই খেলবে। আমি শুধু বিশ্বকাপটা জিততে চাই। আপনি যদি আমাকে নেন, তবে শরীর ভেঙে যাওয়ার শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়ে যাব।”
কথাটা বলতে বলতেই চোখে জল এসে গিয়েছিল। নিজেকে ধরে রাখতে পারলাম না। মুহূর্তের সেই আবেগে ভেসে গিয়েছিলাম।
ম্যাচের ঠিক আগে টিম টকের সময় সাবেল্লা ঘোষণা করলেন, এনজো পেরেজ আজ শুরু থেকে খেলবে, কারণ সে শতভাগ ফিট। আমি এই সিদ্ধান্ত মাথা পেতে মেনে নিয়েছিলাম। ম্যাচের আগে এবং দ্বিতীয়ার্ধের মাঝেও আমি ইনজেকশন নিয়ে রেখেছিলাম, যাতে সাইডবেঞ্চ থেকে ডাক এলেই মাঠে নামতে পারি।
কিন্তু সেই ডাক আর আসেনি। আমরা বিশ্বকাপটা হেরে গেলাম। আর আমার কিছুই করার ছিল না। সেই দিনটা ছিল আমার জীবনের কঠিনতম দিন। ম্যাচের পর সংবাদমাধ্যম আমার না খেলা নিয়ে নানারকম নোংরা রটনা রটিয়েছিল। কিন্তু আজ আমি যা বলছি, সেটাই পরম সত্য।
আজও যে স্মৃতি আমাকে তাড়িয়ে বেড়ায়, তা হলো সাবেল্লার সামনে আমার কান্নায় ভেঙে পড়ার মুহূর্ত। আজও নিজেকে প্রশ্ন করি— উনি কি ভেবেছিলেন যে আমি নার্ভাস হয়ে কেঁদে ফেলেছিলাম?
নার্ভাস হইনি। সেই মুহূর্ত আমার কাছে এতই মূল্যবান ছিল, যে আবেগপ্রবণ হয়ে কেঁদে ফেলেছিলাম। আমরা অসম্ভব সেই স্বপ্নটা ছুঁয়ে ফেলার কত কাছাকাছি ছিলাম!
আমাদের বাড়ির দেয়ালগুলো নাকি ধবধবে সাদা হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু আমার যতদূর মনে পড়ে, সেগুলো কখনওই সাদা ছিল না। প্রথমে ছিল ধূসর, আর তারপর কাঠকয়লার কালিতে পুরো কালো হয়ে গিয়েছিল। আমার বাবা একজন কয়লা শ্রমিক ছিলেন, তবে খনির শ্রমিক নন। তিনি আমাদের বাড়ির পেছনেই কাঠকয়লা তৈরি করতেন। আপনারা কখনো কাঠকয়লা তৈরি হতে দেখেছেন? বার্বিকিউ করার জন্য দোকান থেকে যে কয়লার ছোট-ছোট প্যাকেটগুলো কেনেন, সেগুলো তো আকাশ থেকে পড়ে না; বানাতে হয়। আর সত্যি বলতে, এটা ভীষণ ময়লা একটা কাজ। আমাদের উঠোনের একটা টিনের চালের নিচে বাবা কয়লার টুকরোগুলো বস্তায় ভরে বাজারে বিক্রির জন্য তৈরি করতেন। আর এই কাজে বাবার ছিল দু’জন খুদে হেল্পার—আমি আর আমার ছোট বোন। স্কুল শুরু হওয়ার আগে আমরা ঘুম থেকে উঠে বাবাকে সাহায্য করতাম। তখন আমাদের বয়স মোটে নয় কি দশ বছর— কয়লার বস্তা ভরার জন্য একদম আদর্শ বয়স, কারণ এটাকে আমরা একটা খেলার মতো বানিয়ে নিয়েছিলাম। যখন কয়লা বোঝাই ট্রাক আসত, আমাদের সেই বস্তাগুলো বসার ঘর দিয়ে টেনে নিয়ে সদর দরজা দিয়ে বের করতে হতো। ফলে সময়ের সঙ্গে-সঙ্গে আমাদের পুরো ঘরটাই কালচে হয়ে গিয়েছিল।
কিন্তু এভাবেই ভাত জুটত আমাদের। এভাবেই বাবা আমাদের মাথা গোঁজার ঠাঁইটুকু, আমাদের বসত-বাড়িটাকে, দেনার দায়ে বিক্রি হয়ে যাওয়া থেকে বাঁচিয়েছিলেন।
আমি যখন খুব ছোট, তখন আমার বাবা-মা বেশ ভালোই দিন কাটাচ্ছিলেন। কিন্তু এরপর আমার পরোপকারী বাবা একজনের উপকার করতে যাওয়ায়, আমাদের পুরো জীবনটাই ওলটপালট হয়ে গেল। এক বন্ধু বাবাকে অনুরোধ করেছিল তার বাড়ির ঋণের জামিনদার হতে। বাবা তাকে বিশ্বাস করেছিলেন সরল মনে। কিন্তু সেই লোকটা একসময় কিস্তি দেওয়া বন্ধ করে দিয়ে, হঠাৎ উধাও হয়ে গেল। ব্যাংক তখন সরাসরি এসে ধরল আমার বাবাকে। নিজের পরিবারের ভাত-কাপড়ের বন্দোবস্ত করার পাশাপাশি একসঙ্গে দুটো বাড়ির ঋণের বোঝা টানতে গিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়লেন বাবা।
বাবার প্রথম ব্যবসা কিন্তু কয়লার ছিল না। তিনি আমাদের বাড়ির সামনের ঘরটাকে একটা ছোট দোকানঘর বানাতে চেয়েছিলেন। কিনে আনতেন, ব্লিচ, ক্লোরিন, সাবান আর লিকুইড ক্লিনারের বড়-বড় ড্রাম। তারপর, সেগুলো ছোট-ছোট বোতলে ভরে আমাদের ডাইনিং রুম থেকে বিক্রি করতেন। আমাদের পাড়ার লোকজন, কেউ চড়া দামে দোকান থেকে দামি লিকুইড ক্লিনার কিনতে যেত না। সবাই চলে আসত দি মারিয়াদের বাড়িতে। আমার মা খুব কম দামে এইসব সামগ্রী বিক্রি করতেন।
সবকিছু চলছিল ভালোই। বাধ সাধলাম স্বয়ং আমি। বেশ মনে পড়ে, একবার নিজেকে প্রায় মেরেই ফেলার উপক্রম করেছিলাম! সত্যি বলতে, আমি ছোটবেলায় এক নম্বরের বিচ্ছু ছিলাম! আমার স্বভাব খারাপ ছিল না, কিন্তু আমার শরীরে এনার্জি ছিল অতিরিক্ত। আমি ছিলাম হাইপার-অ্যাক্টিভ। তো একদিন মা যখন ‘দোকানে’ বিক্রিবাট্টা নিয়ে ব্যস্ত, আমি তখন ওয়াকারে চড়ে খেলছিলাম। খদ্দেরদের সুবিধার্থে সদর দরজা খোলাই ছিল। মায়ের মনোযোগ একটু এদিক থেকে ওদিক হতেই হাঁটা মারলাম ওয়াকার নিয়ে… দুনিয়া ঘুরে দেখার শখ জেগেছিল আমার !
সোজা গিয়ে হাজির হলাম রাস্তার মাঝখানে। মা একরকম প্রাণপণ ছুটে এসে চলন্ত গাড়ির সামনে থেকে আমাকে টেনে আনেন। মা যেভাবে গল্পটা বলেন, তাতে মনে হয় যেন কোনো সিনেমার দৃশ্য ছিল। দি মারিয়াদের ক্লিনিং শপের সেখানেই ইতি ঘটল। মা, বাবাকে স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন যে এই কাজ বড্ড ঝুঁকিপূর্ণ, আমাদের অন্য কিছু করতে হবে।
এরপর বাবা সেই লোকটার সন্ধান পান, যে সান্তিয়াগো দেল এস্তেরো থেকে কয়লা বোঝাই ট্রাক নিয়ে আসত। কয়লা কিনে ব্যবসা শুরু করার মতো পুঁজিও আমাদের ছিল না! বাবা সেই ট্রাকমালিককে অনেক বুঝিয়ে রাজি করালেন যেন প্রথম কয়েক দফার মাল ধারে দেওয়া হয়। তাই ছোটবেলায় আমি বা আমার বোন যখনই কোনো চকোলেট বা খেলনার বায়না ধরতাম, বাবা মজা করে বলতেন, “আমি একসঙ্গে দুটো বাড়ির ঋণ আর এক ট্রাক কয়লার দাম শোধ করছি!”
আমার মনে আছে, একদিন কনকনে শীত আর বৃষ্টির মধ্যে আমি বাবার সঙ্গে টিনের চালের নিচে কয়লা বস্তায় ভরছিলাম। আমাদের মাথার উপর শুধু ওই টিনের ছাউনিটুকুই সম্বল ছিল। কাজটা ছিল বড্ড কঠিন। কয়েক ঘণ্টা পর আমি স্কুলে চলে যেতাম। স্কুলের ভিতরটা বেশ গরম থাকত। কিন্তু বাবাকে সারাদিন ওই ঠান্ডাতেই কাজ করতে হতো। কারণ, যেদিন কয়লা বিক্রি হবে না, সেদিন খাওয়া জুটবে না আমাদের। কিন্তু আমার মনে আছে, আমি মনে মনে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতাম: কোনো এক দিন সময় ঠিকই বদলাবে।
এই সবকিছুর জন্য ফুটবলের কাছে আমি চিরঋণী। মাঝে-মাঝে অতি চঞ্চল বা বিচ্ছু হওয়াটাও কাজে দেয়! আমি খুব ছোটবেলাতেই ফুটবলে লাথি মারা শুরু করি। মা’কে একেবারে অতিষ্ঠ করে তুলেছিলাম। আমার যখন চার বছর বয়স, মা আমাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে গিয়ে বলেছিলেন, “ডাক্তারবাবু, ও তো এক মুহূর্তের জন্যও দৌড়াদৌড়ি থামায় না। আমি এখন কী করব?”
তিনি ছিলেন খাঁটি আর্জেন্টাইন ডাক্তার, তাই স্বভাবসুলভভাবেই উত্তর দিয়েছিলেন, “কী করবেন? ওকে ফুটবলে দিয়ে দিন।”
এভাবেই আমার ফুটবল কেরিয়ারের শুরু। সেই যে ফুটবলের ভূত চাপল মাথায়, তারপর থেকে এই ছিল আমার ধ্যানজ্ঞান। আমি এত খেলতাম যে প্রতি দুই মাস পর পর আমার বুটজোড়া ছিঁড়ে চৌচির হয়ে যেত। নতুন বুট কেনার সামর্থ্য আমাদের ছিল না, তাই মা ‘পক্সির্যান’ আঠা দিয়ে ওগুলো কোনোমতে জুড়ে দিতেন। আমার যখন সাত বছর বয়স, আমি বোধহয় বেশ ভালোই খেলতাম; কারণ সেবার পাড়ার দলের হয়ে আমি ৬৪টি গোল করেছিলাম।
একদিন মা জানালেন, রেডিও স্টেশন থেকে নাকি আমার সঙ্গে কথা বলতে চায়। আমরা রেডিও স্টেশনে গেলাম, কিন্তু আমি এতটাই লাজুক ছিলাম যে মুখ দিয়ে কথাই সরছিল না। সে বছরই আমার বাবার কাছে ‘রোজারিও সেন্ট্রাল’-এর যুব দলের কোচের ফোন আসে। তারা আমাকে নাকি তাদের ক্লাবে খেলাতে চাইছে। খুব রগড়ের ব্যাপার ছিল। কারণ আমার বাবা ছিলেন ‘নিউয়েলস ওল্ড বয়েজ’-এর কট্টর সমর্থক। আর মা ছিলেন ‘রোজারিও সেন্ট্রাল’-এর অন্ধ ভক্ত। রোজারিও শহরের বাসিন্দা না হলে, এই দুই ক্লাবের চিরকালীন রেষারেষি যে কোন পর্যায়ে যেতে পারে, তা বোঝা অসম্ভব। এ যেন জীবন-মরণ সমস্যা। যখন ডার্বি ম্যাচ হতো, মা-বাবা একে অপরের সামনে বসে প্রতিটি গোল চিৎকার করে সেলিব্রেট করতেন, আর যার দল জিতত তিনি পুরো এক মাস ধরে অন্যজনকে টিটকিরি দিতেন।
কাজেই সেন্ট্রাল থেকে যখন আমার ডাক এল, মায়ের আনন্দের সীমা ছিল না। বাবা বললেন, “আরে, জায়গাটা তো অনেক দূরে, প্রায় নয় কিলোমিটার! আমাদের কোনো গাড়িও নেই! আমি তো বুঝতে পারছি না, ওকে অত দূরে নিয়ে যাব কীভাবে?”
মা বলে উঠলেন, “না, না! তুমি একদম ভেবো না, আমি ওকে নিয়ে যাব! কোনো সমস্যা হবে না!”
আর এভাবেই জন্ম হলো ‘গ্রাসিয়েলা’র।
গ্রাসিয়েলা ছিল একটা মরচে ধরা পুরোনো হলুদ রঙের সাইকেল, যেটায় চড়িয়ে মা আমাকে প্রতিদিন অনুশীলনে নিয়ে যেতেন। সামনে একটা ছোট ঝুড়ি ছিল, আর পিছনে বসার সামান্য জায়গা। কিন্তু একটা সমস্যা দেখা দিল, কারণ আমার ছোট বোনকেও আমাদের সঙ্গে যেতে হতো। তাই বাবা কাঠ দিয়ে একটা ছোট বসার তক্তা বানিয়ে সাইকেলের একপাশে ঝুলিয়ে দিলেন, যেখানে আমার বোন বসত।
একবার দৃশ্যটা কল্পনা করুন: একজন মহিলা সাইকেল চালাচ্ছেন, পিছনে একটা ছোট ছেলে, পাশে একটা ছোট মেয়ে, আর সামনের ঝুড়িতে ফুটবল বুট আর কিছু হালকা খাবারের ব্যাগ। চড়াই-উতরাই পেরিয়ে, বিপজ্জনক সব মহল্লার মধ্যে দিয়ে— বৃষ্টিতে, ঠান্ডায়, অন্ধকারে— কোনো কিছুই আমার মাকে থামাতে পারেনি। মা শুধু সাইকেলের প্যাডেল ঘুরিয়েই গিয়েছেন।
গ্রাসিয়েলা আমাদের পৌঁছে দিয়েছিল, ঠিক যেখানে আমরা যেতে চেয়েছিলাম।
কিন্তু সত্যি বলতে, সেন্ট্রালে আমার শুরুর দিনগুলো মোটেও সহজ ছিল না। আমার মা না থাকলে, হয়তো ফুটবল খেলাই ছেড়ে দিতাম। যখন আমার বয়স ১৫, আমার উচ্চতা বাড়ছিল না, আর আমাদের কোচ ছিলেন কিছুটা খ্যাপাটে স্বভাবের। তিনি শারীরিকভাবে শক্তিশালী, আগ্রাসী খেলোয়াড় পছন্দ করতেন। আমার আবার খেলার ধরন ছিল আলাদা। একদিন অনুশীলনের সময় বক্সের ভেতর একটা হেড নেওয়ার জন্য আমি লাফাইনি। অনুশীলন শেষে কোচ সব খেলোয়াড়কে গোল করে দাঁড় করালেন এবং আমার দিকে ঘুরে দাঁড়ালেন। সবার সামনে বললেন, “তুমি একটা কাপুরুষ। তুমি ক্লাবের কলঙ্ক। তোমার দ্বারা জীবনে কিচ্ছু হবে না। তুমি একটা ব্যর্থ মানুষ হিসাবেই হারিয়ে যাবে।”
ভেঙে চুরমার হয়ে গিয়েছিলাম। তার কথা শেষ হওয়ার আগেই সতীর্থদের সামনেই আমি কাঁদতে-কাঁদতে দৌড়ে পালিয়েছিলাম মাঠ ছেড়ে। বাড়ি ফিরে সোজা নিজের ঘরে গিয়ে দরজা বন্ধ করে কাঁদতে লাগলাম। মা বুঝলেন কিছু একটা গড়বড় হয়েছে, কারণ প্রতিদিন অনুশীলন থেকে ফিরে আমি আবার রাস্তায় খেলতে যেতাম। মা ঘরে এসে জানতে চাইলেন কী হয়েছে। আমি সত্যিটা বলতে ভয় পাচ্ছিলাম, কারণ আমার ভয় ছিল মা যদি জানতে পারেন, তবে এখনই সাইকেল চালিয়ে গিয়ে কোচের কলার চেপে ধরবেন। মা এমনিতে খুব শান্ত মানুষ ছিলেন, কিন্তু তাঁর সন্তানদের গায়ে আঁচ লাগলে আর রক্ষে থাকত না!
আমি মাকে মিথ্যা বললাম যে, মাঠে একটা মারামারি হয়েছে। কিন্তু হাজার হলেও, মা তো! মিথ্যাটা ধরে ফেললেন। তিনি আমার এক বন্ধুর মাকে ফোন করে আসল কথাটা জানলেন।
মা যখন ঘরে ফিরে এলেন, আমি তখনও কাঁদছি। আমি বললাম– আমি আর ফুটবল খেলব না। পরের দিন আমি ঘর থেকে বেরোতে পারছিলাম না। অপমানে স্কুলেও যাইনি । কিন্তু মা এসে আমার বিছানার পাশে বসলেন। বললেন, “তুমি মাঠে ফিরবে, আনহেল। আজই যাবে। তোমাকে ওই কোচের সামনে নিজেকে প্রমাণ করতে হবে।”
সেদিন আমি অনুশীলনে ফিরলাম। একটা আজব কাণ্ড ঘটল। আমার সতীর্থরা আমাকে নিয়ে কোনো ঠাট্টা-তামাশা করেনি। বরং, তারা আমাকে সাহায্য করল। বাতাসে বল ভাসলে ডিফেন্ডাররা আমাকে অনায়াসে হেড করার সুযোগ দিচ্ছিল। তারা নিশ্চিত করতে চাইছিল যেন আমি মানসিকভাবে ভেঙে না পড়ি। ফুটবল বড্ড প্রতিযোগিতাপূর্ণ খেলা, বিশেষ করে লাতিন আমেরিকায়; যেখানে সবাই একটু ভালো জীবনের আশায় মরিয়া হয়ে লড়াই করে। কিন্তু আমি সেই দিনটার কথা ভুলব না— যেদিন আমার সতীর্থরা আমার মনের অবস্থা বুঝতে পেরে আমাকে আগলে রেখেছিল।
আমি ছিলাম বড্ড রোগা আর হালকা গড়নের। ১৬ বছর বয়সেও আমি সেন্ট্রালের মূল দলে জায়গা পাইনি। বাবা চিন্তিত হয়ে পড়লেন। একদিন রাতে আমরা ডাইনিং টেবিলে আলোচনায় বসলাম। বাবা বললেন, “তোমার সামনে তিনটি পথ খোলা আছে: হয় তুমি আমার সঙ্গে কয়লার কাজে লেগে যাও, নয় লেখাপড়া শেষ করো, আর না হয় ফুটবলে আর একটা বছর শেষ চেষ্টা করে দ্যাখো। কিন্তু যদি এবারও কিছু না হয়, তবে তোমাকে আমার সঙ্গে কাজে আসতেই হবে।”
চুপ করে রইলাম। বড় জটিল পরিস্থিতি। আমাদের তখন টাকার খুব দরকার। তখনই মা বললেন, “ফুটবলে আর একটা বছর।”
তখন জানুয়ারি মাস। আর ঠিক সেই বছরেরই ডিসেম্বর মাসে, একদম শেষ মুহূর্তে, রোজারিও সেন্ট্রালের হয়ে ‘প্রাইমেরা ডিভিশন’-এ আমার অভিষেক ঘটে।
সেদিন থেকেই আমার পেশাদার ক্রীড়াজীবন শুরু হয়। কিন্তু আসল লড়াইটা শুরু হয়েছিল তারও অনেক আগে— মায়ের সেই আঠা দিয়ে বুট জোড়া লাগানো আর বৃষ্টি মাথায় নিয়ে গ্রাসিয়েলার প্যাডেল ঘোরানোর দিনগুলো থেকে। আর্জেন্টিনার মাটিতে পেশাদার ফুটবলার হওয়ার পরেও লড়াইটা ফুরিয়ে যায়নি। দক্ষিণ আমেরিকার বাইরের মানুষের পক্ষে এই অভিজ্ঞতা অনুধাবন করা কঠিন। বিশ্বাস করতে হলে আপনাকে এই পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে যেতে হবে।
কলম্বিয়ার ক্লাব ‘আতলেতিকো নাসিওনাল’-এর বিরুদ্ধে লিবার্তোদোরেসের একটা অ্যাওয়ে ম্যাচের কথা আমি কোনোদিন ভুলব না। সেখানকার বিমানযাত্রা প্রিমিয়ার লিগ বা লা-লিগার মতো বিলাসবহুল নয়। এমনকি বুয়েনস আইরেসে খেলার মতোও নয়। কারণ সেই সময়ে রোজারিওতে কোনো আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ছিল না। একটা ছোট রানওয়েতে যে বিমান দাঁড়িয়ে থাকত, চোখ বুজে তাতেই চড়ে বসতে হতো— কোনো প্রশ্ন করার সুযোগ ছিল না।
আমরা কলম্বিয়া যাওয়ার জন্য বিমানবন্দরে পৌঁছে দেখি, রানওয়েতে একটা বিশাল কার্গো বিমান দাঁড়িয়ে আছে! ভারী জিনিসপত্র পারাপার করার জন্য পিছনে বড় র্যাম্প থাকা যে বিমানগুলো হয়, ঠিক সেইরকম। বিমানটার নাম ছিল ‘হারকিউলিস’।
বিমানের পিছনের র্যাম্পটা নেমে এলো, আর কর্মীরা তার ভেতরে গাদা গাদা তোশক বোঝাই করতে লাগল। আমরা খেলোয়াড়রা একে অপরের মুখের দিকে তাকাচ্ছিলাম— হচ্ছেটা কী?
আমরা যখন বিমানে উঠতে গেলাম, কর্মীরা বলল, “না ভাইলোগ, তোমরা পিছনের দিকে যাও। আর এই নাও, এগুলো কানে লাগিয়ে নাও।”
বিমানের বিকট আওয়াজ থেকে বাঁচতে আমাদের বিশাল মিলিটারি হেডফোন দেওয়া হ’ল। আমরা সেই কার্গো প্ল্যাটফর্মে চড়লাম; বসার জন্য সামান্য কয়েকটা সিট আর মাটিতে শোওয়ার জন্য তোশক পাতা। ওই অবস্থায় আট ঘণ্টার এক দীর্ঘ যাত্রা! র্যাম্পটা বন্ধ হতেই চারপাশ ঘুটঘুটে অন্ধকার হয়ে গেল। আমরা তোশকের ওপর হেডফোন কানে দিয়ে শুয়ে রইলাম, একে অপরের কথাও শুনতে পাচ্ছিলাম না। প্লেনটা যখন টেক-অফ করতে শুরু করল, আমরা তোশকসহ পিছলে সোজা বিমানের পেছনের দিকে চলে যেতে লাগলাম! তখন আমার এক সতীর্থ চিৎকার করে বলল, “খবরদার! কেউ যেন ওই বড় লাল বোতামটায় হাত দিবি না! পেছনের দরজা খুলে গেলে আমরা সবাই এক নিমেষে হাওয়ায় উড়ে যাব!”
অবিশ্বাস্য এক অভিজ্ঞতা! নিজে না দেখলে কেউ বিশ্বাস করবে না। তবে আমার সতীর্থদের জিজ্ঞেস করলেই জানতে পারবেন, এটা সত্যিই ঘটেছিল। ওটাই ছিল আমাদের ‘প্রাইভেট জেট’—আমাদের হারকিউলিস!
তবুও, এই কথাগুলো ভাবলে আমার মন আনন্দে ভরে যায়। আর্জেন্টিনায় ফুটবলার হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেতে হলে যা-যা করা দরকার, তার সবকিছু করতে হবে। যে বিমানই আসুক না কেন, বিনা বাক্যব্যয়ে তাতেই চড়ে বসতে হবে।
অবশেষে, যদি সুযোগ আসে, ওয়ান-ওয়ে টিকিট কেটে ইউরোপের বিমানে উঠতে হবে। আমার জন্য সেই সুযোগটা এনে দিয়েছিল পর্তুগালের ক্লাব বেনফিকা। অনেকে হয়তো আমার কেরিয়ারের গ্রাফ দেখে ভাবেন, “বাহ্! বেনফিকা, তারপর রিয়াল মাদ্রিদ, ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড, পিএসজি…” দেখতে বেশ সহজ মনে হয়। কিন্তু এর অন্তরালে কত কী ঘটে গেছে, তা কেউ জানে না। ১৯ বছর বয়সে যখন বেনফিকায় গেলাম, প্রথম দুই সিজন আমি খেলার সুযোগই পাচ্ছিলাম না। আমার বাবা কাজ ছেড়ে আমার সাথে পর্তুগাল চলে এসেছিলেন। আর মাকে অতল সমুদ্রের ওপারে একা ফেলে আসতে হয়েছিল। অনেক রাতে আমি বাবাকে ফোনের ওপাশে ফুঁপিয়ে কাঁদতে শুনতাম। মায়ের জন্য খুব কষ্ট হতো বাবার।
মাঝে-মধ্যে মনে হতো, ইউরোপে আসাটা আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল ছিল। বেঞ্চে বসে থাকতে থাকতে ক্লান্ত হয়ে একসময় সব ছেড়েছুড়ে বাড়ি ফিরে যেতে চেয়েছিলাম। ঠিক তখনই, এল ২০০৮ সালের অলিম্পিক। জীবনটা বদলে গেল আমার। বেনফিকায় নিয়মিত না খেলা সত্ত্বেও আর্জেন্টিনা দল আমাকে অলিম্পিক স্কোয়াডে ডেকে নিল। আমি সেই ঋণ কোনোদিন শোধ করতে পারব না। সেই টুর্নামেন্টেই আমার সুযোগ হ’ল লিও মেসির পাশে খেলার— সেই ভিনগ্রহের ফুটবলার, সেই জাদুকর। আমার ফুটবল জীবনের সবচেয়ে আনন্দের সময় ছিল সেইদিন। আমার কাজ ছিল শুধু ফাঁকা জায়গায় দৌড়ানো। আমি দৌড় শুরু করলেই বল ম্যাজিকের মতো ঠিক আমার পায়ে এসে পৌঁছাত।
লিওর চোখ দুটো আমাদের মতো নয়। আমরা শুধু ডানে-বাঁয়ে দেখি, মানুষের মতো। কিন্তু ও পুরো মাঠটাকে পাখির চোখ দিয়ে উপর থেকে দেখতে পায়। আমি জানি না এটা কীভাবে সম্ভব।
নাইজেরিয়ার বিরুদ্ধে ফাইনালে আমরা পৌঁছালাম। সম্ভবত আমার জীবনের সবচেয়ে অবিশ্বাস্য দিন। ফাইনালে গোল করে আর্জেন্টিনার হয়ে অলিম্পিক সোনা জেতা… সেই অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করার সাধ্য আমার নেই।
বুঝতে হবে, আমি তখন মাত্র ২০ বছরের এক তরুণ, যে কিনা বেনফিকার প্রথম দলেই সুযোগ পায় না। পরিবারটা দুই ভাগে বিভক্ত। এক চরম হতাশার মুহূর্তে আর্জেন্টিনা দল আমাকে ডেকেছিল। আর ঠিক দুই বছরের মাথায় আমি অলিম্পিক সোনা জিতলাম, বেনফিকার নিয়মিত খেলোয়াড় হলাম এবং রিয়াল মাদ্রিদের মতো ক্লাবে ডাক পেলাম।
শুধু আমার একার নয়, আমার পুরো পরিবার, বন্ধু-বান্ধব আর সতীর্থদের জন্য এক পরম গর্বের মুহূর্ত ছিল। লোকে বলে, আমার বাবা নাকি আমার চেয়েও অনেক বড় ফুটবলার ছিলেন, কিন্তু তরুণ বয়সে হাঁটু ভেঙে যাওয়ার সেই স্বপ্নও ভেঙে খান-খান হয়ে গিয়েছিল। সকলে বলে, আমার দাদু নাকি বাবার চেয়েও তুখোড় খেলতেন, কিন্তু এক রেল দুর্ঘটনায় দুটো পা হারিয়ে তার স্বপ্নেরও সলিল-সমাধি ঘটে।
আমার স্বপ্নটাও কতবার যে মরতে মরতে বেঁচে গিয়েছে! কিন্তু বাবা সেই টিনের চালের নিচেই কাজ করে গিয়েছেন… মা সাইকেলের প্যাডেল ঘুরিয়ে গিয়েছেন… আর আমি শুধু ফাঁকা জায়গায় দৌড়ে গিয়েছি…
আপনারা ভাগ্যে বিশ্বাস করেন কি না জানি না, তবে রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে যখন আমি আমার প্রথম গোলটি করি, জানেন তো প্রতিপক্ষ দলের নাম কী ছিল?
হারকিউলিস সিএফ।
আমরা সত্যিই এক দীর্ঘ পথ পেরিয়ে এসেছি।
এখন নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন, বিশ্বকাপের ফাইনালের আগে সাবেল্লার সামনে কেন আমি কেঁদে ফেলেছিলাম। ওটা কোনো ভয় বা নার্ভাসনেস ছিল না। নিজের কেরিয়ার বা প্রথম একাদশে থাকা নিয়েও আমার কোনো সংশয় ছিল না।
দিব্যি করে বলছি, আমি শুধু চেয়েছিলাম আমাদের সেই স্বপ্নটা যেন সত্যি হয়। আমি চেয়েছিলাম আমাদের দেশ যেন আমাদের কিংবদন্তি হিসাবে মনে রাখে। আমরা সাফল্যের ঠিক দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে ছিলাম…
তাই আর্জেন্টিনার সংবাদমাধ্যমে যখন আমাদের দল নিয়ে বড্ড নেতিবাচক আলোচনা ও সমালোচনা দেখি, আমার বুকটা ফেটে যায়। এই বিষাক্ত সমালোচনা মোটেও কাম্য নয়। আমরা দিনশেষে রক্তমাংসের মানুষ, আমাদের জীবনেও এমন অনেক ঝড়-ঝাপটা যায় যা সাধারণ মানুষ দেখতে পায় না।
বাস্তবিক অর্থে, বাছাইপর্বের শেষ ম্যাচগুলোর আগে আমি একজন মনস্তত্ত্ববিদের শরণাপন্ন হয়েছিলাম। তখন মানসিক দিক থেকে খুব কঠিন একটা সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছিলাম। সাধারণত, এই সময়ে পরিবারের উপর ভরসা রাখি, কিন্তু জাতীয় দলের এই প্রচণ্ড চাপ সামলাতে এবার আমার একজন পেশাদার মানুষের সাহায্যের প্রয়োজন ছিল— যা আমাকে দারুণভাবে সাহায্য করেছে। শেষ দুই ম্যাচে মাঠে নেমেছিলাম, অনেক ফুরফুরে আর চাপমুক্ত হয়ে। নিজেকে মনে করাতাম যে, আমি বিশ্বের অন্যতম সেরা দলের একজন খেলোয়াড়, আমি আমার দেশের প্রতিনিধিত্ব করছি এবং শৈশবের সেই স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখছি। পেশাদার জগতের ইঁদুরদৌড়ে আমরা অনেক সময় এই সহজ সত্যগুলো ভুলে যাই। খেলাটা আবারও আমার কাছে স্রেফ একটা ‘খেলা’ হয়ে উঠেছিল।
আজকাল মানুষ ইনস্টাগ্রাম বা ইউটিউবে কেবল ট্রফিজয় আর শেষ ফলাফলটাই দেখে, কিন্তু তার পিছনে কতটা আত্মত্যাগ আছে বা কতটা মূল্য চোকাতে হয়েছে, সেইসব তাদের চোখে পড়ে না। তারা চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ট্রফি হাতে আমার মেয়ের সঙ্গে হাসিমুখে ছবি দেখে ভাবে, সবকিছু কত নিখুঁত! কিন্তু তারা জানে না, এই ছবিটা তোলার ঠিক এক বছর আগে আমার মেয়ে প্রিম্যাচিওর অবস্থায় জন্ম নিয়েছিল এবং হাসপাতালের আইসিইউ-তে মৃত্যুর সাথে লড়াই করে দুমাস কাটাতে হয়েছে।
হয়তো তারা ট্রফি নিয়ে আমার কেঁদে ফেলার ছবি দেখে ভাবে, ফুটবলের আবেগে আমি কাঁদছি। কিন্তু বাস্তবে, আমার মেয়ে যে আমার কোলে ফিরে এসেছে, এসে সেই আনন্দ উদযাপনে শরিক হতে পেরেছে— আমি কাঁদছিলাম সেই পরম কৃতজ্ঞতায়।
তারা বিশ্বকাপের ফাইনাল দেখে এবং স্ক্রিনে শুধু একটা ফলাফল ভেসে উঠতে দেখে: ০-১।
কিন্তু সেই মুহূর্ত পর্যন্ত পৌঁছাতে আমাদের কতজনকে কতটা রক্তজল করা লড়াই করতে হয়েছে, তা তারা দেখে না।
তারা দেখে না আমাদের বসার ঘরের সাদা দেয়ালগুলো কীভাবে কালো হয়ে গিয়েছিল।
তারা দেখে না টিনের চালের নিচে বাবার সেই হাড়ভাঙা খাটুনি।
তারা দেখে না সন্তানদের একবেলা খাবারের জন্য বৃষ্টিতে, ঠান্ডায়, অন্ধকারে মায়ের সেই ‘গ্রাসিয়েলা’ সাইকেলের চাকা ঘুরিয়ে যাওয়ার গল্প।
তারা হারকিউলিসকে চেনে না।
‘ইন দ্য রেইন, ইন দ্য কোল্ড, ইন দ্য ডার্ক’ হলো আর্জেন্টিনার কিংবদন্তি ফুটবলার আনহেল দি মারিয়ার লেখা আত্মজীবনীমূলক প্রবন্ধ। প্রকাশিত হয়েছিল ‘দ্য প্লেয়ার্স ট্রিবিউন’ পত্রিকায়।


