গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের কথা কে না জানে!
আজ আমরা জানবো আরেক মার্কেজের কথা। আর্জেন্টিনার অভিজ্ঞ ধারাভাষ্যকার এনরিকে মাকায়া মার্কেজ। শত বর্ষ হতে আর মাত্র নয় বছর বাকি। তিনি তাঁর অষ্টাদশ ফিফা বিশ্বকাপ কভার করার প্রস্তুতি নিয়েছেন। প্রায় সত্তর বছর ধরে চলা তাঁর নিজের রেকর্ডটিকে আরও অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন তিনি। রেডিও এবং সাদাকালো টেলিভিশনের যুগ থেকে শুরু করেছিলেন। আজকের তথ্য প্রযুক্তির বিপুল সুবিধার ফুটবল বিশ্বেও ধারাভাষ্য দিয়ে আসছেন।
১৯৫৮ সালে সুইডেন বিশ্বকাপে প্রথম অংশ নেওয়ার পর থেকে মাকায়া টুর্নামেন্টের প্রতিটি আসরে উপস্থিত থেকে প্রতিবেদন তৈরি করেছেন। উত্তর আমেরিকার ২০২৬ বিশ্বকাপেও তিনি এই অসাধারণ ধারাবাহিকতা ধরে রাখবেন। গত বৃহস্পতিবার মেক্সিকো, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং কানাডায় এক যোগে শুরু হয়েছে এবারের আয়োজন।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শারীরিক অসুস্থতার কারণে এই কিংবদন্তি ধারাভাষ্যকারকে জনসমক্ষে খুব একটা দেখা যায়নি। তবে বিশ্বকাপ হলে শরীরের সুস্থতার কথা মাথায় না রেখেই তিনি অংশ নেয়ার জন্য অস্থির হয়ে পড়েন। গত শুক্রবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার আগে এক সাক্ষাৎকারে মাকায়া বলেন, “আমার মনে হয় বিশ্বকাপ ফুটবলের আসরে যুক্ত থাকাটা আমার দায়িত্ব।” সেখানে তিনি ডিরেক্ট টিভি, ডি স্পোর্টস এবং ডি স্পোর্টস রেডিওর ধারাভাষ্যকার হিসেবে আর্জেন্টিনার দলের সাথে থাকবেন।
২০২২ সালে ফিফা মাকায়াকে সবচেয়ে বেশি বিশ্বকাপ দেখা সাংবাদিক হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। তিনি আরও যোগ করেন, “আমি জানি না আর কতদিন পারব সশরীরে থাকতে, তবে আমি প্রতিটি সুযোগ ঠিকঠাক কাজে লাগাবার চেষ্টা করব আজীবন।” তিনি গত সত্তর বছরেরও বেশি সময় ধরে নিজেকে সবার আড়ালে রেখে সাধারণ জীবনযাপন করার চেষ্টা করেছেন। মাকায়া পেলের প্রথম বিশ্বকাপ, আলফ্রেডো ডি স্টেফানোর সাথে তাঁর শৈশবের বন্ধুত্ব, দিয়েগো ম্যারাডোনার সাথে তাঁর দ্বিমত এবং গত কয়েক দশকে ফুটবলের বদলে যাওয়ার নানা স্মৃতিচারণ করেন।

অলীক ভ্রমণ
মাকায়ার তখন মাত্র তেইশ বছর বয়স। বুয়েনোস আইরেসভিত্তিক রেডিও বেলগ্রানো ১৯৫৮ সালে সুইডেনে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপ কভার করার জন্য তাঁকে একটি ছোট দলের অংশ হিসেবে পাঠায়। তিনি আর একটি টুর্নামেন্টও মিস করেননি আজ পর্যন্ত।
স্ক্যান্ডিনেভিয়ায় পৌঁছানো মোটেও সহজ ছিল না। মাকায়া বেশ কয়েকটি ফ্লাইট, ট্রেন ও ফেরির সমন্বয়ে দীর্ঘ এক অলীক ভ্রমণের কথা স্মরণ করেন। তিনি স্মৃতিচারণে বলেন, “এটি ছিল একটি ডগলাস ডিসি-৭ বিমান। বিমানটিকে প্রায় সব জায়গাতেই থামতে হতো। কারণ সেখানে যাওয়ার আর কোনো উপায় ছিল না। এই বিমানের দূরপাল্লার ওড়ার ক্ষমতা ছিল না। আমি ডাকার হয়ে রওনা দিই। ইতালি যাই, তারপর ডেনমার্ক এবং দক্ষিণ সুইডেন হয়ে মালমোতে পৌঁছাই। সম্পূর্ণ অজানা, রোমাঞ্চকর এক অভিজ্ঞতা।”
১৯৫৮ সালের টুর্নামেন্টটি পেলের আত্মপ্রকাশের সাক্ষী ছিল। মাত্র সতের বছর বয়সে ব্রাজিলকে তাদের প্রথম বিশ্বকাপ জয়ের অনুপ্রেরণা সরবরাহ করেছিলেন ফুটবলের রাজা পেলে। মাকায়া বলেন, “তিনি অনন্য শারীরিক ক্ষমতাসম্পন্ন একজন খেলোয়াড় ছিলেন, যা তাঁর সহজাত দক্ষতার বাইরেও দৃশ্যমান ছিল।” পেলে একটা সময়ের পর ফুটবলের কিংবদন্তি হয়ে উঠবেন এই বিষয়টি তখনো বোঝা যায়নি- এই মত জানান মাকায়া।
ডি স্টেফানো সেরা
মাকায়ার মতে, সে সময়ে সবার চেয়ে এগিয়ে থাকা খেলোয়াড় ছিলেন আলফ্রেডো ডি স্টেফানো।আর্জেন্টিনা-বংশোদ্ভূত রিয়াল মাদ্রিদের এই তারকা কখনো বিশ্বকাপ খেলেননি। তথ্যটি জেনে অবাক হতে হয়।
“আমি আলফ্রেডোর বাড়ি থেকে পঞ্চাশ মিটার দূরে থাকতাম। আমি একটা খবরের কাগজের দোকানে বসতাম । তিনি সেখানে এসে পত্রিকা পড়তেন। এরপর তিনি আমাকে ওঁর বাড়িতে নিয়ে যেতেন এবং আমরা ফুটবল খেলতাম। তিনি আমার চেয়ে বয়সে বড় ছিলেন। পরবর্তীতে, তিনি আমার আদর্শ হয়ে ওঠেন।” “আমার কাছে তিনিই সেরা ছিলেন। সেই সময়ে তিনি যাঁদের বিরুদ্ধে খেলতেন, তাঁদের তুলনায় তিনিই সেরা ছিলেন। তবে ডি স্টেফানোর সঙ্গে আমার একটা বন্ধুত্বও ছিল। এই বন্ধুত্ব আমার মতামতকে প্রভাবিত করতে পারে।” সহজ ভাবেই মাকায়া তাঁর পক্ষপাত স্বীকার করেন। বুয়েনোস আইরেসের নিজের এলাকা ফ্লোরেসের সেই শৈশবের স্মৃতির কারণে তাঁর পক্ষে নিরপেক্ষ থাকা কঠিন ছিল।
তিনি প্রায়ই বলে থাকেন, বিংশ শতাব্দীতে ম্যারাডোনা তাঁর নিজস্ব সেরা তিনের তালিকা পূর্ণ করেছেন। তবে ১৯৮৬ মেক্সিকো বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে আর্জেন্টিনার ২-১ ব্যবধানের জয়ের সেই বিখ্যাত “হ্যান্ড অফ গড” গোলটি নিয়ে তিনি বেশি আলোচনা করতে পছন্দ করেন না। তিনি বলেন, “ওই গোলটিকে ঘিরে এমন ভুলভাল গল্প তৈরি করা হয়েছে যার সঙ্গে বাস্তবতার মিল নেই।” তাঁর এই মতামতটি অনেক আর্জেন্টাইনের কাছে এখনও বিতর্কিত। যে আর্জেন্টাইনরা ১৯৮২ সালের ফকল্যান্ড যুদ্ধের পর এই ঘটনাটিকে এক ধরণের প্রকৃতির ন্যায্য বিচার হিসেবে দেখেন, তাঁদের কাছেই এই মন্তব্য বিতর্কিত।
ম্যারাডোনার স্বীকারোক্তি
গণমাধ্যমে ধারাবাহিক কয়েকটি দ্বিমতের ঘটনা ঘটে মাকায়া আর ম্যারাডোনার। ১৯৯৪ সালের মে মাসে ম্যারাডোনা প্রকাশ্যে স্বীকার করেছিলেন, এই সাংবাদিকই সঠিক ছিলেন। কেবল সেই মুহূর্তটির কথা মনে করার সময়ই মাকায়ার চিরচেনা সংযমটুকু লুপ্ত হয়ে যায়।
দিয়েগো একটি সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করেন। একটি টেলিভিশন ক্যামেরা ডাকেন। তিনি ঘোষণা করেন যে মাকায়ার সমালোচনা যুক্তিসঙ্গত ছিল। মাকায়া হাসিমুখে বলেন, “তিনি অন্য কারও জন্য এমনটা করেননি। আর কেউ না। এটা ছিল অসাধারণ, অবিশ্বাস্য।”
বিশ্বকাপের বিবর্তনের দিকে ফিরে তাকিয়ে মাকায়া মনে করেন, আধুনিক টুর্নামেন্টগুলো মূলত তাদের পেছনে থাকা বিপুল পরিমাণ আর্থিক বিনিয়োগের কারণেই এত বিশাল মনোযোগ আকর্ষণ করে। টিকিটের চড়া দাম এবং উত্তর আমেরিকা ২০২৬-এ ব্যবহৃত হতে যাওয়া নতুন ৪৮ দলের ফরম্যাটের কারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ফিফার নিজের প্রাধ্যান্য বাড়ানোর আগ্রাসন যথেষ্ট সমালোচনার মুখে পড়েছে। মাকায়া মন্তব্য করেন, “ফুটবল বিশ্বকাপ কয়েকটি দিক থেকে বিবর্তিত হয়েছে। চিন্তার বিষয় হল, এই বিবর্তন অন্যান্য অনেক দিক থেকে ফুটবলের যে অন্তর্গত স্পিরিট তার প্রভাবকে নষ্ট করে দিয়েছে। ”
সূত্র : বুয়েনোস আইরেস টাইমস


