কুরাসাও। আয়তন ৪৪৪ বর্গ কিলোমিটার। জনসংখ্যা দুই লাখের কম। ভেনিজুয়েলার ৬৫ কিলোমিটার উত্তরের এই দেশ ডাচ ক্যারিবিয়ান দ্বীপ দেশ। প্যাস্টেল রঙা কলোনি আমলের স্থাপত্য এবং ডাইভিং এর জন্য স্বচ্ছ নীল জলের লোভে পর্যটকেরা এই ছোট্ট দেশে আসেন। বিশ্বকাপ ফুটবলের ইতিহাসে আয়তন এবং জনসংখ্যার দিক থেকে এত ছোট দেশ আর কখনো অংশগ্রহণ করেনি। সমৃদ্ধ সংস্কৃতি ইতিহাস এই দেশের আরেকটি সম্পদ। এটি স্বাধীন বা পরাধীন নয়৷ নেদারল্যান্ডস রাজ্যের মধ্যে কুরাসাও একটি স্বায়ত্তশাসিত দেশের মর্যাদা পায় ২০১০ সালে।
কুরাসাওয়ের বিপক্ষ দল জার্মানি কেমন হতে পারে সে সম্পর্কে বাভারিয়ান ফুটবল ওয়ার্কস অনলাইনের ধারণা এই রকম:
জার্মানি সম্পর্কে তিন তথ্য:
১. জার্মানি এর আগে কখনো কুরাসাওয়ের বিপক্ষে খেলেনি।
২. জাতীয় দলের হয়ে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলা শীর্ষ দশ খেলোয়াড়ের তালিকায় বর্তমান সক্রিয় খেলোয়াড়দের মধ্যে কেবল ম্যানুয়েল নয়ার এবং জশুয়া কিমিচ রয়েছেন।
৩.সার্জ গ্যানাব্রি দুর্ভাগ্যবশত বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে গেছেন। বর্তমান সক্রিয় খেলোয়াড়দের মধ্যে একমাত্র তাঁরই সর্বকালের সেরা গোলদাতার শীর্ষ দশ তালিকায় জায়গা করে নেওয়ার ভালো সুযোগ রয়েছে।
কুরাসাও সম্পর্কে তিন তথ্য:
১.এই বছরের আগে কুরাসাও কখনো কোনো ইউরোপীয় দেশের বিপক্ষে খেলেনি। টুর্নামেন্ট শুরু হওয়ার ঠিক আগে তারা স্কটল্যান্ডের কাছে ৪-০ গোলে হেরেছে।
২. বিশ্বকাপে আসার আগে কুরাসাও তাদের বাছাইপর্বের দশ খেলার মধ্যে সাতটিতেই জয় পেয়েছে। এই সংখ্যাটি ২০০৭ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত তাদের জেতা মোট বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের ম্যাচের চেয়ে মাত্র একটি বেশি। এই পরিসংখ্যান তাদের পক্ষে বেশ আশাব্যঞ্জক।
৩. কুরাসাওয়ের জনসংখ্যা আনুমানিক ১,৫৬,০০০ জন। আপনি চাইলে ১৯৫০ সালের মারাকানা স্টেডিয়ামে তাদের সবাইকে বসিয়ে দিতে পারতেন। তারপরেও সংখ্যাটি ওই বছরের ফাইনালের রেকর্ড দর্শক উপস্থিতির (১,৭৩,৮৫০ জন) চেয়ে কম হতো।
বিশিষ্ট জনেরা বলছেন – নিক ভোল্টেমাদে, ডেনিজ উন্দাভ, ফ্লোরিয়ান ভির্টজ এবং জামাল মুসিয়ালার গোলে জার্মানি ৪-০ ব্যবধানে জিতবে।
ডার্ক নিকোলাস ‘ডিক’ অ্যাডভোকাট। আদর করে কুরাসাও জাতীয় দলের ম্যানেজারকে ‘দ্য লিটল জেনারেল’ ডাকেন অনুরাগী, ভক্তরা। নিজে সফল ফুটবলার ছিলেন। দেশে বিদেশী অসংখ্য দলের কোচিং করিয়েছেন। তিন বছর হলো ভার নিয়েছেন কুরাসাও জাতীয় দলের। তিনি এখনই আশা হারাতে রাজি নন। কথায় বলে, আশায় বাঁচে চাষা।
ডিক অ্যাডভোকাট পেশাদার ফুটবলে সম্ভবত এখন সবকিছুই দেখে ফেলেছেন। বর্তমান বয়স ৭৮ বছর। হয়তো ঠিক এই কারণেই তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন- জার্মানির বিরুদ্ধে তাঁর দলের পক্ষে যেকোনো কিছুই করা সম্ভব। “আমাদের সুযোগ আছে। দলের অনেক বড় অ্যাম্বিশন রয়েছে। এই মরিয়া উচ্চাশার কারণে তারা অনেক কিছু অর্জন করতে পারে,” ‘বিল্ড’ পত্রিকার সাথে একটি সাক্ষাৎকারে বরুশিয়া মনশেনগ্লাডবাখের সাবেক কোচ এই জোর দাবি জানান। সেই সাথে জানান টুর্নামেন্টের শুরুর প্রতিপক্ষ হিসেবে জার্মানিকে কেন আদর্শ মনে করছেন কুরাসাওয়ের জন্য: “সরাসরি জার্মানির বিরুদ্ধে খেলা শুরু করা আমাদের জন্য দারুণ ব্যাপার। এই খেলার মাধ্যমে আমরা হাতে কলমে বা পায়ে বলে বুঝতে পারব আমাদের অবস্থান কোথায়। আমাদের লক্ষ্য হলো পরবর্তী রাউন্ডে পৌঁছানো।”
যদিও ‘ব্লু শার্কস’ বা নীল তিমি কুরাসাও আজ বাংলাদেশ সময় রাত এগারোটায় তাদের ইতিহাসের প্রথম বিশ্বকাপ ম্যাচে স্পষ্টভাবেই আন্ডারডগ বা দুর্বল দল হিসেবে মাঠে নামছে, তবুও তারা নিশ্চিতভাবেই জার্মানির অতীত ইতিহাস সম্পর্কে ভালোভাবেই জানে। গত দুই বিশ্বকাপের আসরেই জার্মানি পরাজয় দিয়ে তাদের টুর্নামেন্ট শুরু করেছিল। দুই বারই গ্রুপ পর্বের পরেই বিদায় নিয়ে বাড়ি ফিরে যেতে হয়েছিল।
একটা ফান ফ্যাক্ট শেয়ার করি। কুরোসাও বস অ্যাডভোকাটও ইতিহাস গড়বেন। আজ ম্যাচের দিন ৭৮ বছর ২৬০ দিন বয়স নিয়ে তিনি হবেন বিশ্বকাপের সবচেয়ে প্রবীণ প্রধান কোচ। অ্যাডভোকাট ও জার্মানির প্রধান কোচ জুলিয়ান নাগেলসম্যানের (৩৮ বছর ৩২৬ দিন) বয়সের ব্যবধান ৩৯ বছর ২৯৯ দিন। বিশ্বকাপের ইতিহাসে মুখোমুখি হওয়া দুই কোচের মধ্যে এটাই সর্বোচ্চ বয়সের ব্যবধান।
জার্মানির জাতীয় দলের সবার মধ্যে জাতির হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনার চাপ আছে। কুরাসাও এ যাবৎ বিশ্বকাপের ইতিহাসে ভৌগোলিক ও জনসংখ্যার দিক থেকে সবচেয়ে ছোট দল। তাদের কোনও দলগত চাপ নেই৷ ফলে, নির্ভার ও স্বাভাবিক খেলাই তারা খেলতে পারবেন। ভারহীন খেলার এই স্বাধীনতা একদা পরাক্রমশালী জার্মানি এবং আজকেই প্রথম বিশ্বকাপে খেলতে নামা কুরোসাওয়ের মধ্যকার খেলায় হিসেব বদলে দেয়া কোনও ইতিহাসের জন্ম দিতে পারে। আমরা জানি, ইতিহাসে জাগতিক হিসাবের বাইরে অনেক মুহূর্তের জন্ম হয়। আমরা তেমন মুহূর্ত দেখবার অপেক্ষায় রইলাম।


