একটি প্লাস্টিকের শিল্ড

Date:

আব্বু আমাদের দুই ভাইকে দুই হাতে বুকের ভেতর জড়িয়ে ধরে হাঁটু গেড়ে বসে আছেন।

আমার বয়স ঠিক কত ছিল মনে নেই। কিছু কিছু স্মৃতি বয়স মনে রাখে না। শুধু ভয়টা রেখে দেয়। সেই ভয় অনেক বছর পরেও বুকের কোথাও বসে থাকে। হঠাৎ কোনো শব্দে, কোনো ভিড়ের মধ্যে, কোনো মাঠের গ্যালারি দেখলে সে ভয় মাথা তুলে তাকায়।

সেদিনও তেমনই একটা দিন ছিল।

মোহামেডান-আবাহনীর ফাইনাল খেলা। মাঠ ভর্তি মানুষ। মানুষের গলা, বাঁশির শব্দ, চিৎকার, পতাকা সব মিলিয়ে একধরনের উৎসব। ফুটবল মাঠের উৎসবের একটা আলাদা গন্ধ থাকে। ঘাসের গন্ধ, ঘামের গন্ধ, বাদামের খোসা, ধুলো, আর উত্তেজনায় গরম হয়ে থাকা মানুষের নিঃশ্বাস।

খেলার মাঝখানে হঠাৎ গণ্ডগোল শুরু হলো।

কেউ ঠিক জানে না, গণ্ডগোল আসলে কখন শুরু হয়। শুরু হওয়ার আগের মুহূর্তটা থাকে খুব সাধারণ। মানুষ তখনও খেলা দেখছে। কেউ একজন হয়তো বলছে, “পাস দে, পাস দে।” কেউ দাঁড়িয়ে গেছে। কেউ গালি দিচ্ছে। কেউ হাত নাড়ছে। তারপর হঠাৎ দেখা যায় সবকিছু বদলে গেছে।

মাঠ ছেড়ে খেলোয়াড়েরা দৌড়ে চলে গেল। দর্শকেরা উত্তেজিত হয়ে উঠল। মুহূর্তের মধ্যে পুরো স্টেডিয়াম রণক্ষেত্র হয়ে গেল। দুই দলের সমর্থকদের মারামারি। চারদিকে ইট-পাথরের টুকরা উড়ে আসছে। মানুষের চিৎকার। দৌড়াদৌড়ি। কেউ কাউকে আর চিনছে না।

আব্বু তখন আমাদের জড়িয়ে ধরে বসে আছেন।

একজন বাবা যখন তার সন্তানকে বাঁচানোর চেষ্টা করেন, তখন তার মুখে কোনো নায়কের ভাব থাকে না। থাকে অসহায়ত্ব। ভীষণ অসহায়ত্ব। সেই অসহায়ত্বই হয়তো পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী জিনিস।

আব্বু কিছু বলছিলেন কি না মনে নেই। হয়তো বলছিলেন, “চোখ বন্ধ কর।” হয়তো বলেননি। আমি নিজেই চোখ বন্ধ করে ফেলেছিলাম। কতক্ষণ চোখ বন্ধ ছিল জানি না। শিশুরা সময় মাপতে পারে না। তারা ভয় মাপে।

চোখ খুলে দেখি, একজন পুলিশ কনস্টেবল আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। তার হাতে প্লাস্টিকের শিল্ড। সেই শিল্ডের ওপর একটার পর একটা ইট-পাথরের টুকরা এসে পড়ছে। টক্ টক্ শব্দ হচ্ছে। শব্দটা আজও মনে আছে। যেন কেউ দরজায় কড়া নাড়ছে। কিন্তু সেই দরজার ওপাশে মৃত্যু দাঁড়িয়ে।

পুলিশ কনস্টেবলের নাম জানি না। জানার সুযোগও হয়নি। তিনি আমাদের আত্মীয় ছিলেন না। বন্ধু ছিলেন না। চেনা মানুষও না। কিন্তু সেদিন তিনি দাঁড়িয়েছিলেন। শুধু দাঁড়িয়ে থাকার জন্যও কখনো কখনো মানুষকে সারাজীবন মনে রাখা যায়।

আমার মনে হয়, সেদিন তিনি সত্যিই আমাদের প্রাণ বাঁচিয়েছিলেন।

আব্বু ছিলেন পাগলাটে ফুটবলপ্রেমী। পাগলাটে শব্দটা খারাপ অর্থে বলছি না। কিছু ভালোবাসা সুস্থভাবে ভালোবাসা যায় না। তাতে একটু পাগলামি থাকতেই হয়।

দেশের ফুটবল লিগের খেলা তিনি মাঠে গিয়ে দেখতেন। দলবল নিয়ে যেতেন। মোহামেডানের সমর্থক ছিলেন। সাদা-কালো জার্সির প্রতি তাঁর দুর্বলতা ছিল। ছোটবেলায় কয়েকবার দেখেছি, খেলা দেখে ফেরার পর তাঁর মাথায় আঘাতের দাগ। পাশের বাসা থেকে বরফ চেয়ে আনা হতো। বরফ না থাকলে কখনো ঠান্ডা পানি। পাশের বাসার আন্টি কাচের বোতলে হিমশীতল পানি দিতেন। আমি অতি সাবধানে সেটা বাসায় নিয়ে আসতাম। তখন তো এখনকার মতো প্লাস্টিকের বোতলের যুগ ছিল না। বোতল মানেই ছিল কাচের বোতল। ভেঙে গেলে বিপদ, না ভাঙলে সৌন্দর্য।

সেদিনের সেই ঘটনার পরও আমি আব্বুর সঙ্গে মাঠে খেলা দেখতে গিয়েছি।

অদ্ভুত ব্যাপার হলো, ভয় মানুষকে সব জায়গা থেকে দূরে সরিয়ে দেয় না। কখনো কখনো ভয়ও স্মৃতির অংশ হয়ে যায়। মাঠের ভয়, মাঠের উত্তেজনা, মাঠের আলো সব মিলিয়েই ফুটবল।

মোহামেডানের স্ট্রাইকার সাব্বিরের পা যেদিন খুব খারাপভাবে ভেঙে গেল, খুব বাজে একটা ট্যাকল থেকে সেদিনও আমি আব্বুর সঙ্গে মাঠে ছিলাম। খেলোয়াড়টাকে আমার খুব ভালো লাগত। ডি-বক্সের ভেতর বল পেলেই মনে হতো, গোল হয়ে যাবে। তাঁর পা ভাঙার দৃশ্য দেখে খুব কষ্ট পেয়েছিলাম।

পরে ধানমন্ডির এক ক্লিনিকে তাকে দেখতে গিয়েছিলাম আব্বুর সঙ্গে। কারণ তার পায়ের সার্জারি করেছিলেন আব্বুর বন্ধু ডা. মেহেদী। আব্বুর ভাঙা পায়ের সার্জারিও তিনিই করেছিলেন। সেটা অবশ্য আরেক গল্প। প্রতিটি পরিবারের ভেতরে এমন অনেক আলাদা গল্প থাকে। একটার সঙ্গে আরেকটার সরাসরি সম্পর্ক নেই, কিন্তু তবু সব গল্প মিলেই মানুষটাকে বোঝা যায়।

আমার জন্ম ১৯৮৫ সালে।

জন্মের পর আব্বু আমার ডাকনাম রাখলেন রসি।

বড় হয়ে একদিন তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম,

“তুমি তো ব্রাজিলের সমর্থক। আমার নাম ইতালির একজন ফুটবলারের নামে রাখলে কেন?”

আব্বু খুব স্বাভাবিক গলায় বলেছিলেন,

“পাওলো রসি একজন সেরা স্ট্রাইকার ছিল।”

এইটুকুই। আব্বুর অনেক উত্তর এমন ছিল। ছোট। পরিষ্কার। কিন্তু পরে বুঝতে সময় লাগে।

বড় হয়ে জানলাম, ১৯৮২ সালের ব্রাজিল দলকে অনেকে ইতিহাসের অন্যতম সেরা দল বলে। সক্রেটিস, জিকো, ফালকাও কী সব নাম! সেই ব্রাজিল ইতালির কাছে হেরে বিশ্বকাপ থেকে বাদ পড়ে। আর সেই ম্যাচে হ্যাটট্রিক করেছিলেন পাওলো রসি।

একজন ডাই-হার্ড ব্রাজিল সমর্থক নিজের ছেলের নাম রাখলেন সেই মানুষের নামে, যে তার প্রিয় দলকে হারিয়েছিল।

এই জায়গাটাতেই আব্বুকে আমি সবচেয়ে বেশি বুঝি।

তিনি আসলে ফুটবল ভালোবাসতেন। শুধু দল না। শুধু পতাকা না। শুধু জয় না। ফুটবল। খেলার সৌন্দর্য। প্রতিপক্ষের প্রতিভা। একটি গোলের নান্দনিকতা। একজন স্ট্রাইকারের ক্ষুধা। একজন গোলরক্ষকের ঝাঁপ। একজন খেলোয়াড়ের হেরে গিয়েও বড় হয়ে ওঠা।

দল নিয়ে রেষারেষিতে আনন্দ আছে। তর্ক আছে। মজা আছে। কিন্তু প্রকৃত ফুটবলপ্রেমীরা শেষ পর্যন্ত ফুটবলকেই ভালোবাসে। তারা কোনো দলকে ঘৃণা করে না। কোনো খেলোয়াড়কে ছোট করে না। কারণ তারা জানে, প্রতিপক্ষ না থাকলে নিজের দলের মহিমাও থাকে না।

আমার নিজের স্পষ্ট বিশ্বকাপ স্মৃতি ১৯৯৪ সালের। তখন আমার বয়স আট বছর।

আমরা থাকতাম ধানমন্ডির এক বাসায়। রাত জেগে খেলা দেখা হতো। আব্বুর খেলা দেখার একটা আলাদা নিয়ম ছিল। তিনি একা খেলা দেখতে পছন্দ করতেন না। খেলা দেখতে হলে মানুষ লাগবে। হৈচৈ লাগবে। কেউ গোলের আগে গোল বলে চিৎকার করবে। কেউ ভুল পাসে বিরক্ত হবে। কেউ চা চাইবে। কেউ বলবে, “আজকে খেলা জমতেছে না।”

আমাদের বাসার নিচে একটা বেকারি ছিল। সেই বেকারির ম্যানেজার আসতেন। আরও কয়েকজন আসতেন। বাসা তখন ছোট্ট এক স্টেডিয়াম। আম্মু ফ্লাস্ক ভরে চা বানিয়ে দিতেন। রাতের চা। ফুটবলের চা। সেই চায়ের স্বাদ আসলে চায়ের স্বাদ ছিল না। সেটা ছিল সময়ের স্বাদ।

স্কুলের এক বন্ধু একদিন বলল, রোমারিও আর বেবেতো নাকি একসময় একে অপরকে বল পাস করত না। বিশ্বকাপের কিছুদিন আগে তারা নাকি সব অভিমান ভুলে পাস দেওয়া শুরু করেছে। কথাটা সত্যি ছিল কি না জানি না। কিন্তু তখন এসব গল্প বিশ্বাস করতে ভালো লাগত।

বেবেতোর গোলের পর হাত দোলানোর উদ্‌যাপন তখন একরকম সেনসেশন। শিশুকে কোলে দোলানোর ভঙ্গি। ফুটবল মাঠের মাঝখানে হঠাৎ একটা ঘরের দৃশ্য। গোলের আনন্দের মধ্যে বাবার আনন্দ। সেই দৃশ্য দেখে ভালো লাগত। হয়তো তখনও বুঝিনি, বাবা হওয়া আর ফুটবল ভালোবাসার মধ্যে একটা গোপন সম্পর্ক আছে।

তারপর এল ফাইনালের দিন।

১৯৯৪ সালের যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বকাপের থিম মিউজিকটা আমার খুব ভালো লাগত। শুধু ওটা দেখার জন্যও অপেক্ষা করে থাকতাম। ফাইনালের দিন পণ করলাম, আজ আর ঘুমাব না। কোনোভাবেই না। একজন আট বছরের ছেলের জীবনে এর চেয়ে বড় প্রতিজ্ঞা আর কী হতে পারে?

কিন্তু ঘুমেরও নিজস্ব ফুটবল আছে। সে ঠিক সময়ে ট্যাকল করে।

আমি ঘুমিয়ে পড়লাম।

খুব বেশি সময়ের জন্য না। গোলশূন্য ম্যাচের অতিরিক্ত সময়ের দিকে হয়তো। পেনাল্টি শুটআউটের সময় আব্বু আমাকে ডেকে তুললেন।

“উঠ, পেনাল্টি শুরু।”

চোখ মেলে দেখি ঘর ভর্তি মানুষ। সবার চোখ টিভির দিকে। ঘরে এমন নীরবতা, যেন কেউ কথা বললে বলের দিক বদলে যাবে।

সেদিন প্রথম বুঝলাম, খেলা দেখার উত্তেজনা কী জিনিস।

ব্রাজিলের গোলরক্ষক তাফারেলের সেই সেভ। তারপর রবার্তো বাজ্জিওর শট। বলটা বারের ওপর দিয়ে চলে গেল। সেই মুহূর্তটা এখনো চোখে ভাসে। কিছু কিছু দৃশ্য সময়ের সঙ্গে ঝাপসা হয় না। বরং আরও পরিষ্কার হয়।

বাজ্জিও মিস করতেই বাসার সবাই চিৎকার করে উঠল।

ব্রাজিল বিশ্বকাপ জিতে গেছে।

ভোর হয়ে গিয়েছিল। চারদিকে আলো ফুটছে। সবাই খুশি। আব্বুর মুখেও সেই আনন্দ। আমি আব্বুর কিনে দেওয়া নতুন ফুটবলটা নিয়ে বাসার নিচে নেমে গেলাম। একা একা। তখন খেলতে কারও দরকার ছিল না। বল পায়ে থাকলেই মনে হচ্ছিল পুরো পৃথিবী আমার সঙ্গে খেলছে।

আজ এত বছর পর আবার যুক্তরাষ্ট্রে বিশ্বকাপ শুরু।

মনে পড়ে যাচ্ছে সেই রাত। সেই বাসা। সেই ফ্লাস্কভর্তি চা। সেই বেকারির ম্যানেজার। সেই চিৎকার। সেই নতুন ফুটবল। আর সবচেয়ে বেশি মনে পড়ছে আব্বুকে।

মনে পড়ছে, একদিন এক স্টেডিয়ামে তিনি দুই হাতে আমাদের জড়িয়ে ধরে বসে ছিলেন। ইট-পাথর উড়ে আসছিল। আর এক অচেনা পুলিশ কনস্টেবল প্লাস্টিকের শিল্ড হাতে দাঁড়িয়ে ছিলেন আমাদের সামনে।

ফুটবল শুধু গোলের স্মৃতি না। ফুটবল কখনো কখনো বাবার বুকের গন্ধ। কখনো অচেনা মানুষের সাহস। কখনো রাত জাগা চায়ের কাপ। কখনো প্রতিপক্ষের প্রতিভাকে সম্মান করার শিক্ষা। জীবনও আসলে ফুটবলের মতো কেউ জেতে, কেউ হারে; কিন্তু শেষ পর্যন্ত মানুষ বড় হয় ভালোবাসা, সাহস আর সম্মান দিয়ে।

1 COMMENT

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Share post:

সাবস্ক্রাইব

spot_img

সম্পাদকের নির্বাচিত

আরও পড়ুন
আরও পড়ুন

কুরাসাও যদি চমকে দেয়?

কুরাসাও। আয়তন ৪৪৪ বর্গ কিলোমিটার। জনসংখ্যা দুই লাখের কম।...

ভিনি : ব্রাজিলের শেষ ভরসা?

ভিনিসিয়ুস জুনিয়র প্রতিজ্ঞা করেছিলেন - দরকারে দশ গুণ বেশি...

বিশ্বকাপের অফিশিয়াল বল ত্রিয়ন্ডা

এইবার ফিফা বিশ্বকাপের অফিশিয়াল বল হিসাবে এমন একটি বলকে...

বিতর্কিত বিশ্বকাপ ফুটবল ২০২৬ কিন্তু কেন?

আর মাত্র একদিন পরেই ফুটবলের মহাযুদ্ধ শুরু। কিন্তু বিশ্বকাপ...