পানাহির ‘অফসাইড’ : খেলা আর রাজনীতি

Date:

জাফর পানাহির কন্যার স্টেডিয়ামে প্রবেশাধিকার না পাওয়াই অফসাইড সিনেমাটি নির্মাণের প্রেরণা। অফসাইড ঠিক ফুটবল নিয়ে নির্মিত নয় বরং এই পুরুষ শাসিত সমাজে ‘পবিত্র’ খেলার মাঠটিতে ছয়জন নারীর উলুক ঝুলুক শুলুক সন্ধানের চেষ্টায় নেমে পড়লে কী ঘটতে পারে তা-ই নিয়ে নির্মিত। ১৯৮৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর, একটি আইন পাশ হয়েছিলো। আইনটির ফলে নারীদের লাইভ ফুটবল দেখবার অধিকার ছিলো না। সিদ্ধান্তটি আহমদিনেজাদ পুনর্বিবেচনা করতে চেয়েছিলেন কিন্তু মাননীয় উলেমাগণের চাপে পড়ে নিজস্ব সিদ্ধান্ত প্রয়োগ করতে পারলেন না। ইরানে জন্মগ্রহণ করা-ই তবে এই সিনেমার নারীদের নিয়তি ও সমস্যা! অফসাইড নির্মাণ প্রসঙ্গে পানাহি এক ফারসি প্রবাদের কথা মনে করিয়ে দেন। ‘যদি আপনি দরজা দিয়ে যেতে না পারেন তবে জানালা বেয়ে উঠুন।’

ইরানি নির্মাতাদের প্রতিনিয়ত রাষ্ট্র নামক প্রতিষ্ঠানকে ফাঁকি দেয়ার জন্যে নিত্য নতুন পদ্ধতি উদ্ভাবন করতে হয়। প্রতিটি পদ্ধতি একবার ব্যবহারযোগ্য। পানাহি জানান, উক্ত বিপ্লবের আগে নারীরাও খেলা দেখতে পারতেন। অবশ্য তারপরেও অধিকাংশ ইরানি পুরুষের কাছে খেলা দেখাটা কোনো অশুচি বিষয় নয় কিন্তু যেহেতু রাষ্ট্রীয়ভাবে গৃহীত আইনে নারীদের খেলা দেখা নিষিদ্ধ, পুরো পরিস্থিতিই অত্যন্ত পুরুষালি হয়ে উঠেছে। নিষ্ঠুর ও কর্কশ।

অফসাইড নারী ফুটবল ভক্তদের কেন্দ্র করে ইরানী কমেডি চলচ্চিত্র? একটি ইরানি ‘বেন্ড ইট লাইক বেকহ্যাম’ গোত্রের ফিল্ম? এটি স্বাভাবিক নয় এই দেশটির পক্ষে ৷ ইরানি ধ্রুপদী ঘরানার শিক্ষকপ্রতিম নির্মাতা জুলিয়েত রবিনসনকে বয়ফ্রেন্ডহীন মশলাদার খেলাধুলাবিষয়ক ছবিতে ভাষণ দেয়াচ্ছেন, এটা ভাবা যায় না ৷ হাসির উপাদান মুছে ফেললে, স্বাভাবিক গতির ভগ্নাংশে যদি নির্মিত হয় একমাত্র তাহলেই এটা সম্ভব হতে পারে ৷ ক্যামেরাকে দীক্ষিত হতে হবে কারো কথার উত্তর দেয়ার সময়,পাথুরে মুখটি বিশেষভাবে ধারণ করে রাখার ব্যাপারে।

২০০৬ সালের বিশ্বকাপের ইরান বনাম বাহরাইন ম্যাচ দেখবার জন্যে জনা ছয় তরুণী ভক্ত ছেলেদের ছদ্মবেশে স্টেডিয়ামে যাওয়াকে কেন্দ্র করে একটি পছন্দ করার মতো সুভদ্র, অজস্র স্তরে বিস্তৃত এক চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন পরিচালক পানাহি৷ যারা সর্বজনমান্য সকল প্রকার পুরুষশাসন হেলায় তুচ্ছ করে। স্পর্ধা এবং সাহসের উজ্জ্বল দীপ্তিতে আলোকিত পানাহি, চলচ্চিত্রটি নির্মাণ করেছেন সঠিক লোকেশন তথা মাঠে, ফুটবল খেলার সময়ের সাথে মিলিয়ে। দেখা যাচ্ছে, শুধুমাত্র খেলার জয় পরাজয়ের উপর নির্ভর করে সমাপ্তির চিন্তা মুক্ত রেখেছিলেন তিনি ছবিটি তোলার সময়, যদিও মেক্সিকোর সাথে প্রথম খেলায় কোয়ালিফাই করেছিল ইরান।

১৯৯৮ বিশ্বকাপ ইরান যে দুই-এক গোলে ইউনাইটেড স্টেটসকে হারিয়ে দিয়েছিলো তার পরিপ্রক্ষিতে ব্রিটেনে বসবাসরত ইরানি কমিউনিটির প্রতিক্রিয়া স্মরণে রেখেছিলেন বিশিষ্ট কৌতুক অভিনেতা ওমিদ জালিলি ৷ সুভদ্র পেশাজীবী আর দোকানমালিকরা পশ্চিম লন্ডনের অ্যাজওয়্যার রোডে বিপুল আনন্দ করেছিলো। নিজেদের গাড়িতে উঠে, স্বাভাবিকের থেকে খানিকটা জোরে চালিয়ে রাস্তার এ মাথা ও মাথা আসা যাওয়া করেছিলো। লুকিয়ে হর্ন বাজিয়েছিলো। ভদ্রভাবে পতাকা দুলিয়ে রহস্যময় হেসেছিলো৷ ফুটবলের ইতিহাসে উদযাপনের আচরণের সবচেয়ে সুন্দর উদাহরণ ৷ এই খেলাটি ফুটবলের প্রতি ইরানের আগ্রহকে আকাশস্পর্শী করে তুলেছিলো ৷ তরুণদের সংস্কৃতিতে এমন এক স্পন্দন চারিয়ে দিতে পেরেছিলো যে, সেখানকার নারীরাও ভাবলেন তাদের দিক থেকে কিছু ভূমিকা রাখা জরুরি হয়ে পড়েছে। ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের এই বিশেষ খেলাটি আরেকটি কারণে উল্লেখযোগ্য, তা হলো খেলাটির ভেতরে থাকা পারস্পরিক স্পোর্টসম্যানশিপ। সাদা বাংলায় খেলোয়াড়সুলভ মানসিকতা,খেলা শুরুর আগে তারা নিজেদের মধ্যে উপহার আর ফুল বিনিময় করেছিলো। যদিও খেলার ফলাফল, আমেরিকাকে ফুটবলে বিশ্বপরিচিতির দিকে খুব একটা এগিয়ে দেয়নি।

যে কোনো বিচারে, ইরানে ফুটবল অনেক গুরুত্বপূর্ণ খেলা। ইরানি মননে অফসাইড চলচ্চিত্রের এক বিশেষ ভূমিকা আছে। আমরা দেখি একটি মেয়ে ঢোলা খেলার পোশাক পরেছে, জাতীয় রঙে রাঙানো নিজের মুখ। হইহল্লাপ্রবণ যুবকদের সাথে একই বেঞ্চিতে বসেছে। প্রার্থনা করছে যেন ধরা না পড়ে। তার বাবা, অত্যন্ত উদ্বিগ্ন, হন্যে হয়ে তাকে খুঁজছেন। একটি ছেলে তার ছদ্মবেশ ধরে ফেলে তাকে শুভ কামনা জানায়। কিন্তু তার পৃষ্ঠপোষকতা পাওয়ার কোনো বাসনা ছিলো না। শুভকামনার প্রতিউত্তরে সে কাঁধ ঝাঁকিয়ে স্টেডিয়ামের ভীড়ে যুক্ত হয়, এক বাটপারের কাছ থেকে টিকিট কেনে। ফলে পুলিশের হাতে ধরা পড়ে পৌঁছে যায় নারী ফুটবল ভক্তদের দঙ্গলে ৷ রুদ্ধ অবস্থায় ভীড়ের গর্জন আর অশিক্ষিত জাতীয় কর্তব্য পালনের ছেলেদের ধারাভাষ্য থেকে তাদের খেলার গতিপ্রকৃতি বোঝার জটিলতায় পড়ে যেতে হয়।

পানাহির এই চলচ্চিত্রের অপার্থিবপ্রায় গুপ্ত কৌতুক মনোযোগী দর্শকদের চোখে ধরা পড়বে। বন্দী নারীর হাতফোন নিয়ে এক কর্তাব্যক্তি তাঁর স্ত্রীকে ফোন করলেন। স্ত্রী পরের বার ফোন করে মেয়েকণ্ঠ পেয়ে স্বামীকে জেরা করে বসে এই স্বরের আগমন উৎস জানতে চেয়ে। উচ্চপদস্থ মানুষটির আবার সমস্যা অন্যত্র ৷ মাথার উপর এক পৃথিবী কাজের বোঝা অথচ তিনি চাইছেন সেনা দায়িত্ব থেকে ছুটি নিয়ে বাড়ি ফিরে নিজের গরুদের যত্ন নিতে ৷ কিন্তু অসম্ভব হয়ে পড়ে তাঁর ছুটির স্বপ্নপূরণ কেন না দেখা গেলো, কর্তার অধীনস্থ এক নারীকে পুরুষের ওয়াশরুমে নিয়ে গেলে সে পালায়। ফলত, ছয়জন আটক নারীর মধ্যে একজনের হিসেব মেলাতে না পারার ফলে শাস্তি হিসেবে আজীবন তাঁকে সেনাদায়িত্বেই থেকে যেতে হয়। গ্রামযাপনের ফেরাটাকে দুঃখের সাথেই বাতিল করে দিতে হয় ৷

অফসাইড এমন এক দুষ্প্রাপ্য গোত্রের চলচ্চিত্র, কোনো সুনির্দিষ্ট ফেনিয়ে তোলা ন্যারেটিভ কাঠামো বাদেই, নিজের শক্তিতেই খুব সাবলীলভাবে গল্পটি এগিয়ে যায় এবং কখনোই তাৎপর্যহীন, দিশাহীন মনে হয় না। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে, ইরানি ছবি অনেক বেশি বিপন্নতায় মোড়া যেমন বায়াক পায়ামির ‘টু থটস’ (২০০৪), যদিও অন্যান্য চলচ্চিত্রগুলোর শক্তিমত্তা এবং নতুনত্ব মুগ্ধ করে- যেমন, জামাল তাবরিজির কৌতুকচিত্র ‘দ্য লিজার্ড'(২০০৫)। পানাহির অফসাইড বুদ্ধিদীপ্ত হিউমারসমৃদ্ধ এক অন্যতর দৃষ্টিক্ষেপ- ফুটবল, সাংস্কৃতিক ধারা আর নারীর অবস্থান বিষয়ে।

ইরান এখন ভূ রাজনীতির জটিল পরিস্থিতিতেও সাহসের সাথে লড়াই করে যাচ্ছে ৷ অফসাইড-এর মতো সিনেমা এই ধরনের লড়াইতে সাহস সঞ্চারিত করে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Share post:

সাবস্ক্রাইব

spot_img

সম্পাদকের নির্বাচিত

আরও পড়ুন
আরও পড়ুন

‘এই নিয়ে সংসার’ : একটি প্রিভিউ

বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর থেকেই রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত টেলিভিশনে বাঙালির বিশেষ...

স্বল্পদৈর্ঘ্য ‘টু’ : সত্যজিৎ রায়ের কথা

অনুবাদ: সৈকত দে  রায়:  (Esso) এসো-র স্পন্সর করা ছোট গল্পের...

দম : যুদ্ধবিরোধী চলচ্চিত্র

১ জীবন - এক অনন্ত অনুভূতির নাম। যতক্ষণ শ্বাস থাকে...