পল্লী কিশোরের রবীন্দ্রনাথ

Date:

দূরের বিশালায়িত বৃক্ষ, ছড়িয়ে আছে শান্ত ছায়া। দূর থেকে পরাহত রাখাল ভাবে, বৃক্ষের শিকড়ের ছোঁয়া।

সবুজ শ্যামল লতা-পাতায় জড়ানো গ্রামবাংলার এক কিশোর, যার বেলা কেটে যায় গ্রামের পথে পথে, পাখির কলতানে, বাঁশির সুরে আর বহুবিধ গ্রাম্য দৃশ্যের অপরূপ স্নেহে। অতি যত্নে সে দৃশ্যগুলোকে লিপিতে রূপান্তর করে সাজিয়ে তোলে, যেন ভোরবেলায় ফুলের ডালায় আদর করে ফুল তুলে রাখছে ছোট্ট এক খুকি। দুপুরে বাংলার মাঠে মাঠে রোদ মেলে ধরে তার প্রখরতা, আর কিশোর সুনিবিড় বৃক্ষছায়ায় বসে আলো-ছায়ার সাথে খেলে কৃষকের জীবনগুনতির খেলা। তার চোখে স্পষ্ট হয়ে ওঠে প্রান্তরের জীবনযাপন, প্রকৃতির নৈমিত্তিক ঘটনা, মানুষের দুঃখ-আনন্দের মৃদু সঞ্চার। আর সেই সূক্ষ্ম রূপ ধরা পড়ে তারই ভাষায়।

সেই কিশোরের ছিল প্রবল রবীন্দ্র-সংযোগের আকাঙ্ক্ষা।

রবীন্দ্রনাথ— এক বহুস্বরের সম্মিলিত দীপ্ত অবয়ব; বাংলার আকাশে স্নিগ্ধ, শান্ত, সুকোমল অথচ বিশাল এক বৃক্ষ, যার শিকড় ছড়িয়ে গেছে দূর-দূরান্তের সময় অবধি, বাংলাকে পেরিয়ে বিশ্বমানবতার গভীরে। মানুষের অন্তর্লোকের যে আত্মিক সুর, যে বিমোহিত আলোক, তা যেন অভিসারে এসে মিশে যায় রবীন্দ্র-সৃষ্টির মুদ্রণে। বাংলার এপ্রান্ত-ওপ্রান্ত দীর্ঘকাল আচ্ছন্ন হয়ে থাকে তারই সুরে, যেন জীবনানন্দের দেবদারুর বনভূমিতে ভেসে থাকা এক দীর্ঘ প্রতিধ্বনি। মানুষের জটিল, ভাসমান, বিভ্রান্ত জীবনকে তিনি মুক্ত করতে চেয়েছেন সংকীর্ণতা ও দূষণ থেকে; বিশ্বমাতার কোলে খুঁজেছেন সকল মানুষের আশ্রয়।

তবে দূর থেকে দেখা রবীন্দ্রনাথকে অনেকসময় মনে হয়, তিনি যেন উচ্চাসনে বসে আছেন মানুষের থেকে বহু দূরে, পরাহত বিকেলের ওপারে। অথচ ঠাকুরবাড়ির আঙিনায় দাঁড়িয়ে দেখলে মনে হয়, রবীন্দ্রনাথ অতটা উঁচুতে বসে ছিলেন না, যেখানে থেকে মানুষের বসতি দূর গাঁয়ের মতো অস্পষ্ট লাগে। বরং তিনি ছিলেন আমাদেরই আপন কেউ; আমাদের মতোই ব্যাকরণময় জীবনের মানুষ, অথচ অসীম বিস্ময়ের দীপ্তিতে উজ্জ্বল। সেই রবীন্দ্রের প্রতি আকুল হৃদয়ের যাচনা কিশোরের কৈশোরকে করে তোলে আপ্লুত। আর আমরা ধীরে ধীরে দেখতে পাই “বিশ্বকবি” নয়, মানুষ রবীন্দ্রনাথকে।

রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে সেই কিশোরের প্রথম পরিচয় ঘটে প্রবাসী পত্রিকায় রবীন্দ্র-জীবনী পাঠের মধ্য দিয়ে। রবীন্দ্র-জীবনের প্রতি কিশোর এমন এক আকর্ষণ অনুভব করেছিলো, যেন টানটান সুতোর ভেতর লুকিয়ে আছে মননরেখার তীক্ষ্ণ কম্পন— সামান্য বাতাসেই যা ছিঁড়ে যেতে পারে। রবীন্দ্রপাঠের মধ্য দিয়ে তার জীবনে জন্ম নিতে থাকে নতুন এক আবহ। একপ্রকার রবীন্দ্র-মাদকতায় আচ্ছন্ন কিশোর গোগ্রাসে  গ্রহণ করতে থাকে রবীন্দ্রনাথকে।

তারপর বহু বছর পেরিয়ে যায়। সেই কিশোর ততদিনে হয়ে ওঠেন আমাদের পল্লিকবি জসীমউদ্দিন। বাংলার গ্রামে গ্রামে তিনি শুনে চলেন পল্লিজননীর সূক্ষ্ম আনন্দ-বেদনাময় সরস সুর। মানুষের ভাষা, দুঃখ, প্রেম, জীবনযাপন আর প্রকৃতিকে তিনি পল্লিগ্রামের কাদা-মাটি ও সরল স্নিগ্ধতা দিয়ে গড়ে তোলেন জৈবিক চেতনার গভীর স্তরে।

সেই পল্লিপথ, নদী, খেয়াঘাট, ধানের ক্ষেত, রাখালের বাঁশি, গ্রামের মেয়েদের কান্না, বিয়ের গান, প্রেমিকের বিরহ— সমস্তই ধরা দিতে থাকে তার দৃষ্টিতে। আর তিনি সেসব ফুটিয়ে তোলেন পল্লিগাঁয়ের মানুষের সহজ, মায়াবতী, নদীপাড়ের বুনোফুলের মতো আঞ্চলিক শব্দে। “শুদ্ধ” ভাষার কৃত্রিমতাকে আলগোছে পাশে সরিয়ে রেখে তিনি নিনাদ তোলেন জীবন্ত মানুষের নিশ্বাসে।

কৈশোরের সেই রবীন্দ্র-সংযোগের আকাঙ্ক্ষাও ততদিনে বাস্তবের স্পর্শ পেয়েছে। অপেক্ষার সময় তাকে এনে দিয়েছে রবীন্দ্রনাথের নৈকট্য।

কিশোর জসীমউদ্দিনের চোখে এককালে যে রবীন্দ্রনাথ ধরা দিয়েছিলেন অপার বিস্ময় আর অনুরাগের তীব্র আকাঙ্ক্ষায়— দূর পর্বতের মতো, উচ্চ মগডালে বসে থাকা এক মহিমান্বিত সত্তা— তার সাক্ষাৎ ছিল এক গভীর আশ্চর্য। কিন্তু পরিণত বয়সে এসে সেই আশ্চর্যতা বদলে যায় আরও গভীর অন্তর্গত দৃশ্যায়নে। রবীন্দ্রনাথ তখন হয়ে ওঠেন সাধারণ মানুষ। তিনি মগডাল থেকে নেমে আসেন পথের ধারে, বাড়ির আঙিনায়, ঘরের পায়চারিতে। হয়ে ওঠেন আমাদেরই আরেক চৈতন্য।

জসীমউদ্দিনের চোখে রবীন্দ্রনাথ এমন একজন মানুষ, যাকে দূর থেকে আকাশের মতো মনে হয়, কিন্তু কাছে গেলে ততটা দূরের লাগে না। বিশ্বকবি তখন অনেকটা গ্রামের সেই স্নেহশীল মাস্টারমশাইয়ের মতো, যার ভেতরে আছে গভীর মমতা। জসীমউদ্দিন প্রায়ই রবীন্দ্রনাথের সাক্ষাৎ পান, তার সঙ্গে আলাপ করেন, এবং সেই আলাপচারিতার মধ্য দিয়ে আরও গভীরভাবে আবিষ্কার করেন মানুষ রবীন্দ্রনাথকে। দূরত্বের কুয়াশা ধীরে ধীরে মিলিয়ে যেতে থাকে।

রবীন্দ্রনাথ কোনো দূরের, অপ্রাপ্য প্রতিমা নন। তিনি বিশাল, কিন্তু সেই বিশালতার ভেতরে আছে সহজতা। তিনি প্রভাবশালী, কিন্তু সেই প্রভাবের ভেতরে অন্যদের জন্যও জায়গা আছে। এই কারণেই জসীমউদ্দিন তার সান্নিধ্যে এসে আপ্লুত হন। যদিও তিনি অনুভব করেন এক নীরব দূরত্বও— এমন এক দূরত্ব, যেখানে একজন নিজের অবস্থানে দাঁড়িয়ে থেকেও আরেকজনের মহত্ত্বকে স্বীকার করে নেয়।

জসীমউদ্দিন রবীন্দ্রনাথের মধ্যে গ্রামীণ জীবনের প্রতি এক আন্তরিক আলোকপাতের প্রবণতা লক্ষ করেছিলেন। গ্রামবাংলার সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ সম্পূর্ণ অচেনা ছিলেন না— তা স্পষ্ট বোঝা যায়। যদিও জসীমউদ্দিন গ্রামের জীবনকে যত নিবিড়ভাবে প্রত্যক্ষ করেছিলেন, সেই সুযোগ রবীন্দ্রনাথের ছিল না। তবু গ্রামীণ জীবন ও মানবিক সম্পর্ক নিয়ে রবীন্দ্রনাথ যে ধারণা আমাদের দেন, সেখানে কখনও কিছু সীমাবদ্ধতা চোখে পড়লেও বৃহত্তর মানবিক সামগ্রিকতাই শেষপর্যন্ত প্রতিভাত হয়।

এই কারণেই গ্রাম থেকে উঠে আসা পল্লিকবি জসীমউদ্দিনকে রবীন্দ্রনাথ সাদরে গ্রহণ করেছিলেন। রবীন্দ্র-দর্শন ও সাহিত্যে যে বহুমাত্রিক মেলবন্ধনের পরিচয় আমরা পাই, তার একটি সুন্দর প্রকাশ ঘটে এই সাক্ষাতে। বাংলা সাহিত্যের মহীরুহ হয়েও রবীন্দ্রনাথ যে আমাদের মতোই মানুষ— তারও সীমাবদ্ধতা, দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য কিংবা অবস্থানগত দূরত্ব থাকতে পারে— তা জসীমউদ্দিন খুব সহজেই প্রত্যক্ষ করেছিলেন।

রবীন্দ্র-অনুরাগের অন্ধতা দিয়ে ব্যক্তি রবীন্দ্রনাথকে দেখা যায় না; আবার কেবল সাম্প্রদায়িক বা রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও তাঁকে সম্পূর্ণ বোঝা সম্ভব নয়। এর অন্যতম কারণ রবীন্দ্রনাথের বহুমাত্রিকতা। তিনি যেমন কবি, দার্শনিক, শিক্ষাবিদ, মানবতাবাদী, আবার গভীরভাবে এক জটিল মানুষও। আর এই জটিলতার মধ্য দিয়েই তিনি হয়ে উঠেছেন বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির এক অনিবার্য বিস্ময়।
(‘ঠাকুর বাড়ির আঙিনা‘র স্বল্প পাঠ থেকে।)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Share post:

সাবস্ক্রাইব

spot_img

সম্পাদকের নির্বাচিত

আরও পড়ুন
আরও পড়ুন

ঔপন্যাসিক ইয়াং যুয়ান জি’র সাক্ষাৎকার

অনুবাদ : স্বাতীলেখা মিত্র 'তাইওয়ান ট্রাভেলগ' লেখার পেছনের অনুপ্রেরণা সম্পর্কে...

পাপের প্রেত

লর্ড ডানসেনি ভাষান্তর: সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায় আমার ভাইয়ের সঙ্গে সেই বিশাল নির্জন...

তিন টুকরো চিন্তা : রবীন্দ্র প্রাসঙ্গিক

মার্ক্সিস্ট স্কুলের সামান্য ছাত্র হিসেবে জানি, একটা গল্প কে...

রবীন্দ্রমন : নানা বয়সে

রবীন্দ্রনাথ একের মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন জন। ভিন্ন জনের সমাবেশ...