কবিতা এই সময়ে কারা লেখে এবং কেন লেখে এটাই একটা প্রবন্ধের বিষয় হতে পারে। আঁকশি দিয়ে ফল পাড়ার মতন একটা শব্দ লিখে ওঠা, তার বাদে শব্দসমবায়ে বাক্যনির্মাণ অনুশীলিত হাতের পক্ষে খুব কঠিন কিছু নয়। কিন্তু মিডিয়া অন্ধতা এবং আকাশছোঁয়া দৃশ্যদূষণের সময়ে কবিতা কি দরকারি? রবীন্দ্রনাথের মতন ভাগ্য ক’জনের? নিজের প্রকাশন সংস্থা এবং স্তাবকবৃত্ত কবিজীবনের শুরু থেকেই ক’জন পায়? কিংবা জীবনানন্দের শমিত সাধনা এই সময়ের মহানাগরিক কবির পক্ষে কি সম্ভব? পরিবারচ্যুত একজন কবি, পাঠকহীন কপর্দকশূন্য লিপিবদ্ধ করে তুলেছেন যাপন অক্ষর এবং তারপর প্রকাশ চেষ্টাসত্ত্বেও ব্যর্থ মনোরথ লিখেই চলেছেন- এই একজন কবি যার অপ্রকাশের ভার বাংলা সাহিত্যকে আরো কিছুদিন বইতে হবে। সকলের কি ভূমেন্দ্র গুহ থাকেন কিংবা বিদেশ উদাহরণে ম্যাক্স ব্রড, ফ্রান্জ কাফকা সখা?
বাংলা কবিতায় রাজনীতির সুদূরকাল থেকেই প্রভাব। প্রথমে কবি, পরবর্তীতে সম্পাদকদের মধ্যে খুব অল্প মানুষ আছেন যারা রাজনীতির এই বলয় থেকে বেরোতে চেয়েছেন বা চেয়েছেন বলে পেরেছেন। চেনাজানাশোনার নেটওয়ার্কিং বিস্ফোরণের যুগে কতজন মানুষ আজও নামের চেয়ে লেখার অক্ষরের বিচার করেন? কিভাবে আমরা পাবো আমাদের কবিকে যিনি এই সময়কে চিত্রিত করেন? বর্তমান প্রতি মুহূর্তেই অতীত। মানবজগতে, দেখা গিয়েছে কবি আর শিল্পভাবুকরা সবচেয়ে সংবেদনশীল প্রাণী, সমকালের যে কোনো অন্যায় বা অতীতের কোনো সামাজিক বা রাষ্ট্রীয় অন্যায়ের উৎসারণ তাঁকে আহত করে। মতান্ধ সেবাদাস যারা তাঁরা কবি না শিল্পভাবুক নন। কিছু চর্চিত বাক্য সমন্বয়ে ক্রীতদাসের দায়িত্ব পালন করেন মাত্র৷ রাষ্ট্রনির্মিত ক্ষতের রক্তধারা একজন সত্যকারের কবি বা শিল্পচিন্তকের অক্ষরমালাকেও প্লাবিত করে, এই কারণে বড়ো মানুষদের শিল্প পর্যালোচনায় আমরা দেখি, সময়ের স্পন্দনে নিয়ত সাড়া দিয়ে যাওয়ার দলিল।
আদিম মানুষ যোগাযোগ করত ইশারাভাষা, ক্রমে উচ্চারণ, ভাষার সুনির্দিষ্টতা, বিভিন্ন ধারা উপধারায় ভাষা বিভক্ত হয়ে যাওয়া এবং অক্ষরের ইতিহাস শুরু হওয়ার পাশাপাশি সামাজিক ব্যবস্থাও অতি ধীরে বিভক্ত হয়ে পড়ছে। এক শ্রেণীর মানুষ সব রকম সুবিধা পাচ্ছে, আর অন্য শ্রেণীর মানুষ উদয়াস্ত পরিশ্রম করছে, কেননা আমরা জানি উদ্বৃত্ত ফসল এবং অবসর মানবইতিহাসে শিল্প উদ্ভবের মৌল দুই উপাদান। আদিম সাম্যবাদী সমাজ যেখানে শিকার পেলে সবার সম্মিলিত খাবার জুটতো নয়তো সকলে উপোস দিতো সে সময়ে খুব একটা শিল্পভাবনার পরিচয় আমরা পাই না। আলতামিরা গুহাগায়ে বাইসনচিত্র একটি উজ্জল ব্যতিক্রম। প্রকৃতিতে নানা রহস্যময় বিষয়কে বুঝে, আগুন আর চাকার আবিষ্কার করে মানব সভ্যতা যখন এগিয়ে চলেছে সে সময়ে দিবারাত্রি শ্রম থেকে অব্যাহতি পাওয়া কেউ কেউ হলেন শিল্পভাবুক, কবি, চিত্রকর, চারণগায়ক, বাদক।
সভ্যতার প্রথম দিকে কবিতার মূল মাধ্যম শ্রুতি। বেদ, উপনিষদের মতন অসংখ্য গ্রন্থের সূত্রপাত শ্রুতিতে। গুরু-শিষ্য পরম্পরার মাধ্যমে নানা শ্লোক ছড়িয়ে পড়তো, চারণকবিদের মাধ্যমে কবিতার বিশ্বের সম্প্রসারণ ঘটলো। বলা হয়ে থাকে লিখিত সভ্যতার বয়স পাঁচ হাজার বছর। পাতা, গাছের বাকল, পাথরে লিখে রাখতে রাখতে আবিষ্কৃত হলো কাগজ। পুঁথি নকল করে জীবিকা নির্বাহকারী একটি পেশাজীবী শ্রেণি গড়ে উঠলো। দুর্মূল্য, প্রয়োজনীয় পুঁথিগুলো তাঁদের অনুশীলিত হাতের কল্যাণেই একাধিক সংখ্যায় আমরা এখন দেখি যাদুঘরে। সুন্দর ছাঁদের অক্ষর লেখায় পারদর্শী এসব শিল্পী, পেশাজীবীরা নিজের নিজের এলাকার ভূ-স্বামীর পৃষ্ঠপোষণা পেতেন এবং সেই প্রণোদনাতেই প্রস্তুত করতেন পুঁথিগুলি, সাধারণত ভূর্জপত্রে।
ধাতব হরফ আর মুদ্রণশিল্পের ইতিহাস সমান্তরাল। গুটেনবার্গ সচল হরফ আবিষ্কার করে পঞ্চদশ শতকে ছাপলেন বাইবেল। এ এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন কেননা বিচল হরফের যুগে ছাপার ব্যাপার ছিলো আরো ব্যয়বহুল। প্রতিটি অক্ষর আলাদাভাবে ব্যবহার করবার গুটেনবার্গীয় এই পদ্ধতি মুদ্রণশিল্পে রীতিমত যুগান্তর নিয়ে এলো। প্রকাশের পাশাপাশি প্রচারের প্রযুক্তি পরের পাঁচশো বছরে মানুষের হাতের আরো নাগালে চলে এলো। এখন বই প্রকাশ না করেও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কল্যাণে একজন পরিচিত হয়ে উঠতে পারেন।
বাংলা ভাষাসহ পৃথিবীর তাবৎ কবির প্রাথমিক সাধনা একার সাধনা, নির্জনতার সাধনা, কবি যখন নিজের সাথে কথোপকথনে লিপ্ত হন তখন একটি কবিতা গড়ে উঠতে পারে। সমাজ বিভক্ত হবার পর থেকেই শ্রেণিবিভক্ত সমাজে দেখা গিয়েছে সংঘাত, উৎপীড়িতের ক্রন্দনরোল, রক্তের বন্যা। অধিকাংশ মানুষ মুখ বন্ধ রেখেছে, চোখে ঠুলি পড়েছে, কোনো কোনো মানুষ প্রতিরোধে লিপ্ত হয়েছেন, শহীদ হয়ে গেছেন সত্য প্রতিষ্ঠার স্বার্থে, এইসব শহীদের কাতারে ছিলেন কবিরাও। রাষ্ট্রীয় নানা নির্বিবেক সুবিধাপ্রদান, আক্রমণের প্রতিবাদে কবিরা কখনো কখনো সংঘ গড়ে তোলেন, সামষ্টিক প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। অধুনাবিলুপ্ত সোভিয়েত ইউনিয়নের মতো সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতন ধনতান্ত্রিক রাষ্ট্রেও আমরা এ যূথবদ্ধতা দেখি। যেমন: তথ্যের খাতিরে বলা যায়, সোভিয়েত ইউনিয়নের মতো উদার, সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রও মত প্রকাশের স্বাধীনতাতে বেশ কিছু সীমানা আরোপ করেছিলো। আগ্রহীরা সোভিয়েত ইউনিয়নের মুদ্রিত হায়াৎ মামুদ অনুদিত ‘পঞ্চাশজন সোভিয়েত কবি’ গ্রন্থটি উল্টে দেখতে পারেন। প্রতিবাদী একজন মানুষের, কবির কবিতা পাবেন না। আন্না আহমাতভা অবশ্য একটি উজ্জ্বল ব্যতিক্রম। “পৃথিবীতে আর কোথাও কবিতাকে এত সম্মান দেওয়া হয় না, যা রাশিয়ায় হয়, কবিতা লেখার জন্যে এখানে প্রাণ দিতে হয়”। অসিপ মান্দেলস্তামকেও প্রাণ দিয়েই প্রমাণ করতে হয়েছে যে তিনি কবি, সরকারের ভাড়া করা স্লোগান লিখিয়ে নন।'(১) প্রাবন্ধিক বিবেক সেনের প্রাসঙ্গিক এই প্রবন্ধ থেকে একটি দীর্ঘ অংশ তুলে দিচ্ছি উপলব্ধির সুবিধার জন্য – ‘সোভিয়েত আগ্রাসনের ফলে সাহিত্যচর্চার তিনটি ভাগ হয়ে যায় লাটভিয়ায়, একাংশ বিদেশে, একদল লেখেন কিন্তু ছাপান না, বাকিরা গুলাগে। যে কারণে আশির দশকে যাঁরা লাটভিয়ার প্রধান কবি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলেন তাঁরা কেউ মধ্যবয়স্ক, কেউ প্রৌঢ়। বেলজেভিকা, স্কুয়েনিষ্ক, বার্জিন্স, কেউ গুলাগে গিয়ে সময় নষ্ট না করে নানা ভাষাভাষী বন্দীদের কাছে শিখে নিয়েছেন একাধিক ভাষা, কেউ কবিতা লেখেন কিনা দেখার জন্য মধ্যরাত্রে দরজায় কেজিবির কড়া নাড়া, মারা জালিটার তো আবার জন্মই নির্বাসনে, লক্ষ লাটভিয়ানের মতো তাঁর বাবা-মা সামিল হয়েছিলেন স্তালিন বেরিয়ার গণনির্বাসনে।’ যেসব কবির নাম উল্লেখ করা হল বিবেক সেনের অনুবাদে তাঁর একটি তুলে দিলাম-
বার্ধক্য
উলদিস বার্জিন্স
বরং এটাই ভালো যে বার্ধক্য আসছে,
আর বাঁকা হয় না শিরদাঁড়া,
বুড়ো বদমায়েশ কিছুতেই ঝুঁকবে না
তোমার ছুঁড়ে দেওয়া সিকি পয়সা
কুড়িয়ে নিতে,
না হয় তার ছেঁড়া জুতোর ফিতে
খোলাই থাকল।
ঈশ্বর আমাকে বার্ধক্য দিন।
মার্কিনি শাসন ব্যবস্থার গা জোয়ারি সাম্রাজ্যবাদের উদাহরণ বিস্তার বাহুল্য। যে কোনো তন্ত্রেই আমরা দেখেছি – পৃথিবীর ইতিহাসে, কবিরা নিপীড়িত হয়েছেন, প্রতিবাদী হয়েছেন এবং একই সময়ে কেউ কেউ সব মেনে নিয়ে পোষা লেখকে পরিণত হয়েছেন যদিও ইতিহাস এদের মনে রাখেনি।
কবিতা লেখা এমন একটি রাস্তা যার সংক্ষিপ্ত কোনো পথ নেই। শিল্পের সকল মাধ্যমের জন্যই কথাটি সত্য। কবি সব মেনে নেবেন না মেনে নিতে না চেয়ে নিজের রাস্তায় প্রতিবাদী হবেন তাও তাঁকেই বেছে নিতে হবে। আমরা জানি ফ্রান্সের ফ্যাসিবাদবিরোধী সংগ্রামে, স্পেনের গৃহযুদ্ধে, আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে কবিদের, শিল্পীদের ভূমিকার কথা।
স্থির, অবরুদ্ধ প্যারিস নিয়ে পল এলুয়ারের কবিতাটি মনে পড়তে পারে এ প্রসঙ্গে –
কী করব বলো দরজায় পাহারা ছিল
কী করব বলো আমাদের আটকে রাখা হয়েছিল
কী করব বলো রাস্তা বন্ধ করা হয়েছিল
কী করব বলো শহরটা কজা করা হয়েছিল
কী করব বলো শহরটা খিদেয় জ্বলছিল
কী করব বলো আমাদের নিরস্ত্র করা হয়েছিল
(কারফিউ) ২
পল এলুয়ার যার মূল নাম ইউজিন গ্রিদে, তাঁর আরেকটি কবিতাংশ এমন-
সকলের জন্যে রুটি সকলের জন্য গোলাপ
আমরা সকলে শপথ নিয়েছি
আমরা বিশাল পদক্ষেপে হাঁটছি
পথ তত দীর্ঘ নয়।
সুররিয়ালিস্ট আন্দোলনের কবি রনে শারের ছোট্ট তিন লাইনের কবিতা কি অমোঘ! –
বলো আগুন যা বলতে দ্বিধা করে
বায়ুমণ্ডলের সূর্য, সাহসী আলো,
এবং মরো সবার জন্যে তা বলেছ বলে।
(বলো / অনুবাদ: অরুণ মিত্র)
ইতিহাস জানান দেয় স্পেনের গৃহযুদ্ধ আসলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের স্টেজ রিহার্সাল। ‘স্পেনের গৃহযুদ্ধ: পঞ্চাশ বছর পরে’ বইয়ের ভূমিকায় দেখতে পাচ্ছি মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় লিখছেন – ‘ দেশ-বিদেশের সরকার যা-ই করুক, তবু সারা বিশ্বের বিবেকবান ব্যক্তিদের পক্ষে এটা মেনে নেয়া সম্ভব ছিলো না আর একইভাবে পত্তন হয়েছিলো আন্তর্জাতিক ব্রিগেডের যেখানে যোগ দিয়েছিলেন কবি – শিল্পী -সাংবাদিক – সাংগীতিক – চিত্রকর থেকে শুরু করে এমন সব মানুষ যাঁরা স্যান্ডহার্স্টে, ওয়েস্টপন্টে বা অন্য কোনো সামরিক বিদ্যালয়ে প্রশিক্ষণ বা ট্রেনিং পাননি, কিন্তু ন্যায়নীতি আর বিবেকের জোর যাঁদের বলীয়ান করেছিলো। এ প্রসঙ্গে কবি নিকোলাস গ্যিয়েনের একটি কবিতা আমরা পড়তে পারি আরেকবার –
‘ গন্ধকে-জ্বলা মেঘের তলা
মরে পড়ে আছে এক নাগরিক যোদ্ধা
সে-এক যুদ্ধ অথচ এখনই বৃদ্ধ,
চিৎ পড়ে আছে মৃত।
তার বুক থেকে গজিয়ে উঠেছে গাছ,
-বুঝতে কি পারো তুমি?
-বুঝি।
(মাদ্রিদ / অনুবাদ: মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়) (৩)
বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামে কবি শামসুর রাহমান শারীরিকভাবে অংশ নেননি কিন্তু তাঁর দু’টি কবিতা ‘তোমাকে পাওয়ার জন্য, হে স্বাধীনতা’ এবং ‘স্বাধীনতা তুমি’-যুদ্ধকালীন বিধ্বস্ত ভূখণ্ডে মুক্তিসেনাদের কাছে উৎসাহের উৎসারণ স্রোত ছিলো। বলা যায়, ‘গেরিলা’ কবিতাটির কথা, শুরুর তিনটি বাক্য এমন-
দেখতে কেমন তুমি? কী রকম পোশাক-আশাক
প’রে করো চলাফেরা? মাথায় আছে কি জটাজাল? পেছনে দেখতে পাবো জ্যোতিশ্চক্র মন্ত্রের মতন?
শেষ দু’টি বাক্য –
সর্বত্র তোমার পদধ্বনি শুনি, দুঃখ তাড়ানিয়া;
তুমি তো আমার ভাই, হে নতুন, সন্তান আমার। (৫)
কবি শহীদ কাদরী, যিনি বিরলপ্রজ কবি, মাত্র পাঁচখানা কবিতার বই সম্বল তিনি লেখেন ‘একটি আংটির মতো তোমাকে পরেছি স্বদেশ'(৬)
কিংবা –
রাষ্ট্র মানেই স্ট্রাইক, মহিলা বন্ধুর সঙ্গে
এনগেইজমেন্ট বাতিল,
রাষ্ট্র মানেই পররাষ্ট্র নীতি সংক্রান্ত
ব্যর্থ সেমিনার
রাষ্ট্র মানেই নিহত সৈনিকের স্ত্রী
রাষ্ট্র মানেই ক্রাচে ভর দিয়ে হেঁটে যাওয়া
রাষ্ট্রসঙ্ঘের ব্যর্থতা মানেই
লেফ্ট রাইট, লেফ্ট রাইট, লেফ্ট। (৭)
আমরা আমাদের কথাবার্তার শেষদিকে চলে এসেছি। বলেছিলাম, কবি হলেন সংবেদনসম্পন্ন মানবিক সত্তা। বিশ্বায়নের এই সময়ে তিনি একইসাথে তাড়া খাওয়া প্রাণীর মতো সংশয়ী, বেদনার্ত এবং ধাবমান। প্রতিনিয়ত দেশে বা দেশের বাইরে ঘটে চলা অমানবিক ঘটনাপঞ্জি তাঁকে আবৃত করে। তিনি শরণার্থী বেদনা অনুভব করেন। গ্রীসের কবি জর্জ সেফেরিসের কবিতায় আমরা এই বেদনাচিহ্ন পাই-
আমার বুকের মধ্যে ক্ষতগুলো আবার খুলে যায়
যখন নক্ষত্রেরা নেমে আসে, আত্মীয় হয় আমার দেহের যখন মানুষের পায়ের শব্দের নিচে নিস্তব্ধতা। (৮)
যুগোশ্লাভিয়ার কবি ভাসকো পোপা লিখেছিলেন ভয়াবহ সুন্দর, মর্মস্পর্শী দু’টো লাইন –
এক মসৃণ শাদা নির্দোষ মৃতদেহ
সে তার চাঁদের ভুরু দিয়ে হাসে (৯)
এখন কথা হচ্ছে, এই সময়ের একজন কবি কবিতা কেন লেখেন, সেই প্রশ্নের উত্তর কবিবিশেষে আলাদা হতে বাধ্য কিন্তু একটি উত্তর নির্বিশেষ হতে পারে- তিনি নিজের কথা বলতে চান। এখন পরিচিত হওয়ার অজস্র মাধ্যম আছে। এই বিনেপয়সার বিজ্ঞাপনের ডামাডোলের জগতে স্থির থেকে ততোধিক স্থিরতর ভাষায় কবিতা লিখে যেতে পারা কঠিন। আরো কঠিন অনুজদের সুবিধাবাদী স্তব, অগ্রজদের উদ্দেশ্যমুখীন মস্তকে হস্ত সঞ্চালন, ফেসবুক গ্রুপে পরস্পর পিঠ চাপড়ানিমূলক হাডুডু খেলার বাইরে থেকে কবিতা লিখতে পারা। আমার স্বপ্নের কবি এসবের ধার ধারেন না। তিনি যোগাযোগ সফল কবি নন। তিনি তাঁর যাপিত সময়, সুদূর অতীত এবং দিগন্তবিস্তীর্ণ ভবিষ্যৎ- এই তিনটি কালকেই সৎভাবে উপলব্ধি করতে পারেন। দেশের সংকট উপস্থিত হলে আমার কবি পালান না। আমি শক্তিমান অসৎ কবির চেয়ে দুর্বল সৎ কবির লেখা পড়তে অধিক পছন্দ করবো। না, এই সততার পরিমাপ পারলৌকিক শাস্তিকেন্দ্রিক ন্যায় অন্যায়বোধে নয় এটা একজন কবির চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যে। কোনো সুবিধাবাদের কাছে নতজানু নন আমার কবি।
পল এলুয়ারের একটি প্রেমের কবিতা এমন – ‘তোমাতে আমার বিশ্বাস এমন পরিবৃত/ মাটি আর জলের দ্বারা, এমন আবৃত/ স্নিগ্ধ সূর্য আর নির্মেঘ রাত্রির দ্বারা যে,/ আমি তোমাকে দেখি স্বপ্ন দেখতে বাঁচতে আর ঘুমোতে/ তোমারই চোখ দিয়ে।’ প্রেমিক প্রেমিকা সম্পর্কে এ কবিতা লিখিত হলেও একজন প্রকৃত পাঠক এবং সৎ কবির ভেতর সম্পর্কও এ রকম হওয়া উচিত বলে মনে করি কেননা শেষ পর্যন্ত বিশ্বাস নিঃশ্বাসের মতোই অনিবার্য নিয়ামক মানুষের মানুষ হয়ে ওঠায়।
তথ্যসূত্র:
১। কবির বধ্যভূমি / বিবেক সেন / ভাষাবন্ধন অগাষ্ট, ২০১১ [পৃষ্ঠা নং- ১৭-২৩]
২। উর্বর আগুন / ফ্রান্সের ফ্যাসিবিরোধী সাহিত্য প্রবাহ / সম্পাদনা শুভময় মন্ডল পৃষ্ঠা নং-৩৬৩] / ন্যাশনাল বুক এজেন্সি প্রাইভেট লিমিটেড।
৩। স্পেনের গৃহযুদ্ধ: পঞ্চাশ বছর পরে / সম্পাদনা: মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় / [পৃষ্ঠা নং ৩৬৩] /দে’জ পাবলিশিং
৪। শামসুর রাহমানের শ্রেষ্ঠ কবিতা / শামসুর রাহমান / [পৃষ্ঠা নং ৯২] দে’জ পাবলিশিং
৫। প্রাগুক্ত [পৃষ্ঠা নং- ৯৩]
৬। ব্ল্যাক আউটের পূর্ণিমা / [পৃষ্ঠা নং ৮৭] / শহীদ কাদরীর কবিতা/ শহীদ কাদরী / সাহিত্য প্রকাশ
৭। প্রাগুক্ত [পৃষ্ঠা নং- ৬৬]
৮। নির্বাচিত কবিতা / জর্জ সেফেরিস / ভূমিকা ও ভাষান্তর: শিশির কুমার দাশ / [পৃষ্ঠা নং- ৫১)/ সাহিত্য অকাদেমি
৯। ভাসকো পোপার শ্রেষ্ঠ কবিতা / অনুবাদ: মানবেন্দ্র বন্দোপাধ্যায় / কার্তজোপল / [পৃষ্ঠা নং- ৬৬)
১০। Regnes / অনুবাদ: অরুণ মিত্র / ভাষাবন্ধন / পল এলুয়ার: আমি স্বপ্নকে স্বপ্ন দেখি /পার্থপ্রতিম মন্ডল / [পৃষ্ঠা নং-১৬]


