আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ সাদের ‘রেহানা মরিয়ম নূর’ যখন চলচ্চিত্র দর্শকের আলোচনায়, ওটিটি প্ল্যাটফর্ম ‘চরকি’ মুক্তি দিল ওয়েব সিরিজ ‘গুটি’। আজমেরী হক বাঁধন- এর অভিনয়ের প্রশংসা তখন সবার মুখে। একজন মা যখন জীবন ধারণের প্রয়োজনে মাদক পাচার করেন, পরিস্থিতি কেমন দাঁড়ায়- সংক্ষেপে এই ছিল সেই ওয়েব সিরিজের গল্প। উত্তাল চব্বিশের ডিসেম্বরে মুক্তি পেয়েছিলো ‘গুটি’ নির্মাতা শঙ্খ দাশগুপ্ত পরিচালিত প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘প্রিয় মালতী’। অনেক ছবির মধ্যে, বছরটিতে অন্যতম সেরা চলচ্চিত্র ছিল ‘প্রিয় মালতী’। বাংলাদেশের কাঠামোগত ব্যবস্থাপনার দুর্বলতায় কেমন করে একজন নিম্নবিত্ত হিন্দু পরিবারের স্বপ্ন ভস্মীভূত হয়ে যায়, চলচ্চিত্রটি সে কথা জানিয়েছিল আমাদের। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বার্তাও দিয়েছিল আন্তরিকভাবে। আমরা এক অন্য মেহজাবীন চৌধুরীকে পেয়েছিলাম ‘প্রিয় মালতী’ চলচ্চিত্রে। প্রায় দেড় বছর পর শঙ্খ দাশগুপ্ত ফিরে এলেন দ্বিতীয় চলচ্চিত্র ‘চা গরম’ নিয়ে। মুক্তি পেয়েছে বাংলা নতুন বছরের প্রথম দিন৷ ওটিটি প্ল্যাটফর্ম চরকি’র গ্রাহকরা চলচ্চিত্রটি দেখছেন৷ প্রশংসায় ভাসছেন পরিচালক। কেমন হলো ‘চা গরম’?

মূল আলাপে যাওয়ার আগে বলে রাখা ভালো, যেহেতু এই চলচ্চিত্রের গল্ল চা বাগানের শ্রমিকদের নিয়েই আবর্তিত হয়েছে, আমরা সংক্ষেপে এই দেশের চা বাগানগুলোর শ্রমিকদের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে কিছু তথ্য আরেকবার জেনে নিতে পারি৷ সেক্ষেত্রে পরবর্তী আলাপ এগিয়ে নিতে আমাদের সুবিধা হতে পারে৷ আমাদের দেশে প্রায় সাত লাখ চা বাগান শ্রমিকের বাস। নিবন্ধিত চা বাগান একশো বাষট্টি, এইসব বাগানে প্রায় পঁচানব্বই হাজার শ্রমিক কাজ করেন। অস্থায়ী শ্রমিক মোটামুটি ভাবে সাড়ে ঊনিশ হাজারের মতো। অর্ধ লক্ষাধিক শ্রমিকের মাথা গোঁজার সুনিশ্চিত আশ্রয় নেই। চা- শ্রমিকেরা ওঠেন খুব ভোরে। সারাদিন ধরে বিশ কেজি পাতা তোলেন ঝুম বৃষ্টি, প্রচন্ড রোদ, বিষাক্ত সাপ আর জোঁকের ভয় মাথায় নিয়ে। দৈনিক ২৫০ গাছ ছাঁটতে হয়। কীটনাশক ছেটান এক একর জমিতে। দৈনিক মজুরি মাত্র ১৭০ টাকা। ২০০৭-৮ সালে এই মজুরি ছিল বত্রিশ থেকে পঁয়ত্রিশ টাকা। আট থেকে এগারো ফুটের কুঁড়েঘরে গবাদিপশুর সাথে অধিকাংশ মানুষের বাস। নারী শ্রমিকদের বাড়তি করতে হয় নিজেদের গৃ্হস্থালি সাংসারিক কাজ। অনেকেই জীবন ধারণের প্রয়োজনে বাগানের বাইরে ধানের ক্ষেতে কাজের জন্য চলে যান৷ ধান শ্রমিকদের মজুরি তিনশ থেকে চারশ টাকা। চা বাগানে কোনও কলেজ নেই। স্কুল সংখ্যা হাতে গুনে নেয়া যায়৷ কুষ্ঠ রোগী প্রায় দুই শতাংশ শ্রমিক। প্রায় অর্ধেক শিশু অপুষ্টিজনিত খর্বাকৃতির শিকার। পঞ্চাশ শতাংশ এলাকায় বিশুদ্ধ পানীয় জল নেই। মাতৃ মৃত্যুর হার ঊনচল্লিশ শতাংশ। ‘ এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম, বাংলাদেশ’- এর চব্বিশ সালের পনের জুলাই প্রকাশিত অনলাইন রিপোর্ট থেকে এই তথ্য নেয়া। বিশিষ্ট গবেষক শেখ রফিকের নিবন্ধ থেকেও সহায়তা নিয়েছি।
শঙ্খ দাশগুপ্তের ‘চা গরম’- এর গল্পে ফিরি। চলচ্চিত্রের শুরুতেই আমরা দেখি সাফা কবির আইরিন চরিত্রে চা বাগানে যাচ্ছেন এক মেডিকেল ক্যাম্পে, সাথে তার এক বড় বোন যাওয়ার কথা ছিল কিন্তু তিনি পারিবারিক দায়িত্বের কারণে আটকা পড়েছেন। চা বাগান শুরুতে প্রিভিলেজড, সদ্য এমবিবিএস আইরিনের কাছে অস্বস্তিকর ঠেকে। এমনকি প্রথম সাক্ষাতে চা বাগানের ম্যানেজার যখন তাকে বলেন এই চায়ে মিশে আছে শ্রমিকের রক্ত আর ঘাম, সে বিদ্রুপ করে। ম্যানেজারটি যেন সমরেশ মজুমদারের উপন্যাস থেকে উঠে এসেছেন। তিনি যখন বলেন – আগে নানারকম সংকট থাকলেও এখন পরিস্থিতি অনেকটাই ভালো, প্রশ্ন জাগে। সত্যিই কি এখন চা বাগানের পরিস্থিতি সন্তোষজনক? না অক্সফাম টাকা দিলে ভালো ভালো কথা বলতে হয়? চা বাগানের গাছ যেমন কেটে ছেঁটে বেঁটে করে ফেলা হয়, রবিন চাঁদ মুর্মুর ভাষায় – বাগানের জীবনও বেশি বাড়তে দেয়া হয় না। ঠিক তেমন ভাবেই চা বাগানের গল্পটিও এখানে ইচ্ছেপূরণের গল্প হয়ে ওঠে। আইরিন ঔষধপত্রের বাক্স আনতে ভুলে যায়, তার প্রেমিক মিঠু নিয়ে আসতে গিয়ে চা বাগানের শ্রমিকদের সাথে নির্মম রসিকতা করে। মিঠু পাতার বিরাট বোঝা আনতে থাকা একজন নারী শ্রমিককে পারিশ্রমিক জিজ্ঞেস করলে তিনি একটি যৎসামান্য অংক বলেন। সে তখন বলে, আপনারা তো এই টাকা পাবেন আমি তো কিছুই পাবো না৷ বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে নিম্নবর্গের মানুষ নিয়ে, শারীরিক বা মানসিকভাবে চ্যালেঞ্জড মানুষজনকে নিয়ে রসিকতা করবার যে বদ খাসলত আছে, সে অশুচি থেকে এই ছবিটিও মুক্ত হতে পারল না। চা বাগানের এক জায়গায় শ্রমিকদের খাওয়ার দৃশ্যটিও মনোরম করে দেখান পরিচালক। ঘাস পাতা জাতীয় কিছু একটা ভর্তা করে খান তাঁরা৷ সে বিষয়ে কথা বলা রেখে শঙ্খ চলে যান নিরাপদ ল্যাট্রিনের দিকে। এমনকি মিঠু নকশা বানিয়েও দেখায় ম্যানেজারকে।

তবে, নন্দিনীর চরিত্রে সারাহ জেবীন অদিতি এবং রবিন চাঁদ মুর্মু চরিত্রে রেজওয়ান পারভেজ স্মরণীয় অভিনয় করেছেন। সাফা কবির আর পার্থ শেখের অতি অভিনয়কে তাঁরা ভারসাম্য দিয়েছেন। রবি নেটওয়ার্কের বারংবার প্রশংসা স্বস্তির ঠেকে না কেন না চলচ্চিত্রেও অর্থদাতা প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন ব্যবহারের একটি পরিমিতি বোধ থাকা দরকার। অনিয়মিত পিরিয়ড, অপুষ্টি, চিকিৎসা ও পর্যাপ্ত ঔষধ না থাকা- জরুরি এইসব প্রসঙ্গে আলাপ তুলেছে ছবিটি। শিল্প নির্মাণ চেষ্টা অনেক সময় আরামদায়ক একটা অবস্থান বেছে নেয়। অন্য দিক থেকে, আমাদের কারও কারও হুমায়রা বিলকিস নির্মিত ‘বাগানিয়া ( গার্ডেন অফ মেমোরিজ) ‘ মনে পড়ে যেতে পারে। বাগানের মানুষজনকে স্থানীয় কথ্য রীতিতে বাগানিয়া বলা হয়। ২০১৯ সালের এই তথ্যচিত্রে নির্মাতা বাগানের সত্য পরিস্থিতি কবিতাপ্রতিম এক মরমি ভাষায় দেখান। সত্য প্রকাশের ক্ষেত্রে তিনি বিন্দু আড়ালেরও আশ্রয় নেন না।
যখন কারও ‘বাগানিয়া’ দেখা থাকে, চা বাগানের পরিস্থিতি জানা থাকে, কিছু রাজনৈতিক পড়াশোনা থাকে, ‘চা গরম’ চলচ্চিত্রটিকে রবি আর অক্সফামের দীর্ঘতর বিজ্ঞাপন বাদে কিছুই মনে হয় না। আমরা, তবু ‘প্রিয় মালতী’ সৌজন্যে শঙ্খ দাশগুপ্তের তৃতীয় চলচ্চিত্রের অপেক্ষায় থাকবো।

