কার কবিতা কে লেখে

Date:

মানুষের রক্তের অন্তর্গতে গুজবের প্রতি মুগ্ধতা আছে। বলা ভালো, বংশানুক্রমিক জিনবহনে ৷ সভ্যতার আদি যুগে অসংখ্য গুজব, ভ্রান্তিদর্শন মানুষের মধ্যে প্রকৃতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য এক বিকল্প বোধ তৈরি করেছিলো। সময়ের পরিক্রমায়, সভ্যতার অগ্রবর্তিতায় গুজবের প্রগতিশীল ভূমিকা আর নেই বরং এটি এখন বায়ুবেগে বিস্তারলাভ করে জনপদ ধ্বংস করতে পারে। মানুষের জীবনের সকল ক্ষেত্রেই এই ‘ফ্যাব্রিকেটেড লাই’ তথা অলংকৃত মিথ্যে বিশাল জমি দখল করে আছে ৷

ব্যক্তিজীবনে, সমাজজীবন, রাজনীতি এবং শিল্পযাপনে ৷ আমরা আজ বিশ্বসাহিত্যে কিংবদন্তী লেখক গ্যাব্রিয়েল মার্কেজকে কেন্দ্র করে ছড়িয়ে পড়া এক গুজবের শুলুক সন্ধান করব ৷ ঘটনার উৎসে যাওয়ার আগে তা থেকে উদ্ভুত এক প্রায় সাম্প্রতিক প্রতিক্রিয়ার কথা পড়ে নিতে পারি ৷

২০১৪ সালে মার্কেজের মৃত্যুর দিন কতক পর বাইশে এপ্রিল ভারতের রায় বেরিলিতে তাঁর বক্তৃতায় প্রিয়াঙ্কা গান্ধী দক্ষিণ আমেরিকান এক লেখকের চিঠির কথা বলেন- তিনি নিশ্চয়ই মার্কেজের কথা-ই বলছিলেন। অথচ, আদতে চিঠিতে একটা কবিতা – লা মারিওনেতা নাম, ইংরেজিতে দ্য পাপেট, ১৯৯৬ সালে প্রকাশিত হয়। বক্তৃতায় প্রিয়াঙ্কা বলেন – ‘ সম্প্রতি একজন দক্ষিণ আমেরিকান লেখক প্রয়াত হয়েছেন। একবার তিনি বন্ধুদের কাছে একটা চিঠি লিখেছিলেন৷ আমি দিন কতক আগে পড়েছি সে চিঠি। তিনি বলেছিলেন, সারাজীবন ধরে আমরা বলা না বলার দোলাচলে থেকে যাই ৷ আমাদের অবশ্যই হৃদয়ের কথা বলতে জানতে হবে ৷ এমন অনুভূতি আমার মধ্যেও এসেছে ৷ দেখুন, নির্বাচনগুলো কোন বস্তুতে পরিণত হয়েছে। কেমন ধরণের রাজনীতির খেলা চলছে চারদিকে – এই গৌতম বুদ্ধ এবং মহাত্মা গান্ধীর ভূমিতে… এই অঞ্চলের চারিত্র্য বদলে গিয়েছে।’

গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ বিখ্যাত লেখক হওয়ার আগে ছিলেন একজন সাংবাদিক ৷ ১৯৪৮ সালে আইন বিদ্যালয়ের ছাত্র থাকাকালে , তিনি এল ইউনিভার্সেল সংবাদপত্রে কাজ করতে শুরু করেন৷ ১৯৫০ থেকে ১৯৫৩ এই সময়কালে, এল হেরাল্ডো স্থানীয় পত্রিকায় তাঁর নিবন্ধমালা প্রকাশিত হতো ৷ সেখান থেকে তিনি এল এসপেকতাদোরে চলে আসেন। ১৯৫৮ সালে এল মোমেন্টো থেকে প্রস্তাব পেয়ে সম্পাদক হিসেবে ভেনেজুয়েলা যান। কলম্বিয়ান নেভী নিয়ে এমন এক সাহসী নিবন্ধ লিখেছিলেন যা সেখানকার কর্তৃপক্ষকে বিব্রত করে। এর ফলে পদোন্নতির নামে এক রকমের নির্বাসনে তাঁকে ইউরোপে পাঠিয়ে দেয়া হয়। অনুসন্ধানী মন সাংবাদিকতার ভাঁড়ারে অজস্র অভিজ্ঞতা জড়ো করে ৷ পরবর্তীকালে, জিনি এইচ বেল- ভিলাদার মতো সমালোচক ঔপন্যাসিক হিসেবে সর্বমান্য হওয়ার প্রেক্ষাপট হিসেবে চিহ্নিত করেন সাংবাদিকজীবনের অভিজ্ঞতা। মানুষের দিনানুদিনের খুঁটিনাটি বাস্তবতা চিত্রণে তাঁর দক্ষতা ছিলো প্রশ্নাতীত। মার্কেজের নাম প্রায়ই সংবাদপত্রে দেখা যায়- তাঁর নিবন্ধের জন্যে নয় অনেক সময় বরং যেভাবে মার্কেজের জীবন তাঁরা বিবৃত করে সেইজন্যে। সাম্প্রতিক একটা নকল বিদায়ী চিঠি থেকে সাংবাদিকতার ছাত্র, আগ্রহীদের শেখার অনেক বিষয় আছে৷

মার্কেজের প্রয়াণের পর, অসংখ্য পত্রিকা আর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাঁর বইয়ের উদ্ধৃতিতে ভরে ওঠে। আমরা বলতে পারি, প্রায় সকল পত্রিকা তার পাঠকদের কাছে আরেকবার পরিচয় ঘটিয়েছিলো মার্কেজের রচনার সাথে৷ কিছু রচনা তাঁর জীবনকাল বিষয়ে প্রাথমিক প্রতিবেদনের বাইরে কিছুই নয়- যখন অন্যেরা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলো যেমন করে মার্কেজকে বুঝতে হয় সে বিষয়ে তারা পাঠকদের শিক্ষিত করে তুলবে। আমি মনে করি, যে কোনো লেখককে বোঝার আসল পদ্ধতি লুকিয়ে আছে তাঁর বইতে।

একটি পত্রিকায় তাঁর প্রয়াণ পরবর্তী সংবাদ প্রকাশিত হয়- ‘ নোবেল পুরস্কার বিজয়ী মার্কেজ প্রয়াত হয়েছেন।'( ১৭ এপ্রিল,২০১৪) – এই শিরোনামে। নিবন্ধের ভিত্তি ছিলো মেক্সিকো সিটি থেকে পাওয়া খবরে নির্ভর করে এ পি’র অনলাইন মাধ্যম। নিবন্ধটির শেষ অংশের শিরোনাম ছিলো -‘ গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের এক বিদায়ী চিঠি’। এইবার আমরা পড়বো চিঠির শেষে ছাপা কবিতাটি।

‘ যদি একজন মুহূর্তের ঈশ্বরের জন্য ভুলতে হয় আমি মূলত পুতুল ত্যানা কাপড়ের আর এক টুকরো জীবন উপহার দিয়েছে আমায়, সম্ভবত যা ভাবি তার সবটুকু উচ্চারণ করতাম না, বদলে যা বলি সেসব ভেবে নিতাম। বস্তুসমাবেশের মূল্য দিতাম বটে, তার জাগতিক নয় বরং তারা অন্তরে কী অর্থ লুকিয়ে রেখেছে তার জন্যে । অল্পই ঘুমাতাম আমি , অধিক স্বপ্ন নেমে আসতো আমার চোখে , বুঝে যেতাম চোখ বন্ধ করার প্রতিটি মিনিট আমরা ষাট সেকেন্ড আলো হারিয়ে ফেলি।

আমি হাঁটতাম যখন অন্যেরা স্থির।

জেগে উঠতাম যখন অন্যেরা ঘুমে।

অন্যের কথা শুনতাম আমি, আর কত ভালোবাসতাম ভালো চকোলেট আইস্ক্রিম! ঈশ্বর যদি এক টুকরো বেঁচে থাকা দেন আমায় , আমি পরতাম সাধারণ পোষাক , সূর্যের প্রথম আলোর মুখোমুখি দাঁড়াতাম , নগ্ন শরীর নয় কেবল খোসাছাড়ানো আত্মাসহ। ওগো আমার ঈশ্বর , আমায় যদি হৃদয় দিতে একটা , ঘৃণা লিপিবদ্ধ করতাম বরফে আর সূর্যদর্শনের অপেক্ষায় থাকতাম। ও আমার ভগবান , যদি এক খণ্ড জীবন পেতাম- প্রতিটি দিন আমি মানুষকে বলতাম , দেখো তোমাদের কতটা ভালোবাসি। প্রতিটি নারী ও পুরুষকে বিশ্বাস করাতাম তাদের আমি প্রিয় বলে মনে করি – আর আমি ভালোবাসায় বাঁচি ৷ প্রমাণ করে দিতাম, বুড়ো হয়ে গেলে প্রেমে পড়া বারণ এ কথা ভুল, প্রেমে পড়া বন্ধ করলেই বরং লোকে বুড়ো হয়ে যায় অজ্ঞাতে। এক শিশুর প্রতি – আমি তাকে ডানা দিতে পারি, কিন্তু কেবল তাঁকেই শিখতে দাও ওড়ার পদ্ধতি। বড়োদের প্রতি, আমি তাঁদের শেখাতে পারতাম, বুড়ো হতে হতে মৃত্যু আসে না। মৃত্যু আসে বিস্মরণে। ও আমার মানুষ, কতো কিছুই না তোমার কাছে শিখেছি… আমি শিখেছি প্রত্যেকেই পাহাড়ের খাঁজ নির্বাচন করে বাসস্থান হিসেবে , সত্যকারের আনন্দ কেমন করে পাওয়া গেলো তার চড়াই উৎরাইয়ে আছে। আমি শিখেছি যখন প্রথমবার এক নবজাতক বাবার হাত ধরে, চিরকালের জন্যেই ধরে। আমি জেনেছি অন্যকে দাঁড়াতে সাহায্য করলেই তার দিকে দৃষ্টিপাতের অধিকার মেলে। কতোকিছুই না তোমার কাছে শিখেছি , শেষ পর্যন্ত কাজে আসেনি অধিক। কারণ যখন তারা সুটকেসটার ভেতর রাখলো আমায়, দুর্ভাগ্য আঁকড়ে ধরায় মারা যাচ্ছিলাম। সবসময় যা অনুভব করছো সেটাই বলো এবং করে ফেলো মনে যা আছে তা-ই।’ 

– এই সেই কবিতা।

এই কবিতা পেরুভিত্তিক কাগজ লা রিপাবলিকায়, দুই হাজার সালের ২৯ মে প্রকাশিত হয়। পত্রিকার বক্তব্য অনুযায়ী, ১৯৯৯ সালে মার্কেজ  ‘পুতুলটি’  শিরোনামে কবিতাটি লিখে ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের পাঠান। পরদিন মেক্সিকান সংবাদপত্র লা ক্রোনিকা প্রথম পাতায় ছাপায়। শিরোনাম – ‘মার্কেজ জীবনের গান গেয়েছেন। ‘ দ্রুত কবিতাটি সারা দুনিয়ায় ছড়ায়। রেডিওতে অজস্র ভাষার অনুদিত অবয়ব পঠিত হয়। এমনকী ভারতীয় পরিচালক মৃণাল সেন হিন্দুস্তান টাইমস জানান, এই কবিতা তাকে কতটা আলোকিত করেছে। আদতে এই কবিতাটি মেক্সিকান ভেন্ট্রিলোকুইস্ট ও পাপেটিয়ার জনি ওয়েলশের লেখা। ‘মোফলেস’- শীর্ষক পুতুলনাট্যের জন্যে রচিত। তিনি ইনফোরেড রেডিওতে জানান, একের রচনার অন্যের নামে প্রচারিত হওয়ায় তিনি গভীর অস্বস্তি বোধ করছেন। অন্যদিকে, মার্কেজ মৃত্যু অধিক ব্যথা পেয়েছিলেন এমন সস্তা রচনা লোকে তাঁর প্রণীত ভাবছে বলে।

অথচ সামান্য পরিশ্রমে অনুসন্ধানী তৎপরতা চালালে বোঝা যাওয়া সম্ভবপর ছিলো- এটি মার্কেজ রচনা নয় ৷ সেই সময়ের সাংবাদিকরা অধিক প্রচারের মোহে এইটুকু কষ্ট করতে চাইলেন না। এখনো আমরা দেখি, বেশি ‘ভিউজের’ লোভে চটকদার গুজব পরিবেশিত হতে যা হওয়া কাঙ্ক্ষিত নয় সুস্থ সমাজে। 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Share post:

সাবস্ক্রাইব

সম্পাদকের নির্বাচিত

আরও পড়ুন
আরও পড়ুন

বৃত্ত

“সমস্যাটা কি খুব জটিল?” ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞাসা করলেন রহমান...

স্বপ্নমঙ্গলের কথা

ফেরদৌস আরা আলীম স্বপ্নদেবের উপর শচীদেবীর আস্থা আজও অবিচল। স্বপ্নের...

কবিতা বলতে আমি যা বুঝি

কবিতা এই সময়ে কারা লেখে এবং কেন লেখে এটাই...

নাচ দেশে দেশে

নাচ ব্যক্তির নিজস্ব অনুভূতি প্রকাশের মাধ্যমে একটি গল্পকে বিশ্বের...