নভেরার জন্য এলিজি

Share post:

Date:

১৯৪৭ এ ধর্মের ভিত্তিতে ভারত-পাকিস্তান ভাগ হলেও পূর্বপাকিস্তানের ভাষা ও সংস্কৃতির অমিল থেকে যায়। ১৯৫১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী ৫৫
শতাংশ বাংলাভাষী পূর্ব পাকিস্তানের মানুষকে পশ্চিম পাকিস্তানের শোষকেরা রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক আগ্রাসন চালাচ্ছিলো। ১৯৫২ সালের ২৬ জানুয়ারি পল্টন ময়দানে খাজা নাজিমুদ্দিনের ‘উর্দুই পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হবে’ ঘোষণায় সকলে বিক্ষুদ্ধ। ৩০ জানুয়ারি ধর্মঘট, আমতলার সভা ও ঢাকার প্রধান সড়কের বিক্ষোভে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল ও ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ সহ সর্বস্তরের শিক্ষার্থীরা যুক্ত হলো। ৪ ফেব্রুয়ারি হরতাল এবং ১২, ১৩, ১৪ ফেব্রুয়ারি কালো পতাকা উত্তোলন ও প্রতিবাদ চলতে থাকলে ২১ ফেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারা জারি করে সভা, সমাবেশ, মিছিল নিষিদ্ধ করা হয়। ‘১৪৪ ধারা মানিনা, মানবো না’, ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’, ‘চলো চলো অ্যাসেম্বিলিতে চলো’ স্লোগানে ১৪৪ ধারা ভেঙে ২১ ফেব্রুয়ারির মিছিলের জনস্রোতে পুলিশ গুলি করে। প্রথমে রফিকের মাথার খুলি উড়ে মগজ ছিটকে পড়লো। বরকতের উরুতে ও জব্বারের তলপেটে গুলি লাগে। মারাত্মক আহত আবদুস সালাম হাসপাতালে মারা যায়। পুলিশ গভীর রাতে হাসপাতাল থেকে লাশ চুরি করে আজিমপুর গোরস্তানে দাফন করে হত্যাযজ্ঞ গোপন রাখার চেষ্টা করে। ক্ষুদ্ধ ছাত্র জনতা রফিক, বরকত, জব্বার ও সালামের গায়েবানা জানাজা পড়ে বিক্ষোভ জানায়।

২৩ ফেব্রুয়ারি রাতে ঢাকা মেডিকেল কলেজে ছাত্র সভায় ‘শহীদ স্মৃতি অমর হোক’ ভাবনায় স্মৃতিস্তম্ভ গড়ার প্রস্তাব পাশ হলো। ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক ইঞ্জিনিয়ার গোলাম মাওলা নিজে নকশা করলেও সাঈদ হায়দারের নকশাটি নির্বাচন করে। সন্ধ্যায় ছাত্ররা ঠিকাদার পিয়ারু সর্দ্দারের গোডাউন থেকে সিমেন্ট, বালি ও ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ইট জোগাড় করে। রাতারাতি
পুলিশের দৃষ্টি এড়িয়ে দক্ষ রাজমিস্ত্রি নিয়ে ১২ নম্বর ব্যারাকের পাশে রফিক গুলিবিদ্ধ হওয়ার স্থানে স্মৃতিস্তম্ভ তৈরি হলো। মাটির পাঁচ ফুট গভীর থেকে উত্থিত নিম্নাংশের কিউব- ‘আন্দোলনের দৃঢ়তা’ ও ক্রমশ চৌকো উড্ডীন চূড়া- ‘একুশ মাথা নোয়াবার নয়’ বার্তা দিলো। ফুল হাতে ছুটে আসা জনস্রোত নবনির্মিত শহীদ মিনারটিকে মুহুর্তকাল একাকী থাকতে দিলো না। ২৬ ফেব্রুয়ারী সাংবাদিক আবুল কালাম শামসুদ্দীনের উদ্বোধনের পর পুলিশ বুলডোজার এনে গুঁড়িয়ে দিলে প্রথম শহীদ মিনারটির আয়ু হয়েছিলো মাত্র ৩ দিন।

১৯৫৩ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি আঁকিয়ে জিয়া হাসান, বদরুল আলম, নুরুল ইসলাম সহ অন্যরা লাল কাগজ ও কালো কাপড়ে প্রথম মিনারের আকৃতিতে অস্থায়ী শহীদ মিনার গড়লো। ঢাকা হল ও ফজলুল হক হলের দেখাদেখি সারাদেশে কাগজ, কাপড়, বাঁশ ও কাঠের অস্থায়ী শহীদ মিনার তৈরি হতে থাকলো। ১৯৫৭ সালে পূর্ণাঙ্গ শহীদ মিনার না হওয়া পর্যন্ত প্রভাতফেরির পর অস্থায়ী শহীদ মিনারে পুস্পার্ঘ্য নিবেদনের রেওয়াজ চালু ছিলো। ১৯৫৬ সালে প্রাদেশিক মুখ্যমন্ত্রী আতাউর রহমান খান শহীদ মিনারের স্থাপনে গণপূর্তের চিফ ইঞ্জিনিয়ার আবদুল জব্বারকে আহ্বায়ক, শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন, স্থপতি মাযহারুল ইসলামকে সদস্য ও দুই বিদেশী স্থপতি দুলুরান ও ম্যাকোনেলকে উপদেষ্টা করে কমিটি গঠন করে। কমিটির আহ্বানে জমাকৃত ৫২ টি
নকশার মধ্য থেকে সদ্য বিলেত ফেরত ভাস্কর নভেরার শিল্পচিন্তিত মূল কাঠামোতে চিত্রশিল্পী হামিদের ম্যুরালের সমন্বিত নকশাটি নির্বাচিত হয়।

ফরাসি ‘নভেরা’ অর্থ নবজন্ম। বাঙালির প্রথম ও প্রধান স্মারকে যুক্ত হয়ে নভেরা চাচার রাখা নামটিকে যথার্থতা দেয়। সুন্দরবনের নোনা হাওয়া ও আদিম অরণ্যে নভেরার জন্মভুগোল শুরু হলেও বাবা সৈয়দ আহমদের চাকরির সুবাদে নানান স্থানে তাঁদের বাস। কলকাতায় সাধনা বসুর কাছে নাচ শিখে ছয় বছরে সোনার মেডেল পান। লরেটা স্কুল থেকে মেট্রিকুলেশন করে দেশভাগের পর কুমিল্লায় ভিক্টোরিয়া কলেজে ভর্তি হন। বাবার সহকর্মীর ছেলে পুলিশ কর্মকর্তার সাথে অপ্রস্তুত, তড়িৎ বিবাহিতা হলেও দ্রুত বিচ্ছেদ হয়। মায়ের হাতেগড়া পুতুলমুগ্ধ নভেরা পুতুল বউ না হয়ে ভাস্কর হতে চায়। কুমিল্লার পাট চুকিয়ে বাবা চট্টগ্রামের আসকার দিঘীর পাড়ে আবাস গড়েন। কাজল আঁকা বড় বড় চোখ, উচ্চতার কমতিতে গোলগাল বিষন্ন আকর্ষণীয়া চট্টগ্রাম কলেজে ভর্তি হন। পোশাক প্রিয়তায় কালো শাড়ির সাথে ঘটিহাতা বা স্লিভলেস ব্লাউজ, হাতে বালা, গলায় রুদ্রাক্ষের মালা, কপালে সন্ন্যাসীর লম্বা টিপ, পিঠময় লম্বাচুল, হাইহিল পরে স্বাচ্ছন্দ্যে ঘুরে বেড়াতেন। নজরুলজয়ন্তী উৎসবে নিজস্ব
কম্পোজিশন ও মিউজিক ডিরেকশনে নজরুল সংগীতের আবহে আধুনিক নাচ করে নজর কেড়েছিলেন।

মেজো বোন পেয়ারি ও ভগ্নিপতির লন্ডনবাস সুবাধে লন্ডনে আইনশাস্ত্র পড়তে গিয়ে নভেরা ভাস্কর্য পড়তে চায়। হাতেখড়ি না থাকায় ভাস্কর্যবিদ্যায় ভর্তি সহজ নয়। দেশে দু’বছর আর্ট পড়ে হামিদুর রহমান তখন বড়ভাই নজির আহমেদের কাছে লন্ডনে। বাঙালি কমিউনিউটির সূত্রে নতুন
অভিযাত্রীদ্বয়ের পরিচয়। লন্ডন সফররত জয়নুল আবেদিন নভেরার আগ্রহ দেখে স্কেচ, ড্রয়িং, মানবদেহ আঁকা শেখান। বোনের দেশে ফেরায় হামিদের ফ্ল্যাটের একরুম নভেরার ঠিকানা হলো। এক বছর পর ক্যাম্বারওয়েল স্কুল অব আর্ট অ্যান্ড ক্রাফর্টস এ ডিপ্লোমা ইন ডিজাইন অ্যান্ড স্কাল্পচার বিভাগে ভর্তির সুযোগ আসে। আমিনুল ইসলামের ইতালির শিল্প শহর ফ্লোরেন্স থাকার সুবাদে ১৯৫৪ সালে নভেরা চার মাস বিখ্যাত ভাস্কর
ভেন্তিরিনো ভেনতুরির শিক্ষানবিশ হন। হেনরি মুর, জ্যাকব এপস্টাইনের শিল্পকর্ম আয়ত্ত করেও ইউরোপীয় শিল্পের অন্ধ অনুকরণ না করে নভেরা এশীয়
কাদামাটি ও জলজ হাওয়ার শিল্পচিন্তা ধারণ করেন।

১৯৫৭ সালের ঢাকা ভাস্কর্য চর্চার জন্য তৈরি নয়। মার্বেল পাথর ও সীসা ঢালাইয়ের সুযোগ নেই, শুধু বালি,
সিমেন্ট দিয়ে মূর্তি বানানো হতো। পুরাণ ঢাকায় অশোক লেনের হামিদদের একান্নবর্তী দালানগুলোর একটির দোতলায় আধুনিকার আবাস হলো। বন্ধু হামিদের সাথে কাজ ও কমিশনের অনুসন্ধান চলছে। জয়নুল আবেদিন দুই বিলেত ফেরত শিল্পীকে পাবলিক লাইব্রেরির দেয়ালে ম্যুরাল ও রিলিফের কাজ পেতে সহায়তা করলেন। স্রষ্টার ঐশী বাহন ‘বোরাক’ ও ‘পড় তোমার প্রভুর নামে’ (ইকরা বিসমে রাব্বিকা) অনুষঙ্গে ম্যুরাল তৈরি হয়। চিত্রশিল্পী সুলতানও একদিন ম্যুরাল দেখতে এসে আশেক লেনের ডেরায় গিয়ে বাঁশি
বাজিয়ে নভেরার কাজের ক্লান্তি ভুলিয়েছিলেন। পত্রিকায় রিভিউ লেখার সূত্রে সাংবাদিক এস.এম. আলীও মাটির কাপে চা খেয়ে গেলেন।

১৯৫৭ সালের নভেম্বরে রাষ্ট্রীয় অনুমোদনের পর নকশা অনুযায়ী মেডিকেল কলেজ মাঠে শহীদ মিনারের কর্মযজ্ঞ শুরু হয়। বাঁশ, বেড়ার ঝুপড়িতে অস্থায়ী আবাস। অশোক লেন থেকে হামিদের মা টিফিন ক্যারিয়ার ভর্তি খাবার পাঠান। সিমেন্ট, বালি ও কোদাল হাতে রোদে পোড়া প্যান্ট-শার্ট পরা তরুণী ভাস্করকে দেখতে কৌতুহলী ভিড়। মাটির প্ল্যাটফর্মে গাছের শুকনো ডাল বসিয়ে মডেল তৈরী হয়। বেদির নিচের
গ্যালারিতে ১৫০০ বর্গফুটের ম্যুরালে ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস, মাথা নোয়ানো স্তম্ভগুলোর মাঝে রঙিন কাঁচ, রেলিংয়ে বর্ণমালার মিছিল, সামনে জলের
ফোয়ারা ও ভাস্কর্য, স্টেইন্ড গ্লাস থেকে প্রতিফলিত আলোয় মিনারের মেঝে রক্তআভায় ভাসানোর পরিকল্পনা।দ্রুততার সাথে মূলকাঠামো, স্তম্ভ, ম্যুরাল, তিনটি ভাস্কর্য তৈরি, অন্যান্য কাজও এগিয়ে চলছে। ১৯৫৮ সালের অক্টোবরে আইয়ুব খানের সামরিক সরকার ‘বিজাতীয় সংস্কৃতি’র অজুহাতে কাজটি বন্ধ করে। বিষণ্ন নভেরা পুরান ঢাকা থেকে মণিপুরি পাড়ায় আবাস গড়েন।ঢাকা এয়ারপোর্ট সড়কে শিল্পপতি এম.আর. খানের বাড়িতে ভাস্কর্য তৈরির কাজে যুক্ত হন।

হামিদ ১৯৫৯ সালে স্কলারশিপ নিয়ে ম্যুরালের উপর পড়তে আমেরিকা গেলো। বেইলি রোডের নতুন ঠিকানার স্টুডিওতে নভেরা ভাস্কর্য নির্মাণে ব্যস্ত। সাংবাদিক এস.এম. আলীর পাকিস্তান ইউনাইটেড অ্যাসোসিয়শনের উদ্যোগে একক
প্রদর্শনীর প্রস্তাব নিয়ে আসে। ময়মনসিংহ ও কৃষ্ণনগরের গ্রাম-গ্রামান্তর ঘুরে এসে তৈরি ভাস্কর্যের সমন্বয়ে প্রদর্শনীর নাম হলো- ‘ইনার গেজ’ বা ‘অন্তদৃষ্টি’। রেহমান সোবহানের আত্মজীবনী ‘উতল রোমন্থন পূর্ণতার সেই বছরগুলো’তে গায়ের রং ফর্সা, মুখাবয়বে পূর্ব এশীয় আকর্ষণীয় অপার্থিব চেহারা, সবসময় কালো পোশাক পরে চিরাচরিত ঢিমে আলোজ্বলা নিরালা রাজ্যে ষ্টুডিওতে ভাস্কর্যের কাজ করা নভেরা ধরা দিলেন। রেহমান সোবহানের স্মৃতিতে- ‘গভীর অনুভূতিপ্রবণ এবং অতিসংবেদনশীল নভেরাকে একবার পাশ্চাত্য ধ্রুপদী যন্ত্রসংগীতের কিছু লং-প্লেয়িং রেকর্ড শোনালে ভীষণ আবিষ্ট হয়ে পড়ে।মাঝেমধ্যে তাকে গাড়িতে নিয়ে ঘুরতাম। একবার ব্রিটিশ কাউন্সিল আয়োজিত এক সফরকারী নাট্যদলের অভিনয় দেখতে নিয়ে যাই। জনসমক্ষে আমাদের দু’জনের এই ঘুরাঘুরিতে কিছু গুজব ছড়িয়েছিলো। তখনকার আমলে অবিবাহিত যুবকের সুন্দরী একাকিনী মহিলার অ্যাপার্টমেন্টে নিয়মিত যাতায়াত অস্বাভাবিক ছিলো। ১৯৬২ সালে সালমার সঙ্গে বিয়ের জন্য আমার লন্ডন যাবার আগে এক বছরের বেশি সময় আমি নভেরার কাছে যাতায়াত করেছি। সে সময় নভেরাও ঢাকা ছেড়ে ইউরোপ সফরে পাড়ি দেয় যেখান থেকে সে আর কখনো ফেরেনি। যদি বলি নভেরা আমাকে আকর্ষণ করেনি, অথবা আমাদের সম্পর্ক আরও এগিয়ে যাবার বাসনা হয়নি, তবে তা সত্য হবে না। আমি জানি না, নভেরার পক্ষ থেকেও আমার প্রতি এমন অনুভূতি ছিল কিনা বা আমাদের সম্পর্ক আর এগিয়ে নিয়ে যাবার বাসনা তার হত কিনা, তবে আমি আমার রাজনৈতিক পর্বে প্রবেশ করেছি এবং আমরা বুঝতে পারছিলাম যে আমাদের দুই পৃথিবী সর্বদাই দুই মেরুতে বিভাজিত থাকবে। ফলে সেটা হয়েছিল, আমাদের সম্পর্ক প্লেটোনিক স্তরেই থেকে যায়, সুতরাং আমি সালমাকে বিয়ে করেছি এই সিদ্ধান্ত জানাবার সময় কোনো আবেগের বোঝা আমাদেরকে বিসর্জন দিতে হয়নি। ও বুঝতে পেরেছিল যে আমাদের সম্পর্ক শেষ হবে। ওর সান্নিধ্যে আমি আনন্দ পেয়েছি এবং ওর কাছ থেকে বিদায় নিতে দুঃখ হয়েছে।’

হামিদ যখন আমেরিকা থেকে ফিরে এলেন বন্ধু হামিদকে পাশে বসিয়ে নভেরা জানায়- এখানে আমার জীবন মৃতপ্রান্তে পৌঁছেছে। তুমি ও তোমার পরিবারের কাছে অনেক ঋণ। তোমাকে ছোট করে প্রবঞ্চনা করবো না। চিরদিনের বন্ধন আমার জন্য নয়, লাহোরে যাবো ঠিক করেছি। বিহ্বল হামিদের বুঝলো- পাকিস্তানকেন্দ্রের সম্ভাবনা ও সাংবাদিক আলী নভেরাকে টানছে। নভেরার লাহোরবাস শুরু হলো।

১৯৬২ সালে নভেরার মূল নকশা অনুকরণ না করে দ্রুত নির্মিত সংক্ষেপিত শহীদ মিনার ১৯৬৩ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি আবুল বরকতের মা হাসিনা বেগম উদ্বোধন করলেন। মূল শিল্পরূপ অনুযায়ী মার্বেল পাথরে রক্তাভ আভা ফুটলো না, ঝরনা, ঘড়ি, ভাস্কর্য, ম্যুরাল নেই- শুধু লোহার কবাট যুক্ত স্তম্ভগুলো কারাগারের বন্দীত্ব প্রকাশ করছে। ১৯৭১ সালের মার্চে পাকিস্তানিরা সেটিও ধ্বংস করে দিয়ে গেলে স্বাধীন বাংলাদেশে শহিদ মিনার রইলো না। ১৯৭২ সালে
পুনঃনির্মিত শহীদ মিনারেও নভেরার শিল্পরূপ থাকলো না। নথিপত্রে মূলন কশাকার হিসেবে হামিদুর রহমানের নাম প্রতিষ্ঠিত হয়ে অসম্মানজনক ‘সহযোগী’ হিসেবে নভেরা চিহ্নিত হন। মুর্তজা বশীরের মতে- ‘শহীদ মিনার একটি কবিতা হলে তার ছন্দ এসেছিল নভেরার ভাস্কর্যবোধ থেকে’। সৈয়দ শামসুল হক লিখলেন- ‘বাংলাদেশে ভাস্করদের মধ্যে প্রথম তিনি এবং আমার মনে হয় এখনো তাঁর তুল্য একজন ভাস্কর এ দেশে আসেননি: খ্যাতি অর্থ নয়, পাশ্চাত্যের অনুকরণ নয়—তাঁর কাজের একমাত্র প্রেরণা ছিল যেন স্রষ্টারই প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে বস্তুরূপ নতুন করে সৃজন করা এবং তিনি ছিলেন বিরূপ পরিবেশে প্রকৃত প্রতিভাধরের মতোই অভিমানতাড়িত একজন, যিনি স্বেচ্ছায় সব ছেড়ে যেতে পারেন, এমনকি সৃষ্টির দুটি হাত।
এই শহীদ মিনারের মধ্যভাগে শোকে অবনত মা এবং দু’পাশে তাঁর দুটি করে সন্তান; তারা বাস্তবানুগ নয়, বিমূর্ত, বন্দী স্বদেশের লৌহগরাদের অবিকল স্মৃতির মিনার রচনায় আমাদের এতকালের যাবত নকশা ছিল ইসলামী বা ভারতীয়, যেমনটি দেখা যায় গোরস্তানে বা শ্মশানে কিংবা পাশ্চাত্যে সূচীমুখ স্তম্ভে এবং তাও খ্রিষ্টীয়, এ সকলই কী অসাধারণ কল্পনাবলে বর্জন করে ভাষা আন্দোলনের শহিদদের স্মৃতিতে ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ একটি মিনার-কল্পনা, ব্যক্তিগতভাবে আমি জানি, করেছিলেন ভাস্কর নভেরা আহমেদ। নভেরাই নকশাটিকে প্রথম কল্পনা করেন, হামিদুর রহমানের সঙ্গে সেই সময়ে ছিল নভেরার বিশেষ সখ্য এবং তাঁরা মিনার-নকশার কাজে ছিলেন যৌথভাবে নিবিষ্ট; আমাদের বয়সীরা এখনো ভুলে যাইনি যে ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের নকশা হামিদুর রহমান একা করেননি, নভেরাও সমঅংশে সঙ্গে ছিলেন এবং নকশাটির বীজ উপ্ত হয়েছিল প্রথমত নভেরারই করোটিতে। অথচ নভেরার নাম আমরা করি না, কেবল হামিদের নাম করে থাকি। এখন প্রয়াত হামিদ আমার দীর্ঘদিনের বন্ধু হলেও তাঁর মৃত্যুর আগেও তাঁকে বহুবার বলেছি এবং এখনো বলছি তাঁর আত্মার প্রতি আমার সকল ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা রেখেই যে তিনি নিজেই শহিদ মিনার প্রসঙ্গে কখনো নভেরার নাম গুরুত্ব দিয়ে উচ্চারণ করেননি, সবটুকু কৃতিত্ব নিজের জন্যে দাবি করেছেন, এমনকি বেশ কয়েক বছর আগে টেলিভিশনে আমি একবার যখন তাঁর সাক্ষাৎকার নিই, তখনো আমার বারবার ধরিয়ে দেয়া সত্ত্বেও তিনি নভেরার ভূমিকাকে তুচ্ছ করেছেন, উড়িয়ে দিয়েছেন, নভেরাকে কেবল তাঁর এক দীপ্তিহীন সহকারী বলে উল্লেখ করেছেন।’
সাংবাদিক আলীর মাধ্যমে লাহোরে কবি ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ এর সাথে পরিচয়- যিনি পাকিস্তান আর্টস কাউন্সিলের সেক্রেটারি। পাকিস্তানে স্থাপত্য তখনো মূর্তিপুজার সাথে তুলনীয়। ফয়েজের প্রস্তাবে পাকিস্তানের জাতীয় শিল্প প্রদর্শনীতে নভেরার ছয়টি ভাস্কর্য প্রদর্শিত হলো। ‘চাইল্ড ফিলোসফার’ সেরা ভাস্কর্য নির্বাচিত হয়। ফয়েজের চিঠি নিয়ে নভেরা ভারতের
বৈজয়ন্তীমালার কাছে নাচ শিখতে বম্বেতে লেখিকা ইসমত চুগতাই ও সিনেমা নির্মাতা শহিদ লতিফ দম্পতির আতিথ্য নিলেন। ভাস্কর্যে নাচের মুদ্রা পরিস্ফূটনের প্রয়োজনে কষ্টেসৃষ্টে বৈজয়ন্তীমালাকে রাজি করিয়ে কয়েকদিনের পাঠ ও দু’দিন অবিরাম নৃত্য চর্চার এক পর্যায়ে পায়ের ব্যালেন্স ঠিক রাখতে না পেরে পড়ে আহত নভেরা দ্রুত লাহোর ফিরলেন।

হঠাৎ ফিট হওয়া, অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার প্রবণতা নিয়ে নভেরার অলৌকিক ইন্দ্রিয়ের ঘ্রাণ ঘটনা-দূর্ঘটনার আগাম আভাস পেতো। বন্ধুত্বে জড়ালেও অনধিকার প্রবেশের সুযোগ নভেরা রাখতো না। ভালোবাসা দিয়েও প্রেম নয়, সকল মুক্ত করেও গহন গোপনতায় নভেরার বাস। হামিদের মতো আলীকেও বিদায় জানিয়ে লাহোরের ঠিকানা গুটিয়ে প্রথমে ব্যাংকক ও পরে প্যারিসে থিতু হন। ভিয়েতনাম যুদ্ধে ব্যবহৃত ভাঙা প্লেনের ডানা দিয়ে পারাবত, ট্যাংক দিয়ে লাঙল, আর্টিলারি দিয়ে কলম বানান। যুদ্ধ বিরোধী ভাস্কর্য প্রদর্শনীতে ‘শান্তির পারাবত’ দেখে এক জাপানি পৌঢ় বিড়বিড় করে বলেছিলো- হিরোশিমা! হিরোশিমা!!

১৯৭৩ থেকে ফ্রান্সে বাস শুরুর পর ২৪ ডিসেম্বর সড়ক দূর্ঘটনায় মারাত্মক আহত হন। চিকিৎসা নিয়ে হুইলচেয়ার বন্দী জীবন এড়ানো গেলো না। সীমাবদ্ধ
সক্ষমতায় ভাষ্কর্য নির্মাণ কঠিন হলে ক্যানভাসে ছবি আঁকা শুরু করেন। ধাতবপাত, লোহা, ব্রোঞ্জের সমন্বয়ে নতুন ভাস্কর্যে মনোনিবেশ করেন। প্যারিসের ‘অতীতালেখ্য’ প্রদর্শনীতে ৩০টি চিত্রকর্মের সাথে মাত্র ১২ টি ভাস্কর্য ছিলো।
১৯৬৪ সালে ফ্রান্সবাসী রুশ মসিউ গ্রেগোয়া দ্য ব্রুন্সের সাথে পরিচয়ের ২২ বছর পর ১৯৮৫ সালে তাঁরা পরিণয়ে আবদ্ধ হন। ২০০৫ সালে প্যারিস থেকে ৬৭ কিলোমিটার দূরে সিন নদীর ধারে গভীর অরণ্য ও পাহাড়ের পাদদেশে শাঁতমেল গ্রামে স্টুডিও ও আবাস গড়েন। ‌জীবনের শেষান্তে মসিউ গ্রেগোয়া দ্য ব্রুন্সের সাথে দাম্পত্য নভেরাকে নির্ভরতা দিয়েছিলো।
নভেরার সর্বসাকুল্যে ১০০টি ভাস্কর্যের মধ্যে ১৯৬০’র প্রদর্শনীতে ৭৫টি, ১৯৭০ সালের ব্যাংককের প্রদর্শনীতে ২৫টি ভাস্কর্য ছিলো। বাংলাদেশে সংরক্ষিত ভাস্কর্যের মধ্যে জাতীয় জাদুঘরে ৪০টি, কয়েকটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে, কিছু ব্যক্তিগত সংগ্রহে মিলিয়ে ৫০ টি রয়েছে। কিছু ভাস্কর্য পাকিস্তানে, ইংল্যাণ্ডে ও ইতালীতে থাকতে পারে, কিছু হয়তো চিরতরে হারিয়ে বা নষ্ট হয়ে গেছে।

১৯৬৬ থেকে ২০১৫ অবধি কুহু ও
কুহকের নভেরাকে নিয়ে কবিতা, গল্প, উপন্যাস রচিত হয়েছে। সকলের স্মৃতিতে নভেরার রহস্যময় অবস্থান। পুর্ব পাকিস্তান ও এশীয় জলজ আবহাওয়ার পুরুষতান্ত্রিক ডিসকোর্স ভেঙে দেয়া নভেরাকে অভিমানি, পলায়নপর ও রহস্যময়ী নানান মিথ তৈরি হলেও প্রকৃত নভেরার আবিষ্কার সহজ ছিলো না।হামিদের সাথের সখ্য অজানা কারণে শুশ্রূষার অতীত চিড় ধরেছিলো। সর্ব অর্থে বিদায়ী নভেরা কখনো প্রীতি ও পুরষ্কার দাবি করেননি।

ভাই শাহরিয়ারের বউ লুৎফন মিথের আড়ালের অন্য নভেরার আবিষ্কার করেন। ১৯৫৭ সালে পাবলিক লাইব্রেরির কাজ চলাকালীন সময়ে পেটে ফোলা ও তীব্র ব্যথা হয়। বিষয়টি নিকটজনদের জানাতেই- বিবাহ বর্হিভূত প্রেগন্যান্সির সন্দেহ! অপমানে দগ্ধ নভেরা গোপনে অপারেশন করালেন। টিউমারের সাথে ইউরেটাসও ফেলতে দিতে হলো। প্রবল মাতৃত্বকামিনী মা হবার সক্ষমতা হারিয়ে বিহ্বল হয়ে গেলেন। সেই জন্যেই হামিদের সাথে প্রতারণা করলেন না, সোবাহানের বন্ধনে জড়ালেন না, আলীর সাথে চলা পথও দীর্ঘ করলেন না।

শামসুর রাহমান যাকে নহে মাতা, নহে কন্যা ও স্বভাবে বোহেমিয়ান বলেছিলেন- প্রকৃত অর্থে মৃত মাতৃত্বে বিহ্বল নভেরা ভাস্কর্যে নিজেকেই রচনা করেছেন।অপ্রস্তুত বিয়ে, দ্রুত বিচ্ছেদ, বিলেতে অপ্রচলিত ভাস্কর্য পাঠ থেকে মুক্ত জীবন অবধি ইচ্ছা পূরণের আশ্রয়দাতা বাবা অসুস্থ হলে ১৯৬৭-১৯৬৮ সালে দেশে এসেছিলেন। বাবার মৃত্যুর পর ফ্লাইট বিভ্রাটের জন্য শেষ দেখা না হওয়ায় বাবার ঘরে একাকী সময় কাটালেও কারো সাথে কথা বলতেন না। মা ক্যান্সার আক্রান্ত হলে আবার দেশে ফিরেছিলেন- হাসপাতালে মায়ের পাশের মেঝেতে বিছানা পেতে সেবা করেছিলেন। কিছুটা সুস্থ মা প্যারিসে ফিরে যাওয়ার আকুতি জানান- তিনি বুঝেছিলেন- এদেশের জলহাওয়া মেয়েটির জন্যে নয়!
১৯৮৭ সালে ব্যাংকের কাজে প্যারিসে গিয়ে নভেরার কাজিন রাশেদ নিজাম হন্যে হয়ে খুঁজে ব্যর্থ হবার শেষতম সময়ে ক্যাফে ব্ল্যাঙ্কের টেবিলে ওয়াকিং স্টিক পাশে রাখা, সাদা চুলের বয়স্কা নভেরাকে দেখেন। দীর্ঘ অদেখায় রাশেদকে নভেরা চিনলো না। অদূরের টেবিলে বসে শেষতম স্বজনের চোখে দেখেও দৃষ্টি আকর্ষণ করে বিব্রত করলেন না। অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে আনা ইসলাম প্যারিসে নভেরার সাক্ষাত পান। লোকমুখে প্রচলিত শহিদ মিনারের মাঝের উঁচু ঝুঁকে থাকা স্তম্ভটি আনত মমতাময়ী ‘মা’; দুই পাশের চারটি ছোট স্তম্ভ চার সন্তান- সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারের প্রতীকের প্রচলিত ধারণা শুনে বিস্মিত নভেরা আনাকে জানান- মূলত বোধিবৃক্ষতলে উপবিষ্ট বুদ্ধের উত্থিত কিছুটা আনত করতলকে শান্তির প্রতীক হিসেবে দেখাতে চেয়েছি। যে শিল্পরূপ আদৌ কোনোকালের শহিদ মিনারই ধারণ করেনি। উপযুক্ততা সত্ত্বেও ফ্রান্সের নাগরিক না হয়ে বাংলাদেশের সবুজ পাসপোর্ট ধারণ করা নভেরা ১৯৯৭ সালে একুশে পদক গ্রহণের জন্য দেশে ফিরলেন না।

আত্মমর্যাদা ঋদ্ধ কষ্টে ভরা জীবনে শিশুর সতেজতা ও রঙের সিম্ফনির নভেরা ২০১৫ সালের ৬ মে মারা যান। মৃত্যু সংবাদ পেয়ে ছুটে আসা আনা ইসলামকে জড়িয়ে ধরে পড়শি বিদেশিনী কেঁদেছিলো। কমলা রঙের শেষ যাত্রার পোশাকের সাথে বাগানের উজ্জ্বল হলুদ গোলাপ, শেষ প্রদর্শনীর ক্যাটালগের সাথে সেই পাখিটিকেও কফিনে রাখা হয়- ছোট্ট পাখিটি সেদিনই মারা যায়।

শেষ দিনগুলোতে জানালার ধারে খাবার ছিটিয়ে নভেরা পাখিটির সাথে খুনশুটিতে মাততেন। শিল্পী শাহাবুদ্দীনসহ প্যারিসবাসী বাঙালিরা শোকাহত গ্রেগোয়া কে সমবেদনা জানান। অন্য কীর্তিমানের মতো জন্মসাল নিয়েও দ্বিধা থাকলেও কবর ফলকে লেখা হলো- ‘নভেরা দ্য ব্রুনস আহমেদ (১৯৩৯-২০১৫)’। শাঁতমেলে স্থাপিত শিল্পশালায় নভেরার শেষ ভাস্কর্য ও ছবিগুলো সংরক্ষিত আছে। নির্জন, মগ্ন নভেরার সাথে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়েও গ্রেগোয়া কি পরিপূর্ণ নভেরাকে আবিষ্কার করতে পেরেছিলেন? সাইয়িদ
আতীকুল্লাহ লিখেছিলেন- ‘নভেরার কথা মনে পড়ে কারো!’
‘নভেরাকে কি মনে পড়ে না?
কি অভিমানিনী সে আসে না কোনো দিন শহীদ মিনারে-
শহীদ মিনার কী করুণ ডাকে সেই নভেরাকে
কিছুতে পায় না সাড়া, ডাকে বারবার
যিনি একুশের দিনে নভেরাকে
আত্মার ভেতর থেকে তুলে এনেছিলেন’।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সাবস্ক্রাইব

spot_img

সম্পাদকের নির্বাচিত

আরও পড়ুন
আরও পড়ুন

‘বার্স্ট অফ জয়’ : পুলিৎজার জয়ী ছবির শিক্ষা

ডিজিটাল ক্যামেরা ওয়ার্ল্ড অনলাইনে প্রকাশিত টম মে প্রণীত প্রতিবেদন...

ব্যাটারি রিকশা: আমাদের ভাবনা

ব্যাটারি রিকশা নিয়ে অনেক ধরনের আলাপ চলে আসছে গত...

নেপালের বর্ণিল গাই যাত্রা

নেপালের তিব্বত সীমান্তে রাসুয়া জেলায় ভয়াবহ এবং মর্মান্তিক হড়পা...

বাংলার ইগল: বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমান

একটি জাতি কেবল তার বর্তমান দিয়ে গড়ে ওঠে না;...