পৃথিবীর পরিবেশ সচেতন বিজ্ঞানীরা প্রশান্ত মহাসাগরের ওপর নিবিড় নজর রাখছেন। এই নজর রাখার কারণ প্রশান্ত মহাসাগরের গভীরে ইতিহাসের অন্যতম শক্তিশালী একটি জলবায়ু বিপর্যয় দ্রুত শক্তি সঞ্চয় করছে। ন্যাশনাল ওশেনিক অ্যান্ড অ্যাটমোস্ফিয়ারিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (NOAA) সাম্প্রতিকতম পূর্বাভাস সত্য হলে, আগামী জুলাই মাসের মধ্যে ‘এল নিনো’ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা এখন ৬১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। ‘এল নিনো’ মূলত ক্রান্তীয় প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের একটি সাময়িক উষ্ণায়ন প্রক্রিয়া, যা বিশ্বজুড়ে আবহাওয়ার ধরণকে বদলে দেয়।
যদিও এই সকল ঘটনা প্রতি কয়েক বছর পর পর ঘটে থাকে, তবে এবারেরটি অতিরিক্ত শক্তিশালী হতে পারে। NOAA-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রতি চারবারের মধ্যে একবার এই ঘটনাটি অত্যন্ত তীব্র আকার ধারণ করার সম্ভাবনা রয়েছে, যা এই বিপর্যয়কে ‘সুপার’ এল নিনো হিসেবে চিহ্নিত করবে। মানুষের লিখিত ইতিহাসে এ ধরনের চরম পরিস্থিতি মাত্র কয়েকবারই দেখা গেছে। প্রতিবারই এই ধরনের ঘটনা একাধিক মহাদেশে খরা, বন্যা এবং রেকর্ড তাপমাত্রার সৃষ্টি করেছে। এসবের চেয়েও বড় উদ্বেগের বিষয় হলো, বিজ্ঞানীদের মতে মানুষের পরিবেশ বিষয়ক অবহেলার ফলে প্রতিনিয়ত পরিবেশ বিরোধী কর্মকান্ডে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব আর এই অত্যন্ত শক্তিশালী এল নিনো— দুইয়ে মিলে এমন এক নজিরবিহীন পরিস্থিতির সৃষ্টি করতে পারে, যা আগে কখনো দেখা যায়নি।
“আমি মনে করি, এল নিনোর এই শক্তি সঞ্চয়ের ঘটনাটির অতি মাত্রায় বিপর্যয় ঘটাবার পঞ্চাশ শতাংশ সম্ভাবনা আছে।” যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব অ্যালবানি-র বায়ুমণ্ডলীয় বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক পল রাউন্ডি বিবিসি সায়েন্স ফোকাস-কে এ কথা বলেন। “কয়েক সপ্তাহ আগেও আমি এটি প্রায় বিশ শতাংশ বলেছিলাম।”
এল নিনো (El Niño) কী? এবারেরটি কেন আলাদা?
একটি পুনরাবৃত্ত জলবায়ু চক্র, যা গ্রীষ্মমণ্ডলীয় প্রশান্ত মহাসাগরের পৃষ্ঠের জলভাগ উষ্ণ হওয়ার কারণে ঘটে থাকে। এই ঘটনাই এল নিনো।

ছবি সূত্র: NOAA Climate.gov, Data: Coral Reef Watch
কয়েক বছর পর পর, সাধারণত যে আয়ন বাতাস বা বাণিজ্য বায়ু (ট্রেড উইন্ড) উষ্ণ পানিকে পশ্চিম দিকে ঠেলে দেয়, তা দুর্বল বা বিপরীতমুখী হয়ে পড়ে। এর ফলে জমে থাকা তাপ বিষুবরেখা বরাবর পূর্ব দিকে ছড়িয়ে পড়ে। মধ্য প্রশান্ত মহাসাগরের একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস (৩.৬ ডিগ্রি ফারেনহাইট) এর বেশি বেড়ে গেলে এই ঘটনাটি সুপার এল নিনো নামে পরিচিত। নথিবদ্ধ ইতিহাসে মাত্র তিনবার এমন ঘটনা ঘটেছে: ১৯৮২/১৯৮৩, ১৯৯৭/৯৮ আর ২০১৫/২০১৬ সালে। আধুনিক আবহাওয়া সংক্রান্ত রেকর্ড লিখে রাখার আগে আগে, ১৮৭৬ সালে একটি সুপার এল নিনো বিশ্বব্যাপী এক দুর্ভিক্ষের সৃষ্টি করেছিল বলে ধারণা করা হয়, যাতে প্রায় ৫০ মিলিয়নেরও বেশি মানুষ মারা গিয়েছিল।

ছবি সূত্র: NOAA
স্যাটেলাইটের মাধ্যমে পাওয়া সচিত্র তথ্যের কারণে আমরা জানি, প্রশান্ত মহাসাগরে উষ্ণ পানি জমা হওয়ার কারণে কীভাবে ২০১৫ সালের সুপার এল নিনো তৈরি হয়েছিল। এই বছরের ঘটনাটিও একইভাবে শক্তিশালী হতে পারে। অধিক উষ্ণ বৈশ্বিক জলবায়ুর মধ্যে এল নিনো বিপুল সঞ্চয় করছে বিপর্যয় ঘটাবার আগে। অধ্যাপক রাউন্ডি ব্যাখ্যা করেছেন, এই বছর প্রশান্ত মহাসাগরের ওপর দিয়ে শক্তিশালী পশ্চিমা বাতাসের ধারাবাহিক প্রবাহের কারণে জমে থাকা পানির একটি বিশাল ভাণ্ডার বিষুবরেখা বরাবর পূর্ব দিকে চলে গেছে।

ছবি সূত্র: NASA Scientific Visualization Studio
প্রায় একই রকম ঘটনা ঘটেছিল ১৯৯৭ সালের শুরুর দিকের একটি ঝড়ো বাতাসের সময়ে, যা সম্ভবত বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে শক্তিশালী ‘এল নিনো’-র পূর্বাভাস ছিল। রাউন্ডি বলেন, “এই বছরের পশ্চিমা বাতাসের তীব্র প্রবাহের পূর্ব দিকের উষ্ণ পানি, ১৯৯৭ সালের ঠিক একই সময়ের উষ্ণ পানির তুলনায় প্রায় আধ ডিগ্রি বেশি উষ্ণ। তখনকার তীব্রতাকে ছাড়িয়ে যাওয়ার জন্য এই ঘটনাটির পেছনে আমার ধারণা উষ্ণ পানি প্রবাহ প্রয়োজনীয় গতিবেগেই ছুটে গিয়েছে।” তবুও, চূড়ান্ত ফল কি দাঁড়াবে তা এখনও নিশ্চিত নয়। ভবিষ্যতে বাতাসের গতিপথ পরিবর্তন এই ঘটনাটিকে আংশিকভাবে স্তিমিত বা প্রতিহত করতে পারে।

ছবি সূত্র: NASA Goddard Space Flight Center Scientific Visualization Studio
রাউন্ডি বলেন, “বাণিজ্য বায়ুর ঐতিহাসিক ভাবে যে বাড়ছে তার বণ্টন, পশ্চিমা বাতাসের ঘটনার বণ্টন, এবং সাম্প্রতিক ঘটনাটি কতটা শক্তিশালী ছিল- এই তিন তথ্য উপাত্তের ওপর ভিত্তি করে বলা যায়, এই বাড়তে থাকা ‘এল নিনো’ ঘটনাটিকে ‘অত্যন্ত শক্তিশালী’ হিসেবে না দেখে কেবল ‘শক্তিশালী’ পর্যায়ে রাখতে হলে বাণিজ্য বায়ুর তীব্রতাকে এমন এক পর্যায়ে পৌঁছাতে হবে যা অতীতের ৯৯ শতাংশ রেকর্ডকেও ছাড়িয়ে যায়।” আরেক দিক থেকে ভেবে দেখতে গেলে, একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ‘এল নিনো’ হওয়া এখন প্রায় নিশ্চিত। তবে এটি অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে ফেলবে কি না, তা এখনও অজানা।
বিবিসি সায়েন্স ফোকাস অবলম্বনে


