সেন্ট মার্টিন্সের বিস্ময়কর প্রাণী অয়েস্টারের না-বলা কথা

Date:

বাংলাদেশের একমাত্র কোরাল সমৃদ্ধ দ্বীপ সেন্ট মার্টিন্সের স্বচ্ছ নীল জলের দিকে তাকালে পাথরের মতো যে অজস্র গঠন চোখে পড়ে, তার অনেকগুলোই আসলে প্রাণহীন পাথর নয়, বরং জীবন্ত প্রাণী। এরা হলো অয়েস্টার (Oyster)। খাদ্য হিসেবে এর জনপ্রিয়তা যেমন বিশ্বজুড়ে, ঠিক তেমনি সমুদ্রের পরিবেশ রক্ষায় এবং মূল্যবান মুক্তা তৈরিতে এর ভূমিকা এককথায় অতুলনীয়। চলুন, প্রকৃতির এই অদ্ভুত বিস্ময় সম্পর্কে আজ কিছু তথ্য জেনে নিই।

পানির নিচে শৈবালে আচ্ছাদিত একটি সামুদ্রিক ঝিনুক।
ছবি: শরীফ সারওয়ার

অয়েস্টার কী এবং এর প্রকারভেদ

অয়েস্টার মূলত এক প্রকার দ্বি-কপাটিক (Bivalve) মলাস্ক বা কম্বোজ প্রাণী। এদের নরম শরীরটি দুটি শক্ত খোলস দিয়ে ঢাকা থাকে। এরা প্রধানত সামুদ্রিক বা আধা-লবণাক্ত (Brackish) জলে বাস করে। পৃথিবীতে বিভিন্ন প্রজাতির অয়েস্টার পাওয়া গেলেও এদের মূলত দুটি প্রধান ভাগে ভাগ করা যায়:

ট্রু অয়েস্টার (True Oysters): এই প্রজাতির অয়েস্টারগুলো মূলত মানুষ খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে এবং বিশ্বজুড়ে বাণিজ্যিকভাবে এদের ব্যাপক চাষ হয়।

মুক্তা উৎপাদনকারী অয়েস্টার (Pearl Oysters): যদিও তত্ত্বগতভাবে সব অয়েস্টারই মুক্তা তৈরি করতে পারে, তবে এই বিশেষ প্রজাতির অয়েস্টারগুলোই বাণিজ্যিকভাবে উজ্জ্বল, নিখুঁত এবং মূল্যবান মুক্তা উৎপাদনের জন্য বিখ্যাত।

রোমাঞ্চকর জীবনচক্র

একটি অয়েস্টারের জীবনচক্র বেশ জটিল এবং আকর্ষণীয়। জলের প্রবাহে স্ত্রী ও পুরুষ অয়েস্টারের ডিম ও শুক্রাণুর নিষেকের মাধ্যমে এদের জীবনের শুরু। এরপর ডিমগুলো ক্ষুদ্র লার্ভায় পরিণত হয় এবং স্বাধীনভাবে জলে সাঁতার কেটে বেড়ায়। প্রায় দুই থেকে তিন সপ্তাহ পর লার্ভাগুলো সেন্ট মার্টিন্সের প্রবাল বা পাথরের মতো কোনো শক্ত পৃষ্ঠ খুঁজে নিয়ে স্থায়ীভাবে আটকে যায়। এই আটকে যাওয়া কচি অয়েস্টারকে বলা হয় ‘স্প্যাট’। একবার কোথাও আটকে যাওয়ার পর এরা আর স্থান পরিবর্তন করতে পারে না। সেখানেই ধীরে ধীরে খোলস শক্ত করে ১ থেকে ৩ বছরের মধ্যে এরা পূর্ণাঙ্গ অয়েস্টারে পরিণত হয়।

অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য: প্রয়োজনে লিঙ্গ পরিবর্তন!

অয়েস্টারের একটি অনন্য ও অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য হলো এরা পর্যায়ক্রমিক উভলিঙ্গ (Sequential Hermaphrodites)। অর্থাৎ, এরা প্রয়োজনে নিজেদের লিঙ্গ পরিবর্তন করতে পারে! সাধারণত জীবনের শুরুতে এরা পুরুষ থাকে, তবে বয়স বাড়ার সাথে সাথে পরিবেশের অবস্থা ও খাদ্যের প্রাচুর্যের ওপর ভিত্তি করে এরা স্ত্রী অয়েস্টারে রূপান্তরিত হতে পারে। এমনকি এরা জীবনে একাধিকবার নিজেদের লিঙ্গ বদলাতে সক্ষম।

সমুদ্রেরকিডনি প্রকৃতির প্রকৌশলী

অয়েস্টারকে সমুদ্রের “কিডনি” বা প্রকৃতির পরিচ্ছন্নতাকর্মী বললে মোটেও অত্যুক্তি হবে না।

জল পরিশ্রুতকরণ: একটি প্রাপ্তবয়স্ক অয়েস্টার প্রতিদিন প্রায় ৫০ গ্যালন (প্রায় ১৯০ লিটার) জল ফিল্টার করতে পারে। এরা জল থেকে অতিরিক্ত পুষ্টি উপাদান, ফাইটোপ্লাংকটন এবং ক্ষতিকারক কণা ছেঁকে খেয়ে বেঁচে থাকে, যা সেন্ট মার্টিন্সের মতো কোরাল সমৃদ্ধ দ্বীপের জলকে পরিষ্কার ও স্বচ্ছ রাখতে গুরুত্ববহ ভূমিকা পালন করে।

এরা একসাথে মিলে ছোট বড় কলোনি বা ‘অয়েস্টার রিফ’ তৈরি করে। এই ছোট ছোট রিফগুলো শক্তিশালী সামুদ্রিক ঢেউয়ের আঘাত থেকে উপকূলীয় অঞ্চলকে রক্ষা করে এবং ভাঙন রোধ করেতে পারে । 

আশ্রয়স্থল: সেন্ট মার্টিন্সের অয়েস্টার সমৃদ্ধ স্থানে কাঁকড়া, ছোট মাছ ও অন্যান্য সামুদ্রিক প্রাণীদের জন্য নিরাপদ বাসস্থান এবং প্রজনন কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে, যা দ্বীপের জীববৈচিত্র্যকে সমৃদ্ধ করে।

পুষ্টিগুণে ভরপুর এক সুপারফুড

খাদ্য হিসেবে অয়েস্টার পুষ্টির একটি পাওয়ার হাউস। এতে চর্বির পরিমাণ অত্যন্ত কম, কিন্তু মানবদেহের জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদানে এটি ভরপুর। অয়েস্টারে প্রচুর পরিমাণে জিংক (Zinc) রয়েছে যা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। এছাড়া এতে থাকা ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড, ভিটামিন বি-১২, আয়রন ও ক্যালসিয়াম আমাদের হার্ট, মস্তিষ্ক, স্নায়ুতন্ত্র ও হাড় সুস্থ রাখতে দারুণ কার্যকরী।

Oyster article cover Sharif Sarwar
সেন্ট মার্টিন দ্বীপের উপকূলে ছড়িয়ে থাকা অয়েস্টারের খোলস।
ছবি: শরীফ সারওয়ার

সেন্ট মার্টিন্স অয়েস্টারের টিকে থাকার লড়াই

সেন্ট মার্টিন্স দ্বীপের ভঙ্গুর ইকোসিস্টেমের জন্য অয়েস্টারের উপস্থিতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখানকার কোরালের স্বাস্থ্য সরাসরি জলের গুণগত মানের ওপর নির্ভরশীল। অয়েস্টার জলকে ফিল্টার করে কোরালের বেঁচে থাকার জন্য একটি স্বাস্থ্যকর পরিবেশ তৈরি করে।  সংক্ষেপে বলতে গেলে, অয়েস্টার কেবল একটি সুস্বাদু সামুদ্রিক খাবার বা মূল্যবান মুক্তার উৎসই নয়, বরং এটি আমাদের সামুদ্রিক পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখার অন্যতম প্রধান কারিগর। তাই শুধু খাদ্য বা মুক্তার উৎস হিসেবে নয়, সেন্ট মার্টিন্সের মতো অমূল্য প্রাকৃতিক সম্পদকে বাঁচাতে হলে অয়েস্টারের মতো নীরব পরিবেশকর্মীদের রক্ষা করা আমাদের সকলের দায়িত্ব।

1 COMMENT

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Share post:

সাবস্ক্রাইব

spot_img

সম্পাদকের নির্বাচিত

আরও পড়ুন
আরও পড়ুন

মাইক্রোপ্লাস্টিক সম্পর্কে জানবার কথা

প্লাস্টিক দূষণ নিয়ে সামান্য খোঁজখবর নেয়া মানুষ মাত্রই মাইক্রোপ্লাস্টিক...

সমুদ্রের তলদেশের ‘সবুজ মুক্তো’: পুষ্টি ও সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত

“কখনো কি ভেবেছেন, সমুদ্রের তলদেশে আঙুরের মতো দেখতে একটি...

লায়ন ফিশ: সমুদ্রের বিষাক্ত রাজপুত্র

সমুদ্রের নীল জলরাশির নিচে যে কয়টি প্রাণী একাধারে অসীম...

সেন্টমার্টিন দ্বীপে সাগরতলে কোরাল ব্লিচিং

বিশ্বজুড়ে সামুদ্রিক পরিবেশ আজ এক অস্তিত্ব রক্ষার সংকটে দাঁড়িয়ে।...