প্লাস্টিক দূষণ নিয়ে সামান্য খোঁজখবর নেয়া মানুষ মাত্রই মাইক্রোপ্লাস্টিক শব্দটি শুনেছেন। এই ছোট ছোট প্লাস্টিকের কণাগুলো সমুদ্রের গভীর থেকে মাউন্ট এভারেস্টের চূড়া এমনকি মানুষের শরীরের ভেতরেও পাওয়া গেছে।
কিন্তু মাইক্রোপ্লাস্টিক কাকে বলে, মাইক্রো প্লাস্টিক নিয়ে কেন আমাদের চিন্তা করতে হবে, বিশ্বের এ বিষয়ে কী করা উচিত? – এইসব বিষয়ে বিস্তারিত জানতে পড়তে থাকুন।
মাইক্রোপ্লাস্টিক কী?
মাইক্রোপ্লাস্টিকের নানারকম সংজ্ঞা রয়েছে। এই সংজ্ঞাগুলোর মধ্যে একটি সংজ্ঞা অনেকেই ব্যবহার করে থাকেন। এই সংজ্ঞা অনুযায়ী, ১ ন্যানোমিটার থেকে ৫ মিলিমিটার প্রস্থের যেকোন প্লাস্টিকের টুকরোই হলো মাইক্রোপ্লাস্টিক। ১ ন্যানোমিটার হলো মানুষের চুলের প্রস্থের সামান্য একটি ভগ্নাংশ মাত্র। আর ৫ মিলিমিটার প্রায় একটি বিয়ের আংটির প্রস্থের সমান।

মাইক্রোপ্লাস্টিক কোথা থেকে আসে?
জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচির (UNEP) ইকোসিস্টেম ডিভিশনের পরিচালক সুসান গার্ডনারের মতে, মাইক্রোপ্লাস্টিকের প্রধান উৎস দুটি। কিছু প্লাস্টিক উৎপাদক প্রতিষ্ঠান ছোট আকারে তৈরি করা হয়। এগুলোকে ‘প্রাইমারি মাইক্রোপ্লাস্টিক’ বলা হয়। যেমন ফেসওয়াশ বা অন্যান্য প্রসাধন সামগ্রীতে ব্যবহৃত ‘মাইক্রোবিডস’। বড় প্লাস্টিক পণ্যের ধীরে ধীরে ক্ষয়ে আসা বা ভেঙে যাওয়ার ফলে আরেক রকমের মাইক্রোপ্লাস্টিক তৈরি হতে থাকে । এসবের মধ্যে রয়েছে প্লাস্টিক র্যাপ (মোড়ক), টেক-অ্যাওয়ে কন্টেইনার, পলিয়েস্টার কাপড়, টায়ার, রঙ এবং খেলার মাঠে ব্যবহৃত কৃত্রিম ঘাস। এগুলো ‘সেকেন্ডারি মাইক্রোপ্লাস্টিক’ হিসেবে পরিচিত।

মাইক্রোপ্লাস্টিক কতটা সহজলভ্য?
খুব সহজে পাওয়া যায় । এই প্লাস্টিক কণা পানি, মাটি এবং বাতাসে পাওয়া যায়। গবেষণা হতে পাওয়া এক হিসাব অনুযায়ী, ২০২০ সালে প্রায় ২৭ লক্ষ টন মাইক্রোপ্লাস্টিক আমাদের পরিবেশে মিশেছে। ধারণা করা হচ্ছে, ২০২৪ সালের মধ্যে প্রায় দ্বিগুণ হবে এই পরিমাণ । নদী, হ্রদ আর সমুদ্রে প্লাস্টিক দূষণ প্রতিরোধ কর্মী গার্ডনার বলেন, ” এখন দ্বিধাহীন বলা যায়, মাইক্রোপ্লাস্টিক প্রায় সবখানেই রয়েছে।”
পরিবেশে কেমন করে মিশছে এই মাইক্রোপ্লাস্টিক?
মাইক্রোপ্লাস্টিকের পরিবেশে মেশার বেশ কিছু উপায় আছে । সময়ের সাথে সাথে ফেলে দেওয়া প্লাস্টিক পণ্য—যেমন পানির বোতল বা প্লাস্টিকজাত মোড়ক ভেঙে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র মাইক্রোপ্লাস্টিকে পরিণত হয়। পলিয়েস্টারের মতো সিন্থেটিক কাপড় পরিষ্কার করার সময়, তা থেকে মাইক্রোপ্লাস্টিক ফাইবার বা আঁশ ঝরে পড়ে। তার বাইরে মাইক্রোপ্লাস্টিক যুক্ত বিভিন্ন প্রসাধনী বা পণ্য ব্যবহারের মাধ্যমেও এই অত্যন্ত ছোট কণাগুলো পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ে।
মাইক্রোপ্লাস্টিক যেভাবেই পরিবেশে আসুক না কেন, একবার এলে তা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। গবেষণায় দেখা গেছে, এই সব কণা আমাদের খাদ্যশৃঙ্খলের বাইরেও মাটি, পানি, বরফ এমনকি বাতাসের মাধ্যমেও চলাচল করতে পারে।
গার্ডনার বলেন, “মাইক্রোপ্লাস্টিক কোন পদ্ধতিতে নানা জায়গায় বিচরণ করে এবং কোথায় গিয়ে জমা হয়, তা আমরা কেবল বুঝতে শুরু করেছি। তবে একটি বিষয়ে সম্পূর্ণ নিশ্চিতভাবে জানা গেছে। যখন এগুলো পরিবেশে মেশে, তখন এগুলো আমাদের খাদ্যশৃঙ্খলেও প্রভাব ফেলে । আমাদের স্বাস্থ্যের ওপর এর সম্ভাব্য প্রভাব বুঝতে বিজ্ঞানীরা প্রতি মুহূর্তে সচেষ্ট। এই বিষয়ে দুশ্চিন্তার যথেষ্ট কারণ আছে। “
মাইক্রোপ্লাস্টিক কেন মানুষের জন্য সমস্যা হতে পারে?
মাইক্রোপ্লাস্টিক খাওয়া দাওয়া এবং শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে আমাদের শরীরে প্রবেশ করতে পারে। তবে, ১ মাইক্রোমিটারের চেয়েও ছোট ‘ন্যানোপ্লাস্টিক’, ত্বকের ভেতরে ঢুকতে পারে কি না, সে বিষয়ে এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ২০১৯ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, অবস্থান এবং জীবনযাত্রার ওপর ভিত্তি করে একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ বছরে গড়ে ৩৯,০০০ থেকে ৫২,০০০ মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা গ্রহণ করতে পারেন। আমাদের শরীরের বিভিন্ন স্থানে এমনকি ধমনীর প্রাচীরেও মাইক্রো প্লাস্টিক পাওয়া গেছে।
মাইক্রোপ্লাস্টিক কি উদ্ভিদ, প্রাণী এবং পরিবেশের ক্ষতি করছে?
হ্যাঁ। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, এটি ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটন নামক এক ধরণের আণুবীক্ষণিক সামুদ্রিক শৈবালের বাড়তে থাকা কমায়। অথচ, এই শৈবাল জলজ খাদ্যশৃঙ্খলের মূল ভিত্তি। অন্য একটি প্রতিবেদনে দেখা গেছে, মাইক্রোপ্লাস্টিক মাটির উর্বরতা কমিয়ে দেয়। ফলে, ফসল উৎপাদনে বাধা সৃষ্টি হয়। একটি গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, আর্কটিকের মতো অত্যন্ত ঠান্ডা জায়গাগুলোতে মাইক্রোপ্লাস্টিক বরফ গলে যাওয়ার প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করতে পারে। এটি সূর্যের আলো প্রতিফলিত করার ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। পাশাপাশি বিশ্ব উষ্ণায়নকে আরও বাড়িয়ে তোলে।
পরিবেশে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি আমরা কেমন করে কমাতে পারি?
গার্ডনার বলেন, প্রথম পদক্ষেপ হলো, ” বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পণ্যে অপ্রয়োজনীয় মাইক্রোপ্লাস্টিক যুক্ত না করা। তাছাড়া পণ্যগুলোকে আরেকবার ডিজাইন করাও গুরুত্বপূর্ণ। তার ফলে।সেগুলোতে প্লাস্টিকের পরিমাণ কম থাকে। কেবল তাহলেই কম প্লাস্টিক ফাইবার নির্গত হবে। একই সাথে ব্যবহারের মেয়াদ শেষে এগুলোর যেন পরিবেশে মেশার সুযোগ না থাকে, তা নিশ্চিত করতে হবে। বর্জ্য সংগ্রহ ব্যবস্থাপনা এবং পুনর্ব্যবহার (recycling) ব্যবস্থা জোরদার করলে প্লাস্টিক পণ্য পরিবেশে ছড়িয়ে পড়া রোধ করা সম্ভব। কেন না, এই পণ্যগুলোই পরে ভেঙে মাইক্রোপ্লাস্টিকে পরিণত হয়।
মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি কমানোর জন্য কি কাজ হচ্ছে?
হ্যাঁ, প্লাস্টিক দূষণ মোকাবিলায় বিশ্ব জুড়ে সম্মিলিত চেষ্টা বাড়ছে । উদাহরণ হিসাবে বলা যায় , গত বছরের বিশ্ব পরিবেশ দিবসের আয়োজন (প্রতি বছর ৫ জুন পালিত হয় এবং ইউএনইপি তার আয়োজন করে) প্লাস্টিক দূষণ এবং মাইক্রোপ্লাস্টিক সমস্যার সমাধানের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছিল। এই গুরুত্বের পাশাপাশি, বিশ্বের দেশগুলো প্লাস্টিক দূষণ বন্ধে একটি আন্তর্জাতিক আইনি বাধ্যবাধকতা যুক্ত চুক্তির বিষয়ে বিশেষভাবে আলাপ করছে। আগস্টে সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় এই আলোচনা আবার শুরু হয়েছিল।
( ইউনাইটেড নেশনস এনভায়রনমেন্ট প্রোগ্রামের দোসরা জুন, ২০২৫-এ প্রকাশিত একটি নিবন্ধ অবলম্বনে)


