১
জীবন – এক অনন্ত অনুভূতির নাম। যতক্ষণ শ্বাস থাকে আমরা আপ্রাণ আঁকড়ে ধরতে চাই জীবন নামের জ্যান্ত দশাকে। শেষ মুহূর্তেও কেউ ফিরে আসে – যুক্তি, ভাগ্য বা প্রার্থনার জোরে।
সম্প্রতি ঈদুল ফিতরের ছুটিতে আমার শহর বালি আর্কেডের সিনেপ্লেক্সে রেদওয়ান রনি’র তৃতীয় চলচ্চিত্র ‘দম’ দেখে বাসায় ফিরতে ফিরতে এসব কথা মনে হয়েছিল। বাসায় ফিরে আমি এই পরিচালকের ‘চোরাবালি’ ( ২০১২) এবং ‘আইসক্রিম’ (২০১৬) চলচ্চিত্র দুটিও অনলাইন থেকে সংগ্রহ করে দেখে ফেলি। তাঁর প্রথম চলচ্চিত্র ‘চোরাবালি’ সাঁইত্রিশতম বাংলাদেশ জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের পাঁচটি বিভাগে পুরস্কার জিতেছিল। পরিচালক নিজেই শ্রেষ্ঠ সংলাপের পুরস্কার জেতেন। ৪১ তম বাচসাস (বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সাংবাদিক সমিতি) পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠানে দুটো পুরস্কারের মধ্যে রনি শ্রেষ্ঠ গল্পের পুরস্কার পান।
চৌদ্দ বছর আগের চলচ্চিত্র ‘চোরাবালি ‘ নিয়ে দুই একটি কথা বলে রাখা দরকার। এখানে ভারতীয় অভিনেতা ইন্দ্রনীল সেনগুপ্ত ও আমাদের জয়া আহসান প্রধান দুটি চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন। প্রথম দিনের দৃশ্য ধারণের পরেই কিংবদন্তি হুমায়ুন ফরিদী প্রয়াত হন। খল চরিত্রে তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন শহীদুজ্জামান সেলিম। মৃত ও জীবিত দুজনেই জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। নাটক মঞ্চায়নে দীর্ঘদিন একসাথে ছিলেন। আমরা অবাক না হয়ে দেখি, সেলিম সম্পূর্ণ চলচ্চিত্রে ফরিদীর ম্যানারিজম অনুসরণ করে চলেছেন। অগ্রজকে টিবিউট দেয়ার এ হয়তো তাঁর নিজস্ব ধরন। নিজের শিকড় থেকে উচ্ছেদ হয়ে যাওয়া একজন বালকের পরবর্তীকালে ভাড়াটে খুনী হয়ে পড়ার গল্প বলতে চেয়েছেন রেদওয়ান রনি। রাজনীতির ভেতরকার বিবাদ অনেক সময় আত্মীয়তার সম্পর্ক মনে রাখে না- আত্মবাক্যটি প্রমাণিত হয় এই চলচ্চিত্রে। সাহসী সাংবাদিক চরিত্রে জয়া আহসান অনন্য। প্রথম দিকের অভিনয়ের ক্ষেত্রে তাঁর অন্যতম ভালো কাজ ‘চোরাবালি’। আমাদের অনেকেরই মনে পড়বে, সম্প্রতি অত্যন্ত সেলিব্রেটেড নির্মাতা তানিম নূর- এর প্রথম স্বাধীন চলচ্চিত্র ‘ফিরে এসো, বেহুলা’-তে জয়া চমৎকার অভিনয় করেছিলেন। আগ্রহীরা ইউ টিউবে দেখে নিতে পারেন।
‘আইসক্রিম’ (২০১৬) – রেদওয়ান রনির দ্বিতীয় চলচ্চিত্র। এখনকার জনপ্রিয় মুখ নাজিফা তুষি এবং শরীফুল রাজ এই পূর্ণদৈর্ঘ্যে প্রথম অভিনয় করেন। আজকাল ভাষায়, তাঁরা ব্রেক পান। কুমার উদয় নামে এক অভিনেতা ছিলেন তুষির বাগদত্তা চরিত্রে। তিনি পরবর্তীকালে প্রায় অস্ত হয়েছেন বলা যায়৷ একজন নারীর দ্বিধা এবং দ্বিধাজনিত প্রেম, সিদ্ধান্তহীনতার ফলে নারীকে চরিত্রহীন মনে হওয়া এই চলচ্চিত্রের বিষয়। দশ বছর আগের বিষয় ভাবনা হিসেবে বেশ সাহসী বলা যায়।

ছবি: ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত
২
ঈদুল ফিতরের দিন, একুশে মার্চ মুক্তি পায় রেদওয়ান রনি’র সাম্প্রতিক চলচ্চিত্র ‘দম’। নাম, পোস্টার, ফার্স্ট লুক এবং টিজারে আমরা জানতে পারি সত্য ঘটনা অবলম্বনে একটি চলচ্চিত্র। ২০০৮ সালে মোহাম্মদ নূর ইসলাম অপহৃত হন। সামাজিক, ভূ রাজনৈতিক এবং ধর্মীয় নানা বিষয়ের অকারণ, যুক্তিহীন অভিযোগ এনে তাঁকে অপহরণ করা হয়। পরবর্তীতে হত্যার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। তাঁর স্ত্রী আনোয়ারা পারভীন (রানি) মন্ত্রণালয়ের দরজায় দরজায় ঘুরতে থাকেন। ২০২৩ সালে রানি এবং তাঁর স্বামী ‘নূর’-এর গল্প প্রথম আলো ছাপে। অপহরণের দিন থেকে উদ্ধার পর্যন্ত চুরাশি দিনের এই ঘটনা অবলম্বনে চলচ্চিত্র নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেন রেদওয়ান রনি। রচনাটি তাঁকে চমৎকৃত করেছিল। এখন তিনি দেশের সবচেয়ে বড় ওটিটি প্লাটফর্ম চরকির প্রধান নির্বাহী। অসংখ্য বিজ্ঞাপন, নাটক আর দুটি চলচ্চিত্রে আরও অভিজ্ঞ হয়েছেন। তাঁর জীবনের এ যাবৎ কালের সবচেয়ে অ্যাম্বিশাস কাজের শুটিং লোকেশন হিসাবে তিনি বেছে নিলেন কাজাখস্তান।
আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রে দীক্ষিত তিনি৷ ফলে ‘দম’ গড় পর্দা মেইনস্ট্রিম বাংলা ছবি নয়। এই বাক্যটি লিখতে তাঁর আগের দুটি ছবির কথা আনলাম। আশ্রয়হারা বালকের ভাড়াটে খুনি হওয়া কিংবা নারীর দ্বিধাজনিত বহুগমনের কাল্পনিক গল্প ছেড়ে তিনি ফিরলেন সত্যের দিকে, বাস্তব ইতিহাসের দিকে। নারীর সত্য প্রেম এবং পুরুষের সহিষ্ণুতার দিকে।
মরুভূমির এতো সুন্দর দৃশ্যায়ন বাংলা ভাষার চলচ্চিত্রে তো বটেই, বিশ্ব চলচ্চিত্রেও বিরল। চকিতে কখনো কখনো তিউনিশিয়ান পরিচালক নাসির খেমিরের কথা মনে পড়ে যেতে পারে। ধূসর মরু এলাকার মানুষগুলোর স্থানীয় ইতিহাস, নিজস্ব রাজনীতি বড়ো মমতায় এঁকেছেন নির্মাতা৷ প্রার্থনা মানুষের প্রাণের আশ্রয় হতে পারে। এক টুকরো দৃশ্যে আলোর কারুকাজ, পায়রা এবং পরম করুণাময়ের আশ্রয় প্রার্থী মানুষের কম্পোজিশন আমাদের অনবদ্য চলচ্চিত্র অভিজ্ঞতা দেয়। কেন আমরা সিনেমাটি দেখবো? এখানে আফরান নিশো তাঁর জীবনের অন্যতম সেরা অভিনয় করেছেন। পাশাপাশি এই চলচ্চিত্রের আরেক সুন্দর পর্যাপ্ত নিরবতা। বিশ্ব চলচ্চিত্রের ভাষায়, নিরবতা একটি প্রায় অনিবার্য ব্যাপার। এই বিষয়টি আমাদের দেশের নির্মাতারা ভুলে গিয়েছেন। প্রচারযন্ত্রের অব্যাহত চিৎকারে এই সত্য আমরা ভুলতে বসেছি। মরুভূমির সুর এক অতি প্রাচীন ধারাবাহিকতা। প্রাচীন আর আধুনিকের সংকোচরহিত মেলামেশায় স্মরণীয় সুর সংযোজন সম্ভব হয়েছে ‘দম’ চলচ্চিত্রে। সকল প্রাণের প্রতি মমতা এই সিনেমার এক উল্লেখযোগ্য দিক। চঞ্চল চৌধুরীর কথা আলাদা করে বলতে হয়। প্রতিটি অভিনয়ে তিনি নিজেকে আশ্চর্য রকম বদলে ফেলেন।
রেদওয়ান রনি নির্মিত ‘দম’ বিশ্ব চলচ্চিত্রের যুদ্ধবিরোধী চলচ্চিত্রের তালিকাতেও অনায়াসে স্থান পাবে৷ দুই ঘন্টা আট মিনিটের এই চলচ্চিত্র ক্রমাগত বলে চলেছে, কেন আমরা যুদ্ধ চাই না। কারণ যুদ্ধ হলে মানুষেরা প্রিয় পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। স্বজন হারা হয়ে পড়ে৷ বাংলাদেশের সিনেপ্লেক্সে তো বটেই, এখন উত্তর আমেরিকার অনেকগুলো হলে ‘দম’ সগৌরবে চলছে।

ছবি: ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত
‘দম’ আমাদের মনে থাকবে।


