পদার্থ বিজ্ঞানে নোবেল ২০২৬: ‘ভূতুড়ে কণা’র সন্ধান: ফ্রান্সিস হালজেনের আবিষ্কারের গল্প

Share post:

Date:

মহাবিশ্বে কোটি কোটি আলোকবর্ষ দূরে এমন অসংখ্য ঘটনা ঘটে, যেগুলো প্রচলিত শক্তিশালী টেলিস্কোপ দিয়েও দেখা যায় না।

এই সব ঘটনা সম্পর্কে জানতে কিংবা গবেষণা করতে বিজ্ঞানীদের এক বিশেষ ধরনের কণার সাহায্য নিতে হয়। তার নাম হলো ‘নিউট্রিনো’।

তবে তার সন্ধান পাওয়া এতো সহজ ছিলো না। অবশেষে সেই কণাটি ধরা পড়লো পদার্থবিজ্ঞানী Francis Halzen এর হাতে।

এরই স্বীকৃতি হিসেবে ২০২৬ সালের পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার জয় করলেন তিনি।  

কে এই Francis Halzen?

Francis Halzen জন্মগ্রহণ করেন ১৯৪৪ সালে বেলজিয়ামের Tienen শহরে। ১৯৬৯ সালে তিনি KU Leuven থেকে পিএইচডি অর্জন করেন।

বেলজিয়ামে জন্ম নেওয়া এই মার্কিন নাগরিক University of Wisconsin–Madison-এ পদার্থ বিজ্ঞানের  অধ্যাপক। তিনি দীর্ঘদিন ধরে কণা পদার্থবিজ্ঞান ও নিউট্রিনো নিয়ে গবেষণা করে আসছেন ।

তিনি দক্ষিণ মেরুর বিপুল বরফকে কণা শনাক্তকারী বা particle detector হিসেবে ব্যবহার করে নিউট্রিনো শনাক্ত করার পরিকল্পনা করেন এবং সেটা বাস্তবে রূপ দেন।

এই পার্টিকেল ডিটেক্টরেই ধরা রহস্যময় নিউট্রিনো কণা।

নিউট্রিনো কী?

নিউট্রিনো হলো অতি ক্ষুদ্র সাব এ্যাটোমিক পার্টিকেল। এটি কোনো চার্জ বহন করে না। এমন কি সাধারণ পদার্থের সঙ্গে কোনো ধরনের বিক্রিয়া করে না।

এসব কারণে বিলিয়ন বিলিয়ন নিউট্রিনো পৃথিবী ভেদ করে চলে যায়। এমন কি আমাদের শরীরের মধ্য দিয়েও অতিক্রম করে। কিন্তু আমরা সেটা বুঝতে পারি না।

কারণ নিউট্রিনো এতাই ক্ষুদ্র যে অনু পরমানুর মধ্যে যে ফাঁকা স্থান থাকে তার মধ্যে দিয়ে চলে যেতে পারে। এছাড়াও অধিকাংশ নিউট্রিনো কোনো কিছুর সঙ্গে সংঘর্ষ করে না।

তবে অতি অল্পসংখ্যক নিউট্রিনো পরমাণুর নিউক্লিয়াসের সঙ্গে সংঘর্ষ করে। আর তখনই নিউট্রিনোর অস্থিত্ব বোঝা যায়। এই কারনে সেই বিরল সংঘর্ষে মুহূর্তটি পদার্থ বিজ্ঞানীদের কাছে এতো মূল্যবান।

নিউট্রিনোর অস্থিত্বকে বোঝা যায় কিন্তু তাকে ধরা যায় না, ছোয়া যায় না। এই কারণে এই কণাটিকে বিজ্ঞানীরা মজা করে বলতেন ‘ghost particle’ বা ভূতুড়ে কণা ।

কেন নিউট্রিনো এত গুরুত্বপূর্ণ?

অনন্ত অসীম মহাবিশ্বে ব্লাকহোলের রেডিয়েশন, নিউট্রন স্টার কিংবা নেবুলা বিস্ফোড়নের সময় নিউট্রিনো কণাগুলো তৈরি হয়। এভাবে তৈরি হওয়া কণাগুলো বহু গুণ বেশি শক্তি অর্জন করতে পারে।

এই নিউট্রিনোগুলো তার উৎপন্নের সময়ে ঠিক কি ধরনের ঘটনা ঘটেছিলো, সেটা কোথায় ঘটেচিলো, এবং সেখানে ঠিক কী ধরনের বিক্রিয়া ঘটেছিলো এসব গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বহন করে।

কাজেই নিউট্রিনোকে যদি সনাক্ত করা যায় তাহলে সেই সব মহাজাগতিক ঘটনার তথ্য আমরা জানতে পারবো। নিউট্রিনোর সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, মহাকাশের লক্ষ কোটি আলোকবর্ষ পথ অতিক্রম করার সময় এটা প্রায় কোনো বাধার মুখোমুখি হয় না।

ফলে তারা যে উৎস থেকে তৈরি হয়েছে, সেই উৎসের তথ্য অবিকৃতভাবে বহন করে এবং পৃথিবীতে নিয়ে আসতে পারে। একারনেই নিউট্রিনোকে মহাবিশ্বের দূরবর্তী ঘটনাগুলোর ‘বার্তাবাহক’ হিসেবে ব্যবহার করা সম্ভব।

দক্ষিণ মেরুর বরফে আইস কিউব

এখন প্রশ্ন হলো, নিউট্রিনো যদি এত সহজে পৃথিবী ভেদ করে চলে যায়, তাহলে বিজ্ঞানীরা তাকে ধরেন কীভাবে? এর উত্তর হলো আইসকিউব।

দক্ষিণ মেরুর বরফের প্রায় এক ঘনকিলোমিটার এলাকাজুড়ে IceCube Observatory স্থাপন করা হয়েছে। বরফের গভীরে বসানো হয়েছে বিপুলসংখ্যক অত্যন্ত আলোক সংবেদনশীল optical sensor ।

এই ব্যবস্থাটি এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যেনো বিরল নিউট্রিনো-সংঘর্ষ থেকে উৎপন্ন অতি ক্ষীণ আলোর ঝলকও শনাক্ত করা যায়।

দক্ষিণ মেরুতে রয়েছে বিপুল পরিমাণ স্বচ্ছ বরফ এবং অনেক ধরনের দূষণ থেকেও এটি তুলনামূলকভাবে মুক্ত। এসব কারনেও দক্ষিণ মেরু নিউট্রিনো ধরার উপযুক্ত স্থান।

আইস কিউবে কীভাবে নিউট্রিনো শনাক্ত হয়

প্রথমে মহাবিশ্বের কোনো অত্যন্ত শক্তিশালী উৎস থেকে একটি উচ্চ-শক্তির নিউট্রিনো পৃথিবীর দিকে ছুটে আসে।

সেগুলো দক্ষিণ মেরুর বরফের মধ্য দিয়ে যাওয়ার সময় খুব বিরল ক্ষেত্রে কোনো পরমাণুর নিউক্লিয়াসের সঙ্গে সংঘর্ষ করে।

এই সংঘর্ষের ফলে নতুন চার্জ পার্টিকেল তৈরি হতে পারে। সেগুলো চলার সময় অতি ক্ষীণ আলোর ঝলক তৈরি করে। আইস কিউবের আলোক সংবেদনশীল সেন্সরগুলো সেই আলোর সংকেত শনাক্ত করে।

সেন্সরগুলো কখন এবং কোথায় আলো শনাক্ত করেছে, এই তথ্য বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা নিউট্রিনোগুলো শক্তি ও গতিপথ সম্পর্কে ধারণা পান। এভাবেই একটি প্রায় ‘অদৃশ্য’ কণাকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়।

এক ঘনকিলোমিটার বরফ প্রয়োজন

নিউট্রিনো অত্যন্ত দুর্লভভাবে পদার্থের সঙ্গে সংঘর্ষ করে।  ফলে ছোট কোনো ডিটেক্টরের মাধ্যমে নিউট্রিনো সংঘর্ষ শনাক্ত করা প্রায় অসম্ভব।

এই সমস্যার সমাধান কতে আইস কিউবকে বিশাল আকার দেওয়া হয়েছে। এই জন্যই অবজারভেটরি প্রায় এক ঘনকিলোমিটার বরফ ব্যবহার করে।

দক্ষিণ মেরুতে ২০১১ সালে এই অবজারভটরিটি নির্মিত হওয়ার পর থেকে গবেষকরা উচ্চ-শক্তির নিউট্রিনো শনাক্ত করতে শুরু করেন। তারা এমন নিউট্রিনোর সন্ধান পান, যেগুলোর উৎস আমাদের গ্যালাক্সি থেকে অনেক দূরে।

এর ফলে মহাবিশ্ব পর্যবেক্ষণের এবং মহাজাগতিক ঘটনা সম্পর্কে জানতে ও গবেষণা করতে একটি সম্পূর্ণ নতুন পদ্ধতি চালু হয়।

নিউট্রিনো এস্ট্রোনমি

এতদিন মহাবিশ্ব সম্পর্কে জানার ক্ষেত্রে বিজ্ঞানীরা মূলত আলো বা ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক রেডিয়েশনের ওপর নির্ভর করতেন।

টেলিস্কোপ দিয়ে আমরা নক্ষত্র, গ্যালাক্সি, সুপারনোভা কিংবা অন্যান্য মহাজাগতিক বস্তুর আলো দেখতে পারি। কিন্তু সব মহাজাগতিক ঘটনা আলো দিয়ে সমানভাবে দেখা যায় না।

নিউট্রিনো এখানে একটি নতুন জানালা খুলে দিয়েছে। কোনো দূরবর্তী মহাজাগতিক ঘটনা থেকে বেরিয়ে আসা নিউট্রিনো যদি পৃথিবীতে পৌঁছায়, বিজ্ঞানীরা সেটিকে শনাক্ত করে তার উৎস সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করতে পারেন।

এ কারণেই আইস কিউবকে কেন্দ্র করে নিউট্রিনো এ্যাস্ট্রোনমি বা নিউট্রিনোভিত্তিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের একটি নতুন যুগের সূচনা হয়েছে।

নোবেল কমিটির ভাষায়, Halzen-এর বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি নতুন ধরনের জ্যোতির্বিজ্ঞানের পথ তৈরি করেছে।

মহাবিশ্বের কোন রহস্য উন্মোচিত হতে পারে?

উচ্চ-শক্তির নিউট্রিনো কোথা থেকে আসে, এটি দীর্ঘদিন ধরেই বিজ্ঞানীদের কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

মহাবিশ্বের এসব কণা কীভাবে তৈরি হয়, সেখানকার কোন প্রক্রিয়া সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং মহাজাগতিক পার্টিকেল এক্সিলেটর কীভাবে কাজ করে—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে আইস কিউব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

ভবিষ্যতে আরও বেশি নিউট্রিনো শনাক্ত করা গেলে বিজ্ঞানীরা দূরবর্তী মহাজাগতিক উৎসের প্রকৃতি সম্পর্কে নতুন তথ্য পেতে পারেন।

এই নোবেল কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?

Francis Halzen-এর নোবেল পুরস্কার শুধু একটি নতুন কণা শনাক্ত করার স্বীকৃতি নয়। এর গুরুত্ব আরও গভীরে।

তিনি মূলত এ্যাস্টোনমির একটি শাখার জন্ম দিয়েছেন। তার এই‌ আবিস্কারের মাধ্যমে আগামীতে মহাকাশের নতুন কোনো ঘটনা আবিস্কৃত হতে পারে।

পৃথিবীর সবচেয়ে দুর্গম অঞ্চলগুলোর একটি—দক্ষিণ মেরুর বরফ—যা পরিণত হয়েছে মহাবিশ্বের রহস্য অনুসন্ধানের বিশাল বৈজ্ঞানিক যন্ত্রে।

সামনে কী?

আইস কিউবের মাধ্যমে যে গবেষণা শুরু হয়েছে, তা এখানেই শেষ নয়। ভবিষ্যতে আরও উন্নত নিউট্রিনো ডিটেক্টর তৈরি হলে আরও বেশি সংখ্যক উচ্চ-শক্তির নিউট্রিনো শনাক্ত করা সম্ভব হতে পারে।

এর মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা মহাবিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী পার্টিকেল এক্সিলেটর, ব্ল্যাক হোলের আশপাশের পরিবেশ এবং অন্যান্য চরম মহাজাগতিক ঘটনার বিষয়ে আরও পরিষ্কার ধারণা পেতে পারেন।

সম্ভবত ভবিষ্যতে নিউট্রিনো এমন কিছু রহস্যের উত্তর দেবে, যেগুলোর অস্তিত্ব সম্পর্কেই আমরা এখনও জানি না।

উপসংহার

২০২৬ সালের পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার তাই শুধু Francis Halzen-এর ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প নয়; এটি মানুষের মহাবিশ্বকে বোঝার ক্ষমতার আরও এক ধাপ এগিয়ে যাওয়ার গল্প।

দক্ষিণ মেরুর এক ঘনকিলোমিটার বরফের গভীরে স্থাপিত IceCube দেখিয়ে দিয়েছে—মহাবিশ্বের সবচেয়ে দুর্লভ ও অদৃশ্য কণাগুলোকেও শনাক্ত করা সম্ভব। সেই কণাগুলো আবার আমাদের কাছে নিয়ে আসতে পারে কোটি কোটি আলোকবর্ষ দূরের মহাজাগতিক ঘটনাগুলোর খবর। আলো যেখানে পৌঁছাতে পারে না, সেখানে হয়তো নিউট্রিনো আমাদের জন্য মহাবিশ্বের এক দড়জা খুলে দেবে আর সেই বৈজ্ঞানিক যাত্রায় Francis Halzen-এর অবদান ইতিহাসে বিশেষভাবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সাবস্ক্রাইব

spot_img

সম্পাদকের নির্বাচিত

আরও পড়ুন
আরও পড়ুন

রসায়নে নোবেল ২০২৬: অণুর ‘আয়না-ছবি’ রহস্য সমাধানের গল্প

আমরা যদি আয়নার সামনে দাঁড়ায় তাহলে আমাদের ডানতটি দেখতে...

চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল ২০২৬ : আলো দিয়ে মস্তিষ্কের কোষ নিয়ন্ত্রণের যুগান্তকারী আবিষ্কার

বিজ্ঞানের সবচেয়ে জটিল রহস্যগুলোর একটি মানুষের মস্তিষ্ক। কীভাবে আমাদের...