সুস্থ বাংলাদেশের দিকে

Share post:

Date:

মাজার থেকে নৌকা বাইচ, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান থেকে মুক্ত মতের নাগরিক অধিকার হরণ- সমাজের সাম্যের ধারণার পক্ষে ক্ষতিকর ঘটনাগুলো এতো দ্রুত পর পর ঘটে যাচ্ছে যে আমরা স্থির হয়ে, ধাতস্থ হয়ে এক বিন্দু শ্বাস নেয়ার আগেই অন্য আরেকটি ঘটনার অভিঘাত আগের দিনের ঘটনার যৌথ স্মৃতি চাপা দিয়ে দিচ্ছে। মতের বিরুদ্ধতা ঘটলে, কোন একটি জনপদের স্মৃতির নিদর্শন, মাজার বা মন্দির গুঁড়িয়ে দেয়া অথবা কোন একটি আনন্দ আয়োজন পণ্ড করে দেয়া আমরা থামাতে পারছি না। আগামী বছর অনুষ্ঠিত হবে না এই শর্তে এই বছর নৌকা বাইচের আয়োজন হতে পারছে। আমাদের সকল উৎসব বিনোদন আয়োজন, শপিংমলে কেনাকাটা করার মতই ‘শর্ত প্রযুক্ত’ হয়ে পড়েছে। এক ধরনের অযৌক্তিক, ঘোষিত পীড়নের মধ্য দিয়ে আমাদের সাংস্কৃতিক যূথবদ্ধতা ব্যাহত হচ্ছে নিয়মিত বিরতিতে।

ছবি: pinterest.com

মানুষ কে? যার মনুষ্যত্ব আছে, তিনিই মানুষ। এখন প্রশ্ন আসে, মনুষ্যত্ব ব্যাপারটি কাকে বলে? আমাদের জ্ঞাত পৃথিবীর লিপিবদ্ধ ইতিহাসের ধারা বিবরণী থেকে আমরা উপলব্ধি করি, শব্দটি বহুমাত্রিক এবং বহু অর্থবাচক। একাধিক বৈশিষ্ট্যের স্মারক৷ তবে সাধারণভাবে ধরে নেয়া যায়, যে মানুষের মনুষ্যত্ব আছে কি না আমরা সে বিষয়ে মতামত তৈরি করবার চেষ্টা করছি তাঁকে প্রথমত একজন সামাজিক মানুষ হতে হবে। সামাজিক মানুষ সমাজে বসবাস করেন। এই মানুষটি যদি অপরাপর মানুষ এবং সর্বপ্রাণের বেঁচে থাকার অধিকার সমর্থন করেন, নিজের জীবনে চর্চা করেন তাহলে বলতে হবে মানুষ হয়ে ওঠার প্রাথমিক বৈশিষ্ট্যগুলি তাঁর মধ্যে আছে। আরেক দিক থেকে দেখতে গেলে আধুনিক মানুষের পক্ষে নিছক প্রাণ ধারণ যথেষ্ট নয়। তাঁর জীবনের একটি অত্যন্ত জরুরী বিষয় হচ্ছে নিজের ও বিরুদ্ধ মতের ব্যক্তির মতের স্বাধীনতা। একজন মানুষ যখন সমাজে বাস করেন সেই সমাজ যখন একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের অংশ তখন নানা ধরনের অসংগতি এবং অন্যায় নিয়ে তিনি লিখে বা কোন প্রকাশ্য সমাজ সমাবেশে বক্তব্য রাখার মাধ্যমে তার মত প্রকাশ করবার অধিকার রাখেন। অসঙ্গতি এবং অন্যায় বলতে আমি বোঝাতে চাইছি এমন এক বা একাধিক ঘটনা যা কিনা মানুষের জীবন যাপনকে কঠিন করে তুলছে। এখন সমস্যা বা জটিলতা তৈরি হয় তখনই যখন কোন গোষ্ঠী সেইসব মতামত দমন করতে চান এবং সেই চাওয়াকে চরিতার্থ করতে গিয়ে জনপদের মধ্যে দুর্যোগ তৈরি করেন, ধ্বংসযজ্ঞ চালান। বাংলাদেশ রাষ্ট্র কাঠামোটি মাঝে মাঝে এইসব ঘটনায় উৎকৃষ্ট ব্যবস্থা নিতে পারে না নানা কারণেই। কারণগুলো কমবেশি সকলেই জানেন এই কারণে বিস্তৃত ব্যাখ্যা থেকে আপাতত বিরত থাকা গেল। কিন্তু আসল কথা হচ্ছে, বাংলাদেশের ইতিহাসের দিকে যদি আমরা তাকাই পারস্পরিক সহিংসতার মাত্রা এতখানি বেড়ে যাওয়া আমাদের আইন কাঠামো বা সামাজিক ভারসাম্যের দুর্বলতাই চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। বিশেষ বিশেষ গোষ্ঠী নিজের বা নিজের গোষ্ঠীর মতামতের আধিপত্য বিস্তারের প্রত্যাশায় এই ধরনের ঘটনাগুলো ঘটিয়ে চলেছে। মনুষ্যত্ব নিয়ে আমরা কথা বলছিলাম একটু আগেই। সংক্ষিপ্ত আলাপে পরিষ্কার, মানুষের এই বৈশিষ্ট্য না থাকলেই অপর মানুষের প্রতি সে দলবদ্ধভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ে। মবের উৎপত্তিস্থলও একই ধরনের মানসিকতা।

নৌকা বাইচ
ছবি: উইকিপিডিয়া বৃত্তান্ত

ধর্ম আর সংস্কৃতি যে কোনও দেশের মানুষের সম্মিলিত ইতিহাসে অনেকটা রঙিন নকশি কাঁথার মত। এক বিনা অন্যে অসহায়। মানুষ যা ধারণ করে সেটিই তার ধর্ম। সকল ধর্মেই অন্যের পাশে দাঁড়াবার কথা বলেছেন সে সময়ের ধর্ম প্রচারকেরা। কেউই অন্যের সম্পদ বা প্রাণের ক্ষতির বিনিময়ে কোন মত চাপিয়ে দেয়ার কথা বলেননি। কথা ছিল, মানুষের ধর্ম সামাজিক মানুষের মূল বৈশিষ্ট্যগুলো ধারণ করবে, তাকে উদ্ধার করবে যে কোন ধরনের মানবতাবিরোধী হীন সিদ্ধান্ত ও তৎপরতা থেকে। সংস্কৃতির ইতিহাসেও দেশে দেশে কালে কালে ধর্মের অনিবার্য প্রভাব রয়েছে। প্রকৃতির সুর থেকে আদি মানুষ একদিন নিজের কণ্ঠে আর নির্মিত বাদ্যযন্ত্রে সুর তুলে নিয়েছে। সে সুর প্রার্থনা সঙ্গীত হিসেবে নিবেদিত হয়েছে পরমের উদ্দেশ্যে। মানুষ মূলত প্রকৃতির সন্তান।

এমপ্যাথি অর্থাৎ অপরের প্রতি মায়া মনুষ্যত্বের একটি মৌলিক সূচক। আমরা যদি বিরুদ্ধ মতের মানুষটির মতটিকেও সমান মায়া নিয়ে, সহৃদয় যুক্তিশীল বিচারের মাধ্যমে গ্রহণ করতে না পারি তাহলে বাংলাদেশের মানুষের যাপনের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে না। আইনের সঠিক প্রয়োগ জরুরি। তার চেয়েও জরুরি সম্মিলিতভাবে আমাদের মানুষ হয়ে ওঠা, এমন মানুষ যিনি ধর্ম আর সংস্কৃতির মধ্যে মানুষের মঙ্গলের চিহ্ন ক্রমাগত সনাক্ত করে চলেন। এই মানুষেরা যতই পরস্পরের হাত ধরে দৃঢ় হয়ে দাঁড়াবেন, মত পার্থক্যের জন্য কাউকে অপরায়নের শিকার হতে হবে না ততই আমরা নাগরিকবান্ধব সুস্থ বাংলাদেশের সম্ভাবনার দিকে অগ্রসর হবো।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সাবস্ক্রাইব

spot_img

সম্পাদকের নির্বাচিত

আরও পড়ুন
আরও পড়ুন

নরসিংদীর পথে পথে

যাবেন? যাবো- ঠিক ১৫ মিনিটে আমি আর রুকাইয়া মিলে প্ল্যান...

দ্য ফ্রেডরিক ফ্রিটজ ক্যাপ, বাংলার আলোকচিত্রের এক কালজয়ী নাম

১৮৮০-এর দশকের শুরুর দিকের কথা। ক্যালকাটা (কলকাতা) থেকে প্রকাশিত...

তারেক মাসুদ : তেরো আগস্ট স্মরণে

তারেক মাসুদ জন্মেছিলেন ১৯৫৭ সালের ছয় ডিসেম্বর। ফরিদপুর জেলার...