বাংলা নববর্ষের বিবর্তনের রূপরেখা- খাজনা আদায়ের প্রথা থেকে প্রাণের উৎসব

Date:

সময়টা ষোড়শ শতক। সুবাহ বাংলা তখন মুঘলদের অন্যতম ধনী এক প্রদেশ। কিন্তু চারদিকে সোনার ফসল ফললেও কৃষকের মনে কোনো স্বস্তি ছিল না। এর পেছনে কারণ ছিল মুঘল আমলের খাজনা আদায়ের নিয়ম। তখন খাজনা দিতে হতো চাঁদের হিসাব ধরে-হিজরি ক্যালেন্ডার অনুযায়ী। চাঁদের বছর আর সূর্যের বছরের মাঝে ফারাক প্রায় ১১ দিনের। ফলে কয়েক বছর যেতে না যেতেই দেখা যেত, মাঠে ফসল পাকার আগেই জমিদারের পেয়াদা এসে হাজির খাজনার দাবিতে! নিরুপায় হয়ে চড়া সুদে মহাজনের জালে আটকা পড়ত বাংলার কৃষক।

দূরদর্শী সম্রাট আকবর বুঝলেন, কৃষকের পেটে লাথি মেরে সাম্রাজ্যের ভিত টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। তিনি ডাকলেন তার রাজদরবারের সেরা পণ্ডিত ও জ্যোতির্বিদ আমির ফতেহউল্লাহ সিরাজিকে। হুকুম দিলেন, এমন এক পঞ্জিকা বানাতে হবে যেখানে খাজনা আদায়ের সাথে ফসলের মৌসুমের মিল থাকে। সিরাজি অত্যন্ত নিখুঁতভাবে হিজরি সনের সাথে প্রাচীন ভারতবর্ষের সৌরভিত্তিক পঞ্জিকার (শকাব্দ) এক অসাধারণ গাণিতিক মেলবন্ধন ঘটালেন। জন্ম নিল নতুন এক বর্ষপঞ্জি। ১৫৮৪ সালে এটি চালু হলেও, আকবরের সিংহাসনে বসার বছর অর্থাৎ ১৫৫৬ সাল (৯৬৩ হিজরি) থেকেই এর গণনা শুরু ধরা হয়। শুরুতে এর নাম ছিল ‘তারিখ-ই-এলাহি বা ‘ফসলি সন’।

অবশ্য এই বর্ষপঞ্জির শেকড় খুঁজতে গিয়ে ঐতিহাসিকরা একটু ভিন্ন কথাও বলেন। কেউ কেউ মনে করেন, সপ্তম শতকের রাজা শশাঙ্কের আমলেই নাকি বঙ্গাব্দের শুরু। বাঁকুড়ার এক প্রাচীন মন্দিরে ‘বঙ্গাব্দ’ শব্দের উল্লেখ প্রমাণ করে যে মুঘলদের আগেও এ অঞ্চলে নিজস্ব পঞ্জিকা প্রচলিত ছিল। তবে এটি যে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে আকবরের হাত ধরেই, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু আকবরের পঞ্জিকায় মাসের নামগুলো ছিল ফারসি, যা সাধারণ কৃষকের মনে রাখা কঠিন ছিল। তাই পরে সম্রাট শাহজাহানের নির্দেশে নক্ষত্রের নামানুসারে ফিরে আসে আমাদের চেনা বৈশাখ, জ্যৈষ্ঠের মতো নামগুলো। আধুনিক যুগে এসে ১৯৬৬ সালে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ এবং সর্বশেষ ২০১৯ সালে এই ক্যালেন্ডারে আরও কিছু বিজ্ঞানসম্মত সংস্কার আনা হয়।

শুরুর দিকে নববর্ষ বা পহেলা বৈশাখ মানেই ছিল কেবল অর্থনীতি আর টাকা-পয়সার হিসাব। বছরের প্রথম দিনে জমিদাররা ‘পুণ্যাহ’ আয়োজনে কৃষকদের মিষ্টিমুখ করিয়ে খাজনা নিতেন। আর ব্যবসায়ীরা পুরোনো হিসাব চুকিয়ে খুলতেন লাল মলাটের নতুন খাতা-আমাদের সুপরিচিত ‘হালখাতা । কিন্তু কালক্রমে দিনটি শুধু আর অর্থনীতির গণ্ডিতে আটকে থাকেনি। ১৯৬৭ সালে রমনার বটমূলে ছায়ানটের গানের মধ্য দিয়ে এটি হয়ে ওঠে বাঙালির ধর্মনিরপেক্ষ ও প্রাণের উৎসব।

পহেলা বৈশাখের সবচেয়ে রঙিন অনুষঙ্গ হলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলার শোভাযাত্রা। ১৯৮৬ সালে যশোরে চারুপীঠের হাত ধরে শুরু হলেও, ১৯৮৯ সালে ঢাকায় এসে এটি বিশাল আকার ধারণ করে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই উৎসবের নামটির সাথে জড়িয়ে আছে দেশের রাজনৈতিক উত্থান-পতনের এক অদ্ভুত ইতিহাস। গত কয়েক দশকে এর নাম বদলেছে চারবার:

আনন্দ শোভাযাত্রা (১৯৮৯-১৯৯৫): স্বৈরাচারী এরশাদ সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের অংশ হিসেবে ১৯৮৯ সালে চারুকলার শিক্ষার্থীরা বিশাল সব মুখোশ আর মোটিফ নিয়ে যে মিছিল বের করেন, তার নাম ছিল ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’।

মঙ্গল শোভাযাত্রা (১৯৯৬-২০২৪): দেশে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা চলাকালীন ১৯৯৬ সালে এর নাম বদলে রাখা হয় ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’। দেখতে দেখতে এটি এতই জনপ্রিয় হয় যে, ২০১৬ সালে ইউনেস্কো একে মানবজাতির ‘অধরা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য’ বা Intangible Cultural Heritage হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।

বর্ষবরণ আনন্দ শোভাযাত্রা (২০২৫): গল্প এখানেই শেষ নয়। ২০২৫ সালে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এক বড়সড় ধাক্কা আসে। হেফাজতে ইসলামসহ বেশ কয়েকটি গোষ্ঠী দাবি তোলে, ‘মঙ্গল’ শব্দটি হিন্দু ধর্মীয় চেতনার অংশ এবং এর ভাস্কর্যগুলো ইসলামি মূল্যবোধের পরিপন্থী। প্রবল চাপের মুখে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ নাম বদলে রাখে ‘বর্ষবরণ আনন্দ শোভাযাত্রা’। এ নিয়ে সুশীল সমাজ ক্ষোভে ফেটে পড়ে, এমনকি চারুকলার ভাস্কর্যে আগুন দেওয়ার মতো মর্মান্তিক ঘটনাও ঘটে।

বৈশাখী শোভাযাত্রা (২০২৬-বর্তমান): বিতর্ক সামাল দিতে চলতি বছরের এপ্রিলে নতুন সরকারের সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী এক আপসমূলক ঘোষণা দেন। তিনি জানান, বিভাজন এড়াতে এখন থেকে এর নাম হবে ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’। আনন্দ বা মঙ্গল-কোনোটাই আর থাকছে না।

তবে সরকারের এই আপসের পরও পানি ঘোলা হওয়া থামেনি। ইতিমধ্যেই সুপ্রিম কোর্টের এক আইনজীবী শোভাযাত্রাটিকে ‘কৃত্রিম’ ও ধর্মানুভূতিতে আঘাত হানার দায়ে পুরোপুরি নিষিদ্ধ করার জন্য হাইকোর্টে রিট দায়ের করেছেন।

কোথায় মুঘল সম্রাট আকবরের সেই কৃষিবান্ধব পঞ্জিকা, আর কোথায় আজকের নববর্ষ উদযাপন নিয়ে এত বিতর্ক! খাজনা আদায়ের একটি সাধারণ প্রশাসনিক নিয়ম কীভাবে একটি জাতির সর্বজনীন উৎসবে পরিণত হলো, আর সেই উৎসব কীভাবে আজ আদর্শিক টানাপড়েন ও রাজনীতির ঘুঁটি হয়ে দাঁড়াল-বাংলা নববর্ষের ইতিহাস যেন তারই এক জীবন্ত ও আক্ষেপের দলিল।

ধর্মীয় অনুভূতির নামে ধর্মান্ধতার আগুন যুগে যুগে কতটা ভয়ংকর হতে পারে, তার এক মর্মস্পর্শী ও রোমহর্ষক আখ্যান লুকিয়ে আছে নন্দিত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের ‘বাদশাহ নামদার’ উপন্যাসে। পরিশেষে সে গল্প বলে শেষ করতে চাই-

সময়টা তখন মুঘল সম্রাট হুমায়ূনের। আফগান শাসক শের খাঁর বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রায় এক রাতে তিনি এক দুর্গ-শহর দখল করে নেন। শহরবাসীর হালচাল বুঝতে রাতের আঁধারে ছদ্মবেশে বের হন সম্রাট। পথে এক শ্মশানের কাছে গিয়ে থমকে দাঁড়ান তিনি। দেখেন, এক সদ্যবিধবা কিশোরীকে জোর করে সতীদাহের আগুনে পুড়িয়ে মারার আয়োজন চলছে।

সম্রাট তাকে বাঁচাতে ছুটে যেতে চাইলে সঙ্গীরা পথ আগলে দাঁড়ান। তাদের যুক্তি ছিল-হিন্দু অধ্যুষিত এই এলাকায় তাদের ধর্মীয় রীতিতে হস্তক্ষেপ করলে প্রজারা বিদ্রোহ করতে পারে। কিন্তু সম্রাট শুনলেন না। ছদ্মবেশ ছুড়ে ফেলে নিজের আসল পরিচয়ে দাঁড়ালেন সেই চিতার সামনে। মেয়েটিকে জিজ্ঞেস করলেন, সে বাঁচতে চায় কি না। মেয়েটি কাঁপা গলায় জানাল-সে বাঁচতে চায়।

সম্রাট তখন নিজের হাত থেকে এক গ্লাস পানি তাকে দিয়ে বললেন, ‘বিসমিল্লাহ’ বলে পান করতে। মেয়েটি তা-ই করল। এরপর উপস্থিত জনতার দিকে ঘুরে সম্রাট বজ্রকণ্ঠে ঘোষণা দিলেন, “এই মেয়ে বিসমিল্লাহ বলে পানি পান করে মুসলমান হয়েছে। আমার রাজ্যে কোনো মুসলমান মেয়েকে সতীদাহ করার অধিকার কারও নেই।”

অম্বা নামের সেই ভাগ্যবতী মেয়েটিকে সম্রাট নিজের কন্যা রাজকুমারী আকিকা সুলতানার কাছে পাঠিয়ে দিলেন। খুব অল্প দিনেই অম্বা আর আকিকা হয়ে উঠল একে অপরের প্রাণের সখা, যেন এক আত্মার দুই রূপ।

গল্পটা এখানেই এক সুন্দর সমাপ্তি টানতে পারত। কিন্তু নিয়তির হিসাব ছিল ভিন্ন।

পরবর্তীতে চৌসার যুদ্ধে শের খাঁর কাছে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হন হুমায়ূন। যুদ্ধের সেই চরম ডামাডোল আর বিশৃঙ্খলার সুযোগ নেয় হুমায়ূনেরই রাজদরবারের হিন্দু ব্রাহ্মণ আচার্য হরিশংকর। দুই কিশোরীকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে সে তাদের নিয়ে বেরিয়ে পড়ে। কিন্তু মাঝপথে বেরিয়ে আসে তার আসল রূপ। স্রেফ নিজের ‘ধর্ম রক্ষার্থে’ হরিশংকর অম্বাকে তুলে দেয় সেই ধর্মান্ধ গোষ্ঠীর হাতেই, যাদের চিতা থেকে তাকে ছিনিয়ে এনেছিলেন সম্রাট।

অম্বাকে যখন জোর করে জ্বলন্ত চিতায় নিক্ষেপ করা হলো, তার বাঁচার আর্তনাদে ভারী হয়ে ওঠে আকাশ-বাতাস। চোখের সামনে প্রিয় বান্ধবীর এই ভয়ংকর পরিণতি আর চিৎকার সহ্য করতে পারেনি রাজকুমারী আকিকা। অম্বাকে বাঁচাতে সে-ও ঝাঁপিয়ে পড়ে সেই লেলিহান আগুনে। চোখের পলকে পুড়ে ছাই হয়ে যায় নিষ্পাপ দুটি প্রাণ। ধর্ম রক্ষার নামে রচিত সেই করুণ মৃত্যু উপত্যকা যেন আজও আমাদের সমাজের এক জ্বলন্ত প্রতিচ্ছবি। এই আখ্যান আমাদের বারবার মনে করিয়ে দেয়-ধর্মান্ধতার আগুনে যখন বিভাজন তৈরি হয়, তখন সবার আগে পুড়ে মরে আমাদের বোধ ও আত্মপরিচয়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Share post:

সাবস্ক্রাইব

সম্পাদকের নির্বাচিত

আরও পড়ুন
আরও পড়ুন

পয়লা বৈশাখ  বাংলা নববর্ষ উদযাপনের ইতিহাস

বাংলা নববর্ষ আমাদের সংস্কৃতিতে কিভাবে এলো তা জানতে হলে...

শুভ নববর্ষ

দি প্যারিস রিভিউতে প্রকাশিত “হ্যাপি নিউ ইয়ার” থেকে লেখা: লরি...

প্রাণের ঠাকুর শ্রী শ্রী অনুকূল চন্দ্র

১.শক্তিকে জাগাতে গেলে ভক্তিকে জাগাতে হবে।নিজেকে বাঁচাতে গেলে ইষ্ট...

সৃষ্টির নেশায়… জীবনের চলমান চিত্র

সৃষ্টির নেশায় আমরা এই প্রত্যয় নিয়ে প্রায় ১৫ বছর...