নাচ ব্যক্তির নিজস্ব অনুভূতি প্রকাশের মাধ্যমে একটি গল্পকে বিশ্বের সামনে ফুটিয়ে তোলার একটি উপায়। ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতিতে নৃত্যের উৎসবমুখর, আধ্যাত্মিক এবং ঐতিহ্যগত মূল্যবোধ আলাদা আলাদা তাৎপর্য বহন করে। মানব সভ্যতার প্রায় শুরু থেকে, বিশ্বের বিভিন্ন সংস্কৃতির একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে আছে নৃত্য। সময়ের সাথে রূপান্তরিত, মিশ্রিত এবং বিকশিত হয়ে আজ আমরা যেসব জনপ্রিয় নৃত্য ধারা চিনি, তাতে পরিণত হয়েছে।
আজ, ঊনত্রিশ এপ্রিল, আন্তর্জাতিক নৃত্য দিবসে, আসুন আমরা বিশ্ব পর্যটনে বের হই, বিখ্যাত নৃত্যশৈলীগুলো সম্পর্কে জানি। মানুষের সহজাত এই শিল্পরূপকে উদযাপন করি। ব্যালে থেকে বেলি ড্যান্স, সালসা থেকে ভারতনাট্যম — এখানে বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় দশ নৃত্যের তালিকা রইল।
১. সাম্বা (ব্রাজিল)

বিশ্বভ্রমণের এই দীর্ঘ যাত্রার প্রথম গন্তব্য সাম্বার দেশ ব্রাজিল। ‘সাম্বা’ শব্দটি ‘সেম্বা’ থেকে এসেছে, যার অর্থ ‘নাচের আমন্ত্রণ’। পঞ্চাশের দশকে বিকশিত এই ব্রাজিলীয় নৃত্যশৈলীটি ব্রাজিলে অভিবাসী আফ্রিকানদের সংস্কৃতি থেকে এসেছে। অঞ্চলভেদে নাচটির ধরন ও শৈলী আলাদা। নৃত্যশিল্পীরা সাধারণত রঙিন পোশাক ও বড়ো আকৃতির শিরস্ত্রাণ পরেন। কার্নিভাল এবং বিভিন্ন উৎসবে তাদের অবশ্যই মাথায় পরতে হয় এই শিরস্ত্রাণ। সবচেয়ে বিখ্যাত উৎসব হলো রিও ডি জেনিরো বা সুপরিচিত ব্রাজিলিয়ান ‘রিও কার্নিভাল’। এখন সাম্বার সংক্রামক ছন্দ ব্রাজিলের জাতীয় নৃত্য হিসেবে গণ্য করা হয় এবং এটি যে কোনও জাতীয় উৎসবের আবশ্যিক অঙ্গ হয়ে পড়েছে।
২. সালসা (কিউবা)

এখন উত্তর দিকে এগিয়ে যাওয়া যাক। পূর্ব কিউবায় জন্ম নেওয়া জনপ্রিয় ‘সালসা’ সম্পর্কে জানবার চেষ্টা করি । ধারণা করা হয়, স্প্যানিশ এবং আফ্রিকান বংশোদ্ভূতদের সংমিশ্রণে এই নাচের সৃষ্টি। যদিও পঞ্চাশের দশকে একটি সামাজিক নৃত্য হিসেবে এই শৈলীটি নিউ ইয়র্ক শহরে স্থানান্তরিত হয়েছিল, তবে নাচটির শিকড় ক্যারিবীয় অঞ্চলেই গভীরভাবে প্রোথিত। এটি ‘সন কিউবানো’ থেকে ‘আফ্রো কিউবান রুম্বা’ পর্যন্ত অনেকগুলো শৈলীর সংমিশ্রণ। ‘ক্যাসিনো’ (যা কিউবান সালসা নামে পরিচিত) পঞ্চাশের দশকে বিকশিত হয়েছিল। এই শৈলীই আজকের সালসাকে অনুপ্রাণিত করেছে।
৩. হিপ-হপ (যুক্তরাষ্ট্র)

হিপ-হপ বলতে মূলত কতগুলো ‘স্ট্রিট ড্যান্স’ বা রাস্তায় ঘটতে থাকা অতি সাধারণ নাচকে বোঝায়, যা হিপ-হপ সংস্কৃতি এবং সংগীতের সাথে তাল মিলিয়ে বিকশিত হয়েছে। এটি রাস্তায় পরিবেশিত একটি নতুন শৈলী হিসেবে বিকশিত হয়, যা সত্তর দশকের শুরুতে নিউ ইয়র্ক এবং ক্যালিফোর্নিয়ায় ‘ফাঙ্ক’ শৈলী থেকে বিবর্তিত। যদিও প্রথমদিকে পূর্ব উপকূলের ‘ব্রেকিং’ নাচকে প্রধানত হিপ-হপ বলা হতো, তবে শীঘ্রই পশ্চিম উপকূলের ‘লকিং এবং পপিং’-এর মতো অন্যান্য শৈলীগুলোও হিপ-হপের অন্তর্ভুক্ত হয়। অন্য সকল প্রতিযোগিতামূলক নাচের তুলনায় হিপ-হপে তাৎক্ষণিক উদ্ভাবন তথা ইমপ্রোভাইজেশন এবং একে অপরকে নাচের লড়াইয়ে চ্যালেঞ্জ জানানোর বিষয়টি বেশি থাকে।
৪. স্টেপ ড্যান্স (আয়ারল্যান্ড)

আমরা পূর্ব দিকে এগিয়ে আয়ারল্যান্ডে পা রাখছি। এই দেশটি ‘আইরিশ স্টেপ ড্যান্স’-এর জন্য সুপরিচিত। নব্বইয়ের দশকের একটি থিয়েটার শো ‘রিভারড্যান্স’। এই মঞ্চ প্রযোজনায় আইরিশ স্টেপ ড্যান্স প্রদর্শিত হয়েছিল। বিশ্বজুড়ে এই নাচকে জনপ্রিয় করে তোলার নেপথ্যে রয়ে গেছে এই ঐতিহাসিক মঞ্চ প্রযোজনা । একক বা দলগতভাবে পরিবেশিত এই নাচের বিবর্তন ঘটেছিল কেল্টিকদের মাধ্যমে। এতে শরীরের উপরের অংশ শক্ত রেখে পায়ের পাতার জটিল ও ছন্দময় কাজ করা হয়, যাতে দর্শকরা দ্রুত ও সূক্ষ্ম পদচালনার দিকে মনোনিবেশ করতে পারে। আয়ারল্যান্ডের স্থানীয় পাব বা ডাবলিনের রাস্তায় এই স্টেপ ড্যান্স একটি সাধারণ দৃশ্য। ঐতিহ্যবাহী আইরিশ সঙ্গীতের সাথে চমৎকার নৃত্যের প্রদর্শনী প্রত্যক্ষ করতে পারেন পর্যটকেরা। মহৎ আইরিশ লেখকদের লেখায় স্টেপ ড্যান্সের উল্লেখ পাওয়া যায়।
৫. ফ্লামেনকো (স্পেন)

স্পেন পৃথিবীকে উপহার দিয়েছে মনোমুগ্ধকর ‘ফ্লামেনকো’। কেউ কেউ বিশ্বাস করেন যে, ফ্লামেনকো আন্দালুসিয়ান জিপসিদের কাছ থেকে এসেছে যারা উত্তর ভারত থেকে দক্ষিণ স্পেনে স্থানান্তরিত হয়েছিল। এই নাচের বৈশিষ্ট্য হলো ভূমিতে সজোরে পা ফেলে শব্দ করা, গান গাওয়া, আঙুল দিয়ে তুড়ি বাজানো, হাততালি এবং গিটার বাজানো। নারী নৃত্যশিল্পীদের ক্ষেত্রে লাল রঙের ঢেউখেলানো পোশাক এই নাচের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য। বর্তমানে সারা বিশ্বেই ফ্লামেনকো পরিবেশিত হয়। আশ্চর্যজনকভাবে, স্প্যানিশ এই নৃত্যশৈলীটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানে অত্যন্ত জনপ্রিয়।
৬. ওয়াল্টজ (অস্ট্রিয়া)

ওয়াল্টজের উৎপত্তি জার্মান শব্দ ‘Walzer’ থেকে, যার অর্থ ‘ঘোরা বা আবর্তিত হওয়া’। অস্ট্রিয়ান এবং জার্মান নাচ থেকে উদ্ভূত এই ‘ওয়াল্টজ’ প্রাচীনতম বলরুম নাচগুলোর মধ্যে একটি। এটি উনিশ শতকের একটি ধীর গতির এবং শালীন দ্বৈত নৃত্য। বর্তমানে দ্রুত গতির ভিয়েনিজ ওয়াল্টজ এবং ধীর গতির আমেরিকান ও ইন্টারন্যাশনাল স্টাইল ওয়াল্টজ দুটোই অত্যন্ত জনপ্রিয়। একটি সুন্দর গাউন পরে এই ইউরোপীয় মায়াবী জগতে নিজেকে ঘুরিয়ে নেওয়ার সুযোগের অপেক্ষায় থাকেন অনেক পর্যটক। ইউরোপিয়ান ধ্রুপদী সাহিত্যে ওয়াল্টজের একাধিক উল্লেখ পাওয়া যায়।
৭. বেলি ড্যান্স (মধ্যপ্রাচ্য)

মধ্যপ্রাচ্যের বেলি ড্যান্স বিশ্বজুড়ে দর্শকদের মন জয় করে নিয়েছে। প্রথম বেলি ড্যান্সারেরা ‘ঘাওয়াজি’ নামে পরিচিত একদল ভ্রাম্যমাণ নৃত্যশিল্পী ছিল। অষ্টাদশ শতাব্দীতে মিশরে এই নারীদের জিপসি বা যাযাবর হিসেবে গণ্য করা হতো। আঠারোশো ত্রিশের দিকে তাদের কায়রো থেকে নির্বাসিত করা হয়েছিল।তারা দক্ষিণ মিশর, মধ্যপ্রাচ্য এবং ইউরোপে নিজেদের নাচ দেখানো শুরু করে। ১৯০০ সালের দিকে বেলি ড্যান্সের ‘রাকস শারকি’ (raqs sharqi) নামের ধারাটি বিকশিত হতে থাকে। রাকস শারকি ধারার মজা হলো এটি ফোক নৃত্য, ব্যালে, লাতিন নাচ আর মার্কিনি মার্চিং ব্যান্ডের উপাদানগুলোকেও গ্রহণ করে। অনেক পরে, ষাটের দশকে এটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে।
৮. ভরতনাট্যম (ভারত)

চলুন এশিয়ার দিকে যাই। দক্ষিণ ভারতীয় নৃত্য ‘ভরতনাট্যম’ সম্পর্কে জানি—যে নাচের ধরন মুগ্ধ করে বিশ্বের শিল্পমনস্কদের। ভারতীয় শাস্ত্রীয় নৃত্যশৈলীর জননী হিসেবে বিবেচিত ভরতনাট্যম। সম্ভবত ভারতের প্রাচীনতম শাস্ত্রীয় নৃত্যের ঐতিহ্য। এই নাচের সূচনা হয়েছিল তামিলনাড়ুর হিন্দু মন্দিরগুলোতে এবং পরবর্তীতে তা দক্ষিণ ভারতে ছড়িয়ে পড়ে। শুরুতে এটি কেবল মন্দিরের দেবদাসীদের জন্য সংরক্ষিত ছিল। বাইরের কেউ উপভোগ করতে পারত না। ত্রিশের দশক থেকে এটি জনসমক্ষে প্রদর্শিত হতে শুরু করে। নৃত্যশিল্পী এখানে হাঁটু ভাঁজ করে নিচু হয়ে বসার ভঙ্গিতে থাকেন এবং চমৎকার পদচালনা, মোহে আচ্ছন্ন অভিব্যক্তি ও আঙ্গুলের চিত্তাকর্ষক মুদ্রার মাধ্যমে ভারতীয় পুরাণের আধ্যাত্মিক সারমর্ম এবং গল্পগুলো ফুটিয়ে তোলেন।এই নাচে শিল্পীর নিজস্ব শরীর ভাষা, লাবণ্য বিশেষ নিবেদনের ভঙ্গিতে প্রকৃতির সাথে একাকার হয়ে যায়৷ বাংলা দেশের জনপ্রিয় স্পাই থ্রিলার সিরিজ মাসুদ রানার শুরুর দিকের একই নামের একটি বইতে বিশেষ নৃত্যশৈলীটির স্মরণীয় বিবরণ আছে।
৯. ড্রাগন ড্যান্স (চীন)

চীনা সংস্কৃতিতে ড্রাগন হলো শক্তি, সমৃদ্ধি, সৌভাগ্যের প্রতীক। মানুষ অশুভ আত্মাকে ভয় দেখাতে এবং সমৃদ্ধি আনতে ব্যবহার করে এই প্রতীক। শিল্পীরা বিশাল আকৃতির কাপড়ের ড্রাগনের নিচে রাখা খুঁটিগুলো ধরে রাখে এবং ঢেউয়ের মতো করে দোলায়। ফলে, মনে হয় ড্রাগনটি নৃত্যরত। ড্রাগনের এই নড়াচড়া জ্ঞান, প্রজ্ঞা এবং সত্য অনুসন্ধানের প্রতীক। নাচের এই ড্রাগনগুলো দৈর্ঘ্যে ভিন্ন ভিন্ন হতে পারে এবং একটি প্রাচীন বিশ্বাস আছে যে ড্রাগন যত লম্বা হবে, সেটি তত বেশি ভাগ্য বয়ে আনবে। করতাল, গং এবং ঐতিহ্যবাহী চীনা ঢাকের আনন্দমুখর তালের সাথে এই নাচটি পরিবেশিত হয়। বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের ‘চায়নাটাউন’ গুলোতে চীনা নববর্ষ উদযাপনে এই নাচ দেখতে পাওয়া যায়।
১০. ব্যালে (রাশিয়া)

ব্যালে সম্পর্কে না জানলে নাচের ভিন্ন ভিন্ন ধরন সম্পর্কে কোনো জানা পূর্ণ হতে পারে না। আজ ২৯শে এপ্রিল ‘আন্তর্জাতিক নৃত্য দিবস’ হিসেবে উদযাপিত হচ্ছে। এই দিন আধুনিক ব্যালের স্রষ্টা জঁ জর্জ নভেরের জন্মবার্ষিকী। রাশিয়ান ব্যালে ইতালীয় রেনেসাঁর সময় বিকশিত হয়েছিল। পরবর্তীতে ফ্রান্স ও রাশিয়ায় এটি এক ধরনের ‘কনসার্ট ড্যান্স’ হিসেবে বিবর্তিত হয়। শাস্ত্রীয় সংগীতের সাথে পরিবেশিত এই নাচের বেশ কিছু উপশাখা রয়েছে, যার মধ্যে ধ্রুপদী, রোমান্টিক আর কনটেম্পোরারি অন্যতম। আঠারোশো সালের দিকে এই শৈলীটি পুরুষ-কেন্দ্রিক রূপ থেকে পরিবর্তিত হয়ে ব্যালেরিনা বা নারী নৃত্যশিল্পী প্রধান হয়ে ওঠে। বিশেষ জুতো আর পোশাক এই নাচের অনিবার্য উপাদান। রাশিয়ান সংস্কৃতির অন্যতম প্রধান প্রতীক হিসেবে ব্যালে অধিকাংশ রাশিয়ানদের হৃদয়ে একটি বিশেষ স্থান দখল করে আছে। বিশ্বের শ্রেষ্ঠ নৃত্য স্কুলগুলোতে শেখানো হয় ব্যালে নাচ৷
নাচ শরীর সঞ্চালনের মাধ্যমে প্রদর্শিত ভাষায় প্রকৃতির সাথে যোগাযোগের একটি মাধ্যম। এই ভাষায় আক্ষরিক শব্দের বদলে থাকে নিরব নিবেদন। সূফীরা যেমন হাত তুলে ঘুরতে ঘুরতে নাচেন, নিজেকে ভুলে পরম করুণাময়ের সাথে সরাসরি সংযোগ স্থাপনের জন্য সর্বস্ব সমর্পণ করেন। ট্যাংগো নাচের উল্লেখ পাই মার্লোন ব্র্যান্ডোর অভিনয় কেরিয়ারের শেষ দিকের এক চলচ্চিত্র ‘লাস্ট ট্যাংগো ইন প্যারিস’-এ। মন ও শরীরের সুস্থতা রক্ষায় নাচ জরুরি শিল্প চর্চা।
ছবি: ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত

