একটি আলোকচিত্রের পেছনের গল্প

Date:

মূল : কায়জার কাবির
রূপান্তর : সুভাষ কুমার বর্মন

ওয়াও!!  চমৎকার ! একটি ফটোগ্রাফ বা একটি আলোকচিত্র অথবা কী দারুণ একটি মুহূর্ত… আমরা সচরাচর এভাবেই প্রশংসা করি। যখন একজন দর্শক ছবির মধ্যে স্বর্গের একটি মুহূর্ত দেখতে পান, তখন আলোকচিত্রী হয়তো মনে করেন সেই যাত্রার কথা যা মোটেও সহজ ছিল না। সেই চমৎকার আলোকচিত্রটি কীভাবে ফুটে উঠল? আমরা কি সেই চমৎকার আলোকচিত্রের পেছনের গল্প এবং পরিশ্রম নিয়ে খুব একটা ভাবি? 

​অন্ধকারের পথে দীর্ঘ পদযাত্রা…

​আলোকচিত্র গ্রহণের প্রক্রিয়াটি খুব কম ক্ষেত্রেই সূর্যোদয়ের সাথে সাথে শুরু হয়। অনেক পেশাদারদের জন্য এটি কয়েক ঘণ্টা বা এমনকি কয়েক দিন আগেই শুরু হয়। কল্পনা করুন, প্রথম আলো ফোটার আগেই একটি নির্দিষ্ট গাছ, নদী বা পাহাড়ের কিনারায় পৌঁছানোর জন্য গভীর অরণ্যের মধ্য দিয়ে ট্রেকিং করছেন, যেখানে কখনও কম্পাস সাথে থাকে আবার কখনও থাকে না। ক্যামেরার পেছনের এই কর্মদক্ষতাই বা “পারফরম্যান্সই” চূড়ান্ত আলোকচিত্রে প্রাণ সঞ্চার করে।

 (আকাঙ্ক্ষিত আলোকচিত্র)  

​১. টার্মিনাল ফ্রস্ট (Terminal Frost)

​স্থান ও সময়: এভারেস্ট বেসক্যাম্পে আনুমানিক রাত ৪:০০টায় এই আলোকচিত্রটি ধারণ করা হয়েছে।  পরিস্থিতি: তাপমাত্রা ছিল মাইনাস -৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস।  ক্যামেরা সেটিংস: এক্সপোজার টাইম ১½ সেকেন্ড, অ্যাপারচার এফ৯, ফোকাল লেন্থ ১৫ মিমি ,আইসো ২০০ ।

​গল্প: প্রায় ৮ থেকে ৯টি শট নেওয়ার পর আলোকচিত্রী তার কাঙ্ক্ষিত ছবিটি পান।

 অনিয়ন্ত্রিত পরিস্থিতির সাথে লড়াই!!

​প্রকৃতির প্রভাব: একজন প্রকৃতি ও সংরক্ষণ আলোকচিত্রীর সবচেয়ে বড় শত্রু এবং বন্ধু হলো আবহাওয়া। 

​অপেক্ষার খেলা: সঠিক বায়ুমণ্ডলীয় অবস্থা পাওয়ার জন্য আলোকচিত্রীরা একই জায়গায় কয়েকবার, এমনকি ৮ থেকে ১০ বারও ফিরে যান। 

​সরঞ্জামের ক্ষয়ক্ষতি: একটি “শ্বাসরুদ্ধকর” মুহূর্তের সন্ধানে অনেক সময় উত্তাল ঢেউয়ে লেন্স অকেজো হয়ে যায় অথবা বৃষ্টি, কাদা, আর্দ্রতা বা মরুভূমির অতিরিক্ত গরমে যন্ত্রপাতি  নষ্ট হয়ে যায়। এমনকি তীব্র ঠান্ডায় ব্যাটারিও সাড়া দেওয়া বন্ধ করে দেয়। 

​২. বৃষ্টি দৌড় (Run in rain) :

​স্থান ও সময়: বর্ষাকালের এক ভারি বৃষ্টির দুপুরে ঢাকার একটি বস্তিতে (Slum) বেলা ২:০০টার দিকে এই ছবিটি তোলা হয়েছে।

​ক্যামেরা সেটিংস: এক্সপোজার টাইম ১/৪০০  সেকেন্ড, অ্যাপারচার এফ ২.৮  ফোকাল লেন্থ ৩৫ মিমি , আইসো ২০০ ।

গল্প: এটি একটি বিশেষ মুহূর্তের প্রতীক্ষা (single shot anticipation) ছিল এবং সেই একটি শটেই কাঙ্খিত ছবিটি ধারণ করতে হয়েছিল। 

​”অকস্মাৎ ভাগ্য” (Stupid Luck)!!

​পরিকল্পনা থাকা সত্ত্বেও, কিছু বিখ্যাত ছবি জন্ম নেয় ভাগ্যের হঠাৎ পরিবর্তনে। যেমন: 

​ভুল মোড়: ইয়োসেমিতে (Yosemite) একজন আলোকচিত্রী পেশাদারদের ভিড় দেখে দূরে একটি নিরিবিলি ব্রিজে গিয়ে দাঁড়ান এবং বৃষ্টির পর সূর্যের আলো বের হওয়ার মুহূর্তেই এক অনন্য জনমানবহীন দৃশ্য খুঁজে পান।

​হঠাৎ আবির্ভাব: এমন কিছু মুহূর্ত যখন আলোকচিত্রী প্রস্তত থাকেন না, কিন্তু হঠাৎ কোনো দৃশ্য তার মানসিক অবস্থা বদলে দেয়। 

​৩. দ্য স্কাইফল (The Skyfall)

​স্থান ও সময়: বর্ষাকালে ভারি বৃষ্টির পর রাঙামাটির পার্বত্য চট্টগ্রামে সকাল ৭:৩০ মিনিটে ধারণকৃত। 

​ক্যামেরা সেটিংস: এক্সপোজার টাইম ১/৪০০ সেকেন্ড অ্যাপারচার এফ ৬.৫ ফোকাল লেন্থ ২০০মিমি আইসো ২০০।

​গল্প: নৌকাটি অত্যন্ত দ্রুত গতিতে চলছিল, সেই স্বল্প সময়ের মধ্যেই সঠিক অ্যাঙ্গেল থেকে আকাঙ্ক্ষিত শটটি নিতে হয়েছিল। 

​গল্পের গুরুত্ব কেন?

​একটি “নিখুঁত” ছবি মানেই শুধু শার্প ফোকাস বা টেকনিক্যাল পারফেকশন নয়। এটি একটি “চূড়ান্ত মুহূর্ত” (decisive moment), যেখানে আলো, প্রকৃতি এবং আলোকচিত্রীর অভ্যন্তরীণ জগৎ একবিন্দুতে মিলিত হয়। দশ বছর পর যখন আপনি একটি ছবি দেখবেন, তখন আপনি এর ক্যামেরা সেটিংস মনে রাখবেন না; বরং আপনি মনে রাখবেন সেই আনন্দের অনুভূতি , সময়ের কান্না বা সেই নির্জনতায় শুকনো পাতার মড়মড় শব্দ। একটি আলোকচিত্র ছবির চেয়েও বেশি কিছু; এটি একটি সংগ্রামের দলিল যা দর্শক হয়তো সরাসরি দেখে না, কিন্তু অনুভব করতে পারে। 

​৪. দ্য টাইম ট্রাভেলার্স (The Time Travelers)

​স্থান ও সময়: চট্টগ্রামের কাপ্তাইয়ে কুয়াশাচ্ছন্ন আবহাওয়ায় ভোর ৫:৩০ মিনিটে সূর্যোদয়ের ঠিক পরেই আলোকচিত্রটি ধারণকৃত। 

​ক্যামেরা সেটিংস: এক্সপোজার টাইম ১/৪০০ সেকেন্ড অ্যাপারচার  এফ ৮ ফোকাল লেন্থ ৫০০মিমি আইসো ৪০০।

​গল্প: আলোকচিত্রী সেই জায়গায় ২০ বারের বেশি গেলেও আর কখনো এমন আবহাওয়া পাননি। নৌকার তিন বালক আসলে তিন ভাই ছিল, যারা সকালের প্রার্থনার জন্য যাচ্ছিল। এই সিরিজটি ২০১৯ সালে UNESCO-র ক্লাইমেট চেঞ্জ চ্যালেঞ্জে পুরস্কার পায়। 

​৫. দ্য লোনার (The Loner)

​স্থান: আলোকচিত্রটি রাঙামাটির জুরাছড়ি জেলার গভীর অভ্যন্তরে ধারণকৃত। 

​দৃশ্যপট: ছবির একপাশে বৃষ্টি হচ্ছিল এবং অন্যপাশে মেঘ ঘনীভূত হচ্ছিল, মাঝখানের অংশটি ছিল শুকনো, যা একটি রংধনুর অপেক্ষায় ছিল। 

​ক্যামেরা সেটিংস: এক্সপোজার টাইম ১/৬০ সেকেন্ড, অ্যাপারচার  এফ ৩.৫ ফোকাল লেন্থ ১০মিমি আইসো ২০০ ।

​স্বীকৃতি: এটি একটি ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক (National Geographic) পুরস্কার বিজয়ী আলোকচিত্র।

৬.এটি মিরসরাই, চট্টগ্রামের নাপিত্তাছড়া ট্রেইলে অবস্থিত একটি চমৎকার জলপ্রপাতের ছবি।যার নাম বান্দরকুম জলপ্রপাত। বর্তমানে এই জায়গাটা একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় অপেশাদার ট্রেকিং গন্তব্য। তবে এই স্থানের বর্তমান অবস্থা অত্যন্ত হৃদয়বিদারক; সেখানকার জীববৈচিত্র্যের অস্তিত্ব আজ বিপন্ন ।

আমি এই ছবিটি ২০১১ সালে তুলেছিলাম। সেই সময়ে কেবল হাতেগোনা কয়েকজন প্রকৃতিপ্রেমী এবং সংরক্ষণ কর্মকর্তারা এই জায়গাটি সম্পর্কে জানতেন… এখন এটি একটি জনাকীর্ণ পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।

​ক্যামেরা সেটিংস ও বিবরণ:

​এক্সপোজার টাইম: ১/২ সেকেন্ড , ​অ্যাপারচার এফ ২.৪ ফোকাল লেংথ ১৬মিমি, আইসো ২০০ ।

​ফিল্টার: সার্কুলার পোলারাইজার (Circular Polarizer) সহ ।​শিরোনাম: প্রকৃতির ঐক্য (Nature’s Harmony)।

​বিশেষ দ্রষ্টব্য: এটি একক কোনো শটে নেওয়া কোন আলোকচিত্র নয়। আমি বিভিন্ন এক্সপোজার টাইমে বেশ কয়েকটি শট নিয়ে এটি তৈরি করেছি। এটি ২০১১ সালে ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক-এ প্রকাশিত মাসের সেরা আলোকচিত্র হিসেবে স্বীকৃতিপ্রাপ্ত একটি ছবি।

​আলোকচিত্র আসলে কী?

​আলোকচিত্র হলো জীবনের যাত্রাপথে আপনার প্রতি পদক্ষেপের রেকর্ড বা স্মৃতি ধরে রাখার এক বিস্ময়কর মাধ্যম। এটি আপনার জীবনের প্রতিটি মুহূর্তের সাক্ষী—তা আনন্দ বা বেদনার যাই হোক না কেন। প্রতিটি আলোকচিত্রী একটি মাত্র ফ্রেমের জন্য বছরের পর বছর বা এমনকি কয়েক দশক ধরে অপেক্ষা করেন। 

[ছবির কপিরাইট@: কাইজার কবির ]

1 COMMENT

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Share post:

সাবস্ক্রাইব

সম্পাদকের নির্বাচিত

আরও পড়ুন
আরও পড়ুন

পয়লা বৈশাখ  বাংলা নববর্ষ উদযাপনের ইতিহাস

বাংলা নববর্ষ আমাদের সংস্কৃতিতে কিভাবে এলো তা জানতে হলে...

শুভ নববর্ষ

দি প্যারিস রিভিউতে প্রকাশিত “হ্যাপি নিউ ইয়ার” থেকে লেখা: লরি...

প্রাণের ঠাকুর শ্রী শ্রী অনুকূল চন্দ্র

১.শক্তিকে জাগাতে গেলে ভক্তিকে জাগাতে হবে।নিজেকে বাঁচাতে গেলে ইষ্ট...

সৃষ্টির নেশায়… জীবনের চলমান চিত্র

সৃষ্টির নেশায় আমরা এই প্রত্যয় নিয়ে প্রায় ১৫ বছর...