তিন টুকরো চিন্তা : রবীন্দ্র প্রাসঙ্গিক

Date:

মার্ক্সিস্ট স্কুলের সামান্য ছাত্র হিসেবে জানি, একটা গল্প কে কেন কেমন করে কার স্বার্থে কোন সময়খণ্ডে বসে লিখছেন, বলছেন তার উপরেই পুরো ব্যাপারটি নির্ভর করে। এবং, রাজনীতি অণুবীক্ষণ যন্ত্রে পরীক্ষা করে দেখবার জিনিস নয়। চোখ কান মন খোলা থাকলে, চারপাশে কি ঘটছে সেটা বোঝা যায় ৷ ফেসবুক কোন সেলেব কোন ন্যারেটিভ দিচ্ছেন তার চেয়ে বড়ো কথা, মধ্যবিত্ত শিক্ষিত মানুষের ক্ষুদ্র বৃত্তের বাইরে বৃহৎ যে হতদরিদ্র জনগোষ্ঠী আছেন, তাঁদের এই আলাপে কিছু এসে যায় কি না। 

ইতিহাসে প্রত্যেক মানুষের কিছু সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব থাকে ৷ যারা তা গণমানুষের স্বার্থে পালন করেন আমরা তাঁদের বড় মানুষ বলি। সবাই মিছিলে যাবে না। সবাই লেখার টেবিলে থাকবে না। সবাই চলচ্চিত্র নির্মাণ করবে না। কিন্তু, প্রত্যেক মানুষের হৃদয়ের মধ্যে যদি পাশের মানুষটার জন্য সেলফলেস মায়া না থাকে তাহলে কোনও কিছুই, তা সংগঠন বলি শিল্প বলি রাজনীতি বলি, কিছুই দাঁড়ায় না। 

রবীন্দ্রনাথ যে ধরনে বলেছিলেন- আমরা সবাই রাজা আমাদের এই রাজার রাজত্বে- সে ধরনটি সর্বমানবের কথা বলে। হৃদয়ের প্রসার আর মুক্তির কথা বলে। আলোর কথা বলে। আমাদের কেউ শাসন করছে না, আমাদের হৃদয়বৃত্তির উন্নত বোধ আমাদের চালিত করবে, এই বোধের কথা বলে। 

যেহেতু প্রত্যেকটি ব্যক্তিমানুষের গল্প আলাদা, আমাদের তার পাশে মায়া নিয়েই দাঁড়াতে হবে। আমাদের সংস্কৃতি আর রাজনীতিকে কেবল শব্দে নয় বাস্তবেও মানুষের আশ্রয় হয়ে উঠতে হয়। নইলে তত্ত্বের ঘেরাটোপ, একই বৃত্ত থেকে আমাদের মুক্তি ঘটবে না।  আমাদের ভক্তি যদি ভয় নয় ভালোবাসা থেকে না আসে, একটি পিঁপড়ের মনও আমরা জয় করতে পারবো না। সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে এটুকুই আমার যৎসামান্য উপলব্ধি ৷

রবীন্দ্রনাথের মায়ের কথা মনে পড়ে। একের পর এক সন্তান প্রসবের ধকল। আর, ঠাকুর পরিবারে এলেই অতি সাধারণ মেয়েদের নাম বদল। আমরা রবীন্দ্রনাথকে পেয়েছি কিন্তু রবীন্দ্রনাথের মা? কিংবা তাঁর অকালপ্রয়াত অনুজ বুধেন্দ্রনাথ? দেবেন ঠাকুরের পঞ্চদশ সন্তান? 

কোনোদিনই রবীন্দ্রনাথ আমার গুরুদেব ছিলেন না। একের পর এক যন্ত্রণাকে তিনি যেমন করে জয় করেছেন তাতে মনে হয়েছে টুকরো হয়ে গেলেও সেসব কুড়িয়ে নিয়ে আবার সোজা হয়ে দাঁড়ানোর  সাহসসম্পন্ন একজন সৎ মানুষ হিসেবে ৷ 

বাঙালির শোকর বা কৃতজ্ঞতা বোধ নাই ৷ রবীন্দ্রনাথের ছিলো বলেই মনে হয় ৷ সারা জীবনের বেশিরভাগ লিপিবদ্ধ ভুলের জন্য তিনি দু:খ প্রকাশ করতে করতে এগিয়েছেন। এখন সেসব ভুল কি, তা  বের করা অনুসন্ধিৎসুর দায়িত্ব। ধরা যাক কুইজ। নিজের সাথে নিজের প্রশ্ন প্রশ্ন খেলা, একান্তে। একটা বলি, মধুসূদনের প্রতি প্রায় কৈশোরের লেখার জন্য পরিণত জীবনে অনুতাপ করেছেন ৷ এমন আরো আছে ৷  আমরা তো ভুল করতেই পারি না ৷ তাই দু:খ প্রকাশও করি না। কৃতজ্ঞতা বোধও নেই। কোনো কোনো ক্ষেত্রে কিছু টাকা ধরিয়ে দিয়ে ভাবি, দায়িত্ব পালন সারা হলো।  রবীন্দ্রজন্মদিনে মনে হয়, এই তিনটে জিনিস যদি অন্তত নিতে পারতাম। কৃতজ্ঞতাবোধ, অনুশোচনা আর ব্যথাজয়ী হওয়া, শোকে ভেঙ্গে না পড়া, নিজের ভঙ্গুরতাকে উপশমের চেষ্টা নিয়ত জারি রাখা।

রবীন্দ্রনাথকে ঈশ্বর, অপরিমার্জনীয় বিশুদ্ধ পুজ্য বস্তু ভাবা রবীন্দ্রমৌলবাদ৷ চিন্তাবিশ্বে যে কোন ধরণের বদ্ধতাই খারাপ৷ যেমন, কোনও কোনও বাম দলে মার্ক্সমৌলবাদ, শরৎমৌলবাদ ৷ আবার, আবদুল মান্নান সৈয়দদের মতো মানুষদের ছিলো জীবনানন্দমৌলবাদ। 

অভিজিৎ রায়ের শেষ বইতে যে লেখাটা ছিলো ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর বয়ানে- রবীন্দ্রনাথ ‘অন্যমনস্ক’ভাবে তাঁর বুকে হাত দিয়েছিলেন, এই তথ্য কিন্তু শঙ্খ ঘোষ, কেতকী কুশারী ডাইসন দুজনেই এড়িয়ে গেছেন। কিংবা, বিশ্বভারতী নিজেই অনেকদিন লেডি রাণু মুখোপাধ্যায়ের সাথে রবীন্দ্রনাথের সাথে পত্রবিনিময়ের একটা বড়ো অংশ দীর্ঘকাল আড়াল করে রেখেছিলো। কেন এই দেবতা ভাবা? রবীন্দ্রনাথ নিজে ত গানে দেখিয়ে গিয়েছেন, তাঁর চিন্তনে নিবেদন আর বাসনা একাকাকার, প্রেম আর পুজা ওতপ্রোত,  তাঁর আকাঙ্ক্ষা আত্মনিবেদনের না আত্মবিসর্জনের সেই কথাটি অনেক সময় উপলব্ধিতে আনা মুশকিল। এই ‘বিশুদ্ধ খাঁটি গাওয়া ঘি’-প্রতিম রবীন্দ্রপুজারীদের কারণেই তো দেবব্রত বিশ্বাস জীবনের একটা বড় সময় গান রেকর্ড করতে পারেননি ৷ 

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পরিবারের বিত্ত  পূর্ববঙ্গের ( তখনকার অবিভক্ত বঙ্গ)  অজস্র সাধারণ নিরন্ন মানুষের দীর্ঘশ্বাসে গড়া। দ্বারকানাথ ঠাকুরের স্টিমার ব্যবসার পাশাপাশি, একাধিক ব্রোথেলালয় ছিলো। গ্রামের অনেক অভুক্ত পরিবারের কন্যা সেখানে এসে উঠতো। এসব সবাই জানে। রবীন্দ্রনাথ নিজের ষোড়শ বর্ষীয়া ভাইয়ের মেয়েকে মিষ্টি মিষ্টি প্রেমের চিঠি লিখছেন অথচ নিজের মেয়েদের, স্রেফ নিজের গাঁটের পয়সা খরচ করতে না চেয়ে, বাপের এস্টেটের খরচে বিয়ে দিয়ে দিলেন। এই ভুল সিদ্ধান্তে মেয়েরা সারাজীবন ভুগলো। কেউ কেউ অকালপ্রয়াত হলো। আর মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছেলে আলখাল্লার ভেতর সব ঢেকেঢুকে বসে রইলেন ৷ এবং, কোথাও কোনো ব্যাখ্যা দিলেন না ৷ ঠাকুর বাড়িতে গেলে, তাঁদের সাথে সম্পর্কিত হলে, সাধারণ দরিদ্র পরিবারের মেয়েদের নাম বদলে দেয়া হতো। এই অধিকার তাঁদের কে দিয়েছে? ক্ষমতা প্রদর্শন বাদে একে আর কী বলা যায়! 

কিন্তু, এতোকিছুর পরেও রবীন্দ্রনাথ একজন মানুষ। একজন মহৎ লেখক ৷ একজন স্বামী। একজন পিতা। একজন প্রেমিক। একজন পরসম্পদ ভোগ করে বেড়ে ওঠা নশ্বর মানুষ। তিনি অবধ্য নন। তিনি ভগবান বা জীবনদেবতা নন ৷ তিনি একজন মানুষ, আবারও বলি, আমাদের চেয়ে মাপে অনেকটাই বড় মানুষ। 

কিন্তু, যে মূর্তির গায়ে টোকা দিলেই ধুলো বালি ঝরে পড়ে এবং সেবকবৃন্দ ছুটে আসে, সেই মূর্তিপুজা বেশিদিন টিকবে না। নিত্যপ্রিয় ঘোষ থেকে অভিজিৎ রায় – রবীন্দ্রমন্দির ভেঙ্গেচুরে সত্যকারের জনমানুষের রবীন্দ্রনাথ আবিষ্কারক। যার গান এসি রুমে ঢুলু ঢুলু চোখে না শুনলেও, যাকে রাস্তাঘাটে পথচলতি মানুষদের ভীড়ে লোকাল বাসের হ্যান্ডেল ধরে ঝুলতে দেখা যায় এবং ‘কি ভাই রোবে কি খবর’ বললে দাঁত বের করে এক গাল হাসে, ঐ ধুলোমলিন রবীন্দ্রনাথ আমার যার জোব্বা ছিন্ন ফতুয়া মলিন চুলে দাড়িতে ধুলো কিন্তু হাসি উজ্জ্বল, যতদিন দুনিয়া থাকবে ততদিন। সে রবীন্দ্রনাথ আর যা-ই হোক, কে প্রেমিক কে অপ্রেমিক তা চেনেন, প্রশ্নহীন বুকে টেনে নেন।  রুচির তর্ক জুড়ে দেন না ৷

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Share post:

সাবস্ক্রাইব

spot_img

সম্পাদকের নির্বাচিত

আরও পড়ুন
আরও পড়ুন

ঔপন্যাসিক ইয়াং যুয়ান জি’র সাক্ষাৎকার

অনুবাদ : স্বাতীলেখা মিত্র 'তাইওয়ান ট্রাভেলগ' লেখার পেছনের অনুপ্রেরণা সম্পর্কে...

পাপের প্রেত

লর্ড ডানসেনি ভাষান্তর: সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায় আমার ভাইয়ের সঙ্গে সেই বিশাল নির্জন...

রবীন্দ্রমন : নানা বয়সে

রবীন্দ্রনাথ একের মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন জন। ভিন্ন জনের সমাবেশ...

স্থাপত্য আর রবীন্দ্রগান : দুই

স্থাপত্য  আর রবীন্দ্রগানের আন্ত:সম্পর্ক বিষয়ে নিউজ থ্রিসিক্সটিতে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন...