রবীন্দ্রমন : নানা বয়সে

Date:

রবীন্দ্রনাথ একের মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন জন। ভিন্ন জনের সমাবেশ দীর্ঘ জীবনের ব্যাপ্তিতে এক অনন্য জনে পরিণত হন। অপমান, অসম্মান এমন এক অভিজ্ঞতার নির্যাস যা সারাজীবন হাড় মাংসের উপর দিয়ে বয়ে যায় যে কোনো সংবেদনশীল মানুষের। যিনি সহ্য করতে পারেন তিনি থেকে যান, সৃজনের শস্যে আরেকটু পূর্ণ হয়ে ওঠেন  এই ধোঁয়াধুলির সভ্যতায়। নইলে তিনি অকালপ্রয়াত মেধাবী হন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কথা-ই ধরা যাক না কেন। মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ব্রহ্মসাধনার ফাঁকে ফাঁকে চৌদ্দটি সন্তানের পিতা হয়েছিলেন। চতুর্দশতমটি জগৎ আলো করে আছে ৷ উজ্জ্বল আমাদের মননের জগৎ। ভাগ্যিস, তেরোটির পর আরেকজন সন্তানের প্রয়োজন অনুভব করেছিলেন ব্রহ্মসাধক পিতা !  

ভেবে দেখুন একবার, রবীন্দ্রনাথের প্রেম ও পুজা পর্বের গান আলাদা করা মুশকিল। সুফী কবিদের মতো ঈশ্বর আর  প্রেমিকা এখানে একাকার। গানগুলো একমনে শুনলে আর  শেষ দশ বছরের চিত্রকলার উৎসার দেখলে কোনো অনুভবী শ্রোতা, দর্শকের মনে হতে পারে একজন  মানুষ প্রাণপণে চেষ্টা করছেন অপমানের যন্ত্রণাকে সৃজনশীলতায় রূপান্তর করতে, আরেকটু শমিত হয়ে উঠছেন কেউ। লেখাজীবনের শুরু থেকেই কম অপমানের শিকার হতে হয়নি তাঁকে। নতুন ধরণের গদ্য লিখতে গিয়ে সেসব  পড়ে বোঝার সহিষ্ণুতা না রেখেই তখনকার সমালোচকরা তাঁকে নিয়মিত বিরতিতে অপমান করে গেছেন। 

বাংলা ১৩৮৪ সালের পঁচিশে বৈশাখের পুণ্য লগ্নে প্রকাশিত হলো একটি বই। ‘জ্যোতির্ময় রবি ও কালো মেঘের দল’। সুজিতকুমার সেনগুপ্ত প্রণীত ৷ সেখানে শুরুতেই দেখি – ‘ সময়টা ১৯২১ খ্রীস্টাব্দ। বহির্বিশ্বে রবীন্দ্রনাথের সংবর্ধনার খবর বিভিন্ন বিদেশী সংবাদ সংস্থা ও সংবাদপত্র মারফৎ ভারতে এসে পৌঁছাতে শুরু করেছে। আশ্চর্য চমকে ভরা দিনগুলি ৷ এমন তো আগে আর কখনো হয়নি – বলতে কি – কোনো ভারতীয় সাহিত্যিক খোদ ইয়োরোপে যে এতো আন্তরিকতা ও শ্রদ্ধার সঙ্গে সংবর্ধিত হতে পারেন, তা এদেশের মানুষের কল্পনার বাইরে ছিলো।’ তারপরেই একটি মন্তব্য উদ্ধৃত করেন তিনি –  ‘ ইংলণ্ডে রবীন্দ্রনাথের সম্বর্দ্ধনার খবরে দেখিতেছি- ইংলণ্ডের অনেক সুধী স্বীকার করিতেছেন যে, রবীন্দ্রনাথ বর্তমান যুগের সর্বশ্রেষ্ঠ কবি ও ভাবুক – এ বিষয়ে তাঁহার তুল্য দ্বিতীয় ব্যক্তি জগতের কোন দেশে নাই। আনন্দের কথা নয়? তবে কি না দেশের লোক এতদিন তাহা বুঝিতে পারে নাই। ইদানীং রবীন্দ্রনাথ ভক্তবৃন্দের বগলেই বিরাজ করেন, দর্শন দুর্ঘট। বিস্ময়ের এই যে, দেখিতে দেখিতে জগতের সাহিত্য এত  দরিদ্র – প্রায় দেউলিয়া হইয়া গিয়াছে যে রবীন্দ্রনাথ সর্বশ্রেষ্ঠ বলিয়া পরিগণিত হইলেন। কোন কোন সুধী এই জগৎব্যাপী কবি জরিপের সার্ভেয়ার ছিলেন, তাহা বলিতে পারি না, যাঁহারা আমাদের ধন্য করিলেন, তাঁহারাই ধন্য।’ এই মন্তব্যটি ‘সাহিত্য’  সম্পাদক সুরেশচন্দ্র সমাজপতির ( ১৮৭০-১৯২১)।  ১৩১৯ বঙ্গাব্দের কার্তিক সংখ্যা ‘সাহিত্য’ পত্রিকায় মন্তব্যটি করেন তিনি। রবীন্দ্রজীবন ব্যাপ্ত করা যে দ্বেষ, ঈর্ষা ও অপমানের গলিত লাভা বয়ে গেছে, এটি তার ছোটো নমুনামাত্র ৷ 

রবীন্দ্রোত্তর যুগকে রবীন্দ্র- ধুত্তোর যুগ বলে ব্যঙ্গ করা হয়েছিলো। কৃত্তিবাস যুগে লেখা হয়েছিলো- ‘তিন জোড়া পায়ের লাথিতে লুটিয়ে পড়ে রবীন্দ্র রচনাবলী।’ পাকিস্তানীরা রবীন্দ্রসঙ্গীত নিষিদ্ধ করতে চেয়েছিলো, তার ধারাবাহিকতায় প্রায়ই স্বাধীন বাংলাদেশেও রবীন্দ্রনাথকে অস্বীকারের চেষ্টা আমাদের চোখে পড়ে ৷  এ বড়ো লজ্জার ৷ আবার পেছনের ইতিহাসে গেলে দেখি – ‘ আমার ত মনে হয় আজকাল গুরুদেবের বিরুদ্ধে যাই লিখুন না কেন তার একটা মূল্য আছে- আশ্রমের মোহান্তদের সমালোচনা সর্বদাই ভালো।’ বন্ধু বুদ্ধদেব বসুকে ৫.১০.৩৮ তারিখে লিখছেন সমর সেন। আরেকদিক থেকে সমর সেন যখন সমমনা কবিবন্ধুদের নিয়ে রবীন্দ্রদর্শনে গেলেন তখন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথের একটি চিঠিতে আমরা স্নেহপরায়ণ কবির দেখা পাচ্ছি – 

‘কল্যাণীয়েষু, সমর সেদিন তোমরা কবির দল এসে খুসি হয়ে গেছ শুনে আরাম বোধ করছি। তোমরা আতিথ্যের যতটা প্রশংসা করেচ তার যথোচিত কারণ খুঁজে পাচ্ছিনে। অল্পে খুশি হবার শক্তি যদি তোমাদের থাকে সে একটা দুর্লভগুণ বিশেষত বাংলা দেশে ৷ আমাকে বোধ হয় আগে থাকতেই তোমরা দুর্ধর্ষ দুর্জ্জন বলে কল্পনা করে এসেছিলে তারপরে যখন দেখলে মানুষটা নেহাৎ আপত্তিজনক নয় কেবল দোষের মধ্যে যার তার সঙ্গে হাসি তামাসা করে থাকে, বয়স বিচার করে না, তখন নিঃশ্বাস ফেলে বেঁচেছিলে।… ঢুঁ খেয়েছিলে প্রশান্তের কাছে, তর্কের যোগ্য শিকার পেলে সে রেয়াৎ করে না – আমি হাসি, তর্ক করিনে। তোমাদের লেখায় “হালকা”  কথাটা অত্যন্ত বেশি ব্যবহার করে থাকো, হালকা ঝড়, হালকা হাতি, হালকা ঢেউয়ে নৌকাডুবি, ইত্যাদি, আমার সম্বন্ধে গদ্য কবিতা যদি লেখো তবে ঐ হালকা বিশেষণটা সহজে ব্যবহার করতে পারবে ৷ ১৭ই বৈশাখ ১৩৪৫। ইতি তোমাদের কবি অগ্রজ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।’  এই চিঠিতে আমরা দেখছি, রবীন্দ্রনাথের হৃদয়ের দিকটা। ‘তর্কের যোগ্য শিকার’ পেলে তিনি তর্ক করেন না হাসেন।  একই  রবীন্দ্রনাথ কিন্তু স্পেনের অলোকরঞ্জন কবি হুয়ান রামোন হিমেনেথ ও তাঁর স্ত্রীর একাধিক সহৃদয় পত্রের কোনো জবাব দেন না ৷ অথচ হিমেনেথ তখনই বেশ পরিচিত নাম। তাঁরা এমনকি জানতে চাইছেন ডাকঘর নাটকের ঘন্টাধ্বনির কোনো বিশেষ ভারতীয় ধরন আছে কি না, তিনি নিরুত্তর থাকেন ৷ অবাক লাগে, অজস্র তুচ্ছ চিঠির উত্তরও তিনি বেশ জমিয়ে লিখছেন তখন ৷ জীবনানন্দের প্রতি রবীন্দ্রপত্র তো ইতিহাস হয়ে ওঠে – ‘চিত্ররূপময়’ শব্দে।  হিমেনেথ ও জীবনানন্দের প্রতি সুবিচার করেন নাই রবীন্দ্রনাথ, প্রাণস্পর্শের বাসনার  চিঠিতে নিরুত্তর থাকা এক ধরণের অপমান বৈকি।

আরেক রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে জানি ৷ অল্প বয়সের বালক রবীন্দ্রনাথ। তার আগে বলি, তাঁর ভাইপো অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাথে তাঁর স্নেহ, মায়ায় ঘেরা সম্পর্কের কথা। অবনীন্দ্রনাথ, আমাদের ভালোবাসার অবন ঠাকুর। চব্বিশ বছর বয়সে রবি কাকার উৎসাহে অবনীন্দ্রনাথ তুলির পাশাপাশি কলম হাতে তুলে নেন। এই উৎসাহ প্রদানের ঘটনা বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে অক্ষরমালার সাথে চিত্রভাষার সম্মিলনের দিক থেকে ভাবতে গেলে এক অবিস্মরণীয় ঘটনা। শকুন্তলা ( ১৮৯৫), ক্ষীরের পুতুল ( ১৮৯৬) হাতে নিলে আমরা দেখতে পাব একজন চিত্রকর লেখক যখন নিজের গল্পে ছবি আঁকেন, তখন সেটি কতটা মনোগ্রাহী হয়ে ওঠে। এই চিত্রণে লাইনের ঘনত্ব, আলো-ছায়ার বিন্যাস বিষয়ে অবনীন্দ্রনাথের নিয়ন্ত্রণ রসজ্ঞদের কাছে পরিলক্ষিত হয়। যদিও পাশ্চাত্য প্রভাব থেকে তখনো মুক্ত হননি তিনি। চার্লস লুইস পামারের শিষ্য ছিলেন। যেহেতু সাউথ কেনসিংটনের স্কুলটির সকল প্রশিক্ষিত ছিলেন পাশ্চাত্য অনুরাগী, অবন ঠাকুরও প্রথম জীবনে এই প্রভাব থেকে নিস্তার পাননি। রবীন্দ্রনাথ এই সময় ভাইপোকে দুই খণ্ডের মিকেলাঞ্জেলো জীবনী ও রবি বর্মার ছবির প্রতিলিপি উপহার দেন। দশ বছরের ছোট এই ভাইপোটিকে বিশেষ স্নেহের চোখে দেখবার মূলে একটি আনন্দের ইতিহাস আছে। এই ইতিহাসে রবীন্দ্রনাথের মনের গঠন বুঝতে পারা যাবে। 

রবিজবানিতে শোনা যাক : ‘একটা নিতান্ত সামান্য ঘটনায় আমার প্রতি গুণদাদার (অবনের বাবার) স্নেহকে আমি কিরূপ বিশেষভাবে উদ্বোধিত করিয়াছিলাম সে-কথা আমার মনে পড়িতেছে। ইস্কুলে আমি কোনোদিন প্রাইজ পাই নাই, একবার কেবল সচ্চরিত্রের পুরস্কার বলিয়া একখানা ছন্দোমালা বই পাইয়াছিলাম। আমাদের তিনজনের ( দাদা সোমেন্দ্রনাথ, ভাগিনেয় সত্যপ্রসাদ) মধ্যে সত্যই পড়াশোনায় সেরা ছিলো। সে কোনো-একবার পরীক্ষায় ভালোরূপ পাস করিয়া একটা প্রাইজ পাইয়াছিল। সেদিন ইস্কুল হইতে ফিরিয়া গাড়ি হইতে নামিয়াই দৌড়িয়া গুণদাদাকে খবর দিতে চলিলাম। তিনি বাগানে বসিয়া ছিলেন। আমি দূর হইতেই চীৎকার করিয়া ঘোষণা করিলাম, “গুণদাদা, সত্য প্রাইজ পাইয়াছে।” তিনি হাসিয়া আমাকে কাছে টানিয়া লইয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, “তুমি প্রাইজ পাও নাই?” আমি কহিলাম, “আমি পাই নাই, সত্য পাইয়াছে।” ইহাতে গুণদাদা ভারি খুশি হইলেন। আমি নিজে প্রাইজ না পাওয়া সত্ত্বেও সত্যের প্রাইজ পাওয়া লইয়া এত উৎসাহ করিতেছি, ইহা তাঁহার কাছে বিশেষ একটা সদগুণের পরিচয় বলিয়া মনে হইল। তিনি আমার সামনেই সে-কথা অন্য লোকের কাছে বলিলেন। এই ব্যাপারের মধ্যে কিছুমাত্র গৌরবের কথা আছে, তাহা আমার মনে ছিলো না; হঠাৎ তাঁহার কাছে প্রশংসা পাইয়া আমি বিস্মিত হইয়া গেলাম। এইরূপে আমি প্রাইজ না পাইয়াও প্রাইজ পাইলাম।’ এই ইতিহাসের পরবর্তীকালের ঘটনায় আমাদের চোখে পড়বে রবীন্দ্রনাথ তাঁর জীবনের প্রথম দিকে পাওয়া এই বিস্ময়কে ভুলতে পারেননি। নানাভাবে পৃষ্ঠপোষকতা করে এক দশকের মাত্র অনুজ ভাইপোকে বিস্মিত করেছেন সারাজীবন।   রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাঙালির প্রাণের ঠাকুর। আশ্রয় দেন সকল তৃষাতুর রবীন্দ্র আগ্রহীদের। এই রবীন্দ্র জন্মদিনে তাঁর জীবনের টুকরো ঘটনা থেকে, লেখাপত্রের দিকে ফিরে তাকিয়ে আমরা আত্মসমালোচনার মুখোমুখি দাঁড়াতে পারি। নিজের আত্মার দিকে ফিরে তাকানো আমাদের আরেকটু শুদ্ধ মানুষ করে তুলবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Share post:

সাবস্ক্রাইব

spot_img

সম্পাদকের নির্বাচিত

আরও পড়ুন
আরও পড়ুন

ঔপন্যাসিক ইয়াং যুয়ান জি’র সাক্ষাৎকার

অনুবাদ : স্বাতীলেখা মিত্র 'তাইওয়ান ট্রাভেলগ' লেখার পেছনের অনুপ্রেরণা সম্পর্কে...

পাপের প্রেত

লর্ড ডানসেনি ভাষান্তর: সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায় আমার ভাইয়ের সঙ্গে সেই বিশাল নির্জন...

তিন টুকরো চিন্তা : রবীন্দ্র প্রাসঙ্গিক

মার্ক্সিস্ট স্কুলের সামান্য ছাত্র হিসেবে জানি, একটা গল্প কে...

স্থাপত্য আর রবীন্দ্রগান : দুই

স্থাপত্য  আর রবীন্দ্রগানের আন্ত:সম্পর্ক বিষয়ে নিউজ থ্রিসিক্সটিতে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন...