স্থাপত্য আর রবীন্দ্রগান : দুই

Date:

স্থাপত্য  আর রবীন্দ্রগানের আন্ত:সম্পর্ক বিষয়ে নিউজ থ্রিসিক্সটিতে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন সুপ্রভা জুঁই। নিয়েছেন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈকত দে

রবীন্দ্রসঙ্গীতের তো এক ধরণের স্থাপত্যভঙ্গী আছে, ধ্রুপদি সুরের ধরনই তাই। আপনার ব্যক্তিগত স্থাপত্য চর্চার সাথে মিলিয়ে আমাদের অভিজ্ঞতাটুকু জানাবেন?

সুপ্রভা জুঁই: স্থাপত্য ও রবীন্দ্রসঙ্গীতের নির্মাণশৈলীর মাঝে একটা কমন স্পেস খুঁজতে হলে আমি বলবো দুটোই কিছু একটা খুঁজতে বেরিয়েছিল… স্থাপত্য তার ফাংশনের উদ্দেশ্য পূরণ করতে চেয়েছিল। আর রবীন্দ্রসঙ্গীত কোনো তৃষ্ণার্ত পথিকের তৃষ্ণা মেটাতে। সেরা স্থাপত্য ও রবীন্দ্রসঙ্গীত রিদম, হারমোনি, হায়ারার্কি, ম্যাটেরিয়াল (সঙ্গীতে ধরি শব্দ) দিয়ে সেই যাত্রাটার ও তার সমাপ্তি এতটাই মিহিভাবে ঘটান যে আমরা ব্যাকরণ ভুলে যাই। 

স্থাপত্যে আমি মনে করি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো স্পেসের মাঝে এক শূন্যতার আবির্ভাব ঘটাতে পারা। যেখানে মানুষ থামতে জানে, আশেপাশে একটু দেখার অবকাশ পায় যাতে আসলে নিজের মাঝেই দেখার সুযোগ ঘটে। রবীন্দ্রসঙ্গীত শুনলে আমার মাঝেও ঠিক এই অনুভূতিটাই প্রস্ফুটিত হয়ে ওঠে। 

স্থাপত্য আর স্বরলিপি দুটিরই গড়ন গাণিতিক। স্থাপত্য গান আপনার যাপনে যে ভূমিকা রেখেছে, সে সম্পর্কে বলুন।

সুপ্রভা জুঁই: গাণিতিক শব্দটা ব্যবহার করেছেন আমার খুব ভালো লাগলো। মনে আছে ছোটবেলায় গান না শুনে অংক করতে পারতাম না! এই গোটা মহাবিশ্ব এই সিস্টেমেই চলছে।   

রবীন্দ্রসঙ্গীত আমার সাধকমনের যে দুঃখ তাকে আরো সুরেলারূপে অনুভব করায়। দুঃখবিলাস থেকে আমাকে তুলে এনে এক মহত্তর জায়গায় নিয়ে যাওয়ার জন্য প্রার্থনা হিসেবে কাজ করে রবিগান। তিনি তাল নিয়ে অনেক জানতেন, লেখাপত্রও আছে। কিন্তু সেসব নিয়ে ঘাটাঘাটি করতে ইচ্ছে করেনি কখনো। আমি যখন তাঁকে শুনি তখন তাঁর সাথে আমার কোনো ফারাক থাকে না। আমি তাঁর গান গাই। আমার কাছে বিষয়টা ধ্যানের মতন। গাওয়ার সময় আমার দম ঠিক হয়ে যায়, শিথিলায়ন হয়, তাঁর শব্দগুলো আমাকে রোগমুক্ত করে, উচ্চারণের কম্পন শরীর ও মন জাগিয়ে তোলে। নিশ্চিতভাবেই তার পিছনে গাণিতিক নানান কারিগরি আছে। তার বলয়েই আমি আছি ঠিক স্থাপত্যের মতন।  

স্থাপত্য নিয়ে লেখা বা দেখার চর্চা থাকলেও বাংলাদেশের কয়টা মানুষ আর যুতসই স্থাপত্যে জীবন কাটাতে পেরেছে। খুবই কম সংখ্যক মানুষের মাঝেই এই স্বস্তি সীমাবদ্ধ। তাছাড়া ঘনবসতির এই দেশে স্থাপত্য এককভাবে সুন্দর হয়ে ওঠে না। নগর পরিকল্পনা এখানে বড় একটা প্রভাবক। জ্যামিতিক চর্চা বাংলাদেশের স্থাপত্যে করার সুযোগ হয়তো খুব কম।

আমি বরং একটু রবীন্দ্রনাথের স্থাপত্য ভাবনার একটা ছোট্ট অংশ বলতে আগ্রহী। স্থাপত্যবিদ্যায় আমার থিসিস প্রজেক্ট ছিল শিলাইদহের তাঁর বাড়িকে কেন্দ্র করে যে মিউজিয়াম তৈরি হয়েছে সেটার সাইট ডেভলপমেন্ট নিয়ে। শান্তিনিকেতনে তাঁর বাড়িগুলোতে ব্যক্তি রবীন্দ্রনাথকে পাই আমি। একইসাথে সেই বাড়িগুলোর নামকরণে তাঁর সাহিত্যবোধের মুন্সিয়ানা প্রকাশ পায়। আমরা যদি তাঁর বাড়িগুলোর নাম দেখি:

দেহলি– সংস্কৃত শব্দ ‘দেহ’ থেকে দেহালি নামটি এসেছে। অর্থ, যা দেহের আশ্রয় দেয়। মাটি ও গোবর দিয়ে তৈরি একতলা ও ছাউনি বাড়ি। দেহালি একই সঙ্গে মাটি আর আকাশ ছুঁয়ে থাকার তাড়না জোগায়।

শান্তিনিকেতনের ‘দেহলি’— ১৯০৬ সালে নির্মিত এই বাড়িতেই দীর্ঘ ১৩ বছর বসবাস করেছেন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
ছবি: সংগৃহীত

কোণার্ক– সংস্কৃত থেকে আগত শব্দ কোণার্ক। অর্থ, কৌণিকভাবে আসা আলো। একতলা লম্বাটে এই বাড়ি। পূর্ব দিক থেকে বাড়ির ছাদ ছাড়িয়েও কিছু উঁচু ছাদ দিয়ে একটি বারান্দা ঢুকে গিয়েছে ঘরের ভেতরে একেবারে কেন্দ্রে। এখান দিয়েই ঘরে প্রবেশ করে সূর্যের কৌণিক আলো।   

শান্তিনিকেতনের উত্তরায়ণ প্রাঙ্গণের ‘কোণার্ক’— এই বাড়ির স্থাপত্যে ফুটে উঠেছে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পরিবর্তনশীল শিল্পভাবনা ও নান্দনিকতার ছাপ।
ছবি: সংগৃহীত

উদয়ন– উদয়ন বা ভোর। উদয়ন শান্তিনিকেতনের একমাত্র বিশালাকার ভবন। রবীন্দ্রনাথের পুত্রের প্রয়াসে বানানো এ বাড়িতে রবীন্দ্রনাথ কমই থেকেছেন। সত্যি বলতে তাঁর কিছুটা অভিমানই ছিল যে কেন তাঁর আশ্রমে এই বিশাল বাড়িটি বানানো হলো।

শান্তিনিকেতনের উত্তরায়ণ প্রাঙ্গণে অবস্থিত ‘উদয়ন’ ছিল কবিগুরু Rabindranath Tagore-এর সবচেয়ে বৃহৎ ও নান্দনিক আবাসগুলোর একটি। কবির ব্যক্তিগত গ্রন্থাগার, লেখার টেবিল এবং ব্যবহৃত আসবাবপত্র আজও সংরক্ষিত রয়েছে আগের মতোই, যা দর্শনার্থীদের সামনে উন্মোচন করে তাঁর সৃষ্টিশীল জীবন ও চিন্তার এক অন্তরঙ্গ জগৎ।
ছবি: সংগৃহীত

শ্যামলী– সংস্কৃত শব্দ থেকে আসা শব্দ শ্যামলী। কালচে ধরনের মাটি দিয়ে বানানো এই বাড়ি। অনেকটা গুহার মতো আবদ্ধ। অজন্তা গুহা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে রবীন্দ্রনাথ এই বাড়িটি বানিয়েছিলেন। মাটির সঙ্গে মিশে একাকার হয়ে যাওয়ার রবীন্দ্রবাসনা প্রকাশিত হয় এই বাড়িতে। আমার কাছে এই বাড়িটিকে রবীন্দ্রনাথের চিত্রকর্মের ফিজিক্যাল ট্রান্সফর্মেশন বলে মনে হয়। 

শান্তিনিকেতনের উত্তরায়ণ প্রাঙ্গণের ‘শ্যামলী’— মাটির তৈরি এই অনন্য বাড়িটি কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নিজস্ব স্থাপত্যভাবনা ও প্রকৃতিপ্রেমের এক বিরল নিদর্শন।
ছবি: সংগৃহীত

পুনশ্চ– এই বাড়িটি রবীন্দ্রনাথের আরামঘর হিসেবে ব্যবহৃত হতো। বাড়ির একটি অংশ ছাদহীন, কয়েকটি দেয়ালহীন। এই বাড়িটির নাম তিনি তাই দেন, পুনশ্চ।

শান্তিনিকেতনের উত্তরায়ণ প্রাঙ্গণের ‘পুনশ্চ’— কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জীবনের শেষ পর্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ ও নান্দনিক বাসভবন, যেখানে তিনি খোলা বারান্দা ও ছাদে বসে কাটাতেন দীর্ঘ সময়।
ছবি: সংগৃহীত

উদীচী– সংস্কৃত শব্দ ‘উদি’ এবং ‘চি’ থেকে আগত এই নাম। উদীচী অর্থ ওপরের দিকে উত্থান। এই বাড়িটিও একটি চমৎকার ডিজাইনের সিঁড়ি দিয়ে ওপরের দিকে উঠে গেছে। সেখান থেকেই এর নামকরণ হয় উদীচী।  

উদীচী — শান্তিনিকেতনের উত্তরায়ণ প্রাঙ্গণে অবস্থিত কবিগুরু Rabindranath Tagore-এর স্মৃতিবাহী এক নান্দনিক আবাস। শিল্প, প্রকৃতি ও স্থাপত্যের মেলবন্ধনে গড়ে ওঠা এই ভবন আজও বহন করে রবীন্দ্রচিন্তা ও শান্তিনিকেতনের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অনন্য সাক্ষ্য।
ছবি: সংগৃহীত

তালধ্বজ– রবীন্দ্রনাথের তরুবিলাসী এক বন্ধু শান্তিনিকেতনে পথের একধারে একটি গোলাকার কুটির রচনা করেন। যেটি একটি পুরোনো তালগাছকে কেন্দ্র করে তৈরি। রবীন্দ্রনাথ এই তালধ্বজ নিয়ে বলছেন, ‘এটি যেন মৌচাকের মতো, নিভৃতবাসের মধু দিয়ে ভরা। লোভনীয় বলেই মনে করি, সেই সঙ্গে এও মনে হয়, বাসস্থান সম্বন্ধে অধিকারভেদ আছে; যেখানে আশ্রয় নেবার ইচ্ছা থাকে, সেখানে হয়তো আশ্রয় নেবার যোগ্যতা থাকে না।’

শান্তিনিকেতনের ‘তালধ্বজ’— একটি পুরোনো তালগাছকে ঘিরে নির্মিত অনন্য গোলাকার কুটির, যা কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রকৃতিপ্রেম ও নিভৃতচিন্তার প্রতীক হয়ে আছে।
ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশ এক স্বাধীন, সার্বভৌম দেশ৷ অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গ স্বাধীন রাষ্ট্র ভারতের একটি প্রদেশ মাত্র৷ সীমান্তের দুই পাশের রবীন্দ্রচর্চায় কোনও পার্থক্য দেখেন?

সুপ্রভা জুঁই: রবীন্দ্রনাথ আমাকে এসব নিয়ে ভাবতে দেননি। বিজ্ঞজনেরা বলবেন, রবীন্দ্রনাথ এটাই করান। বাঙালি জাতীয়তাবাদের রাজনীতি এভাবেই হয়। এভাবেই রবীন্দ্রনাথ অন্ধ করে তুলছেন, ভাবতে দিচ্ছেন না। তবে সেটা আমার ক্ষেত্রে অন্তত হচ্ছে না। একবার একটু হারিয়ে যেয়ে দেখুন তাঁর গানের মাঝে, কথার মাঝে। তখন ভালো যদি নাও লাগে অন্তত উচিৎ জবাব দেওয়ার প্রয়োজনীয়তাটা আর থাকবে না। নীরবেই সরে পড়তে হবে।

তবে এটা ঠিক যে ‘রবীন্দ্রনাথ ছাড়া বাকি সবাই বাতিল’ এই ধারণার কারণে পশ্চিমবঙ্গকেই ভুগতে হয়েছে। আমাদের এখানে পঞ্চকবি, লোকগান ও ব্যান্ড সঙ্গীত যতটা ব্যপ্তি পেয়েছে তা পশ্চিমবঙ্গে পায়নি। এখানেই আমি স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ ও ভারতের প্রদেশ পশ্চিমবঙ্গে রবীন্দ্র চর্চার প্রধান ফারাকটা টের পাই। যেহেতু রবীন্দ্রসঙ্গীত অন্যান্য গানের উপর কর্তৃত্ব করতে পারেননি তাই যারা তাঁকে শোনে প্রকৃতই শোনে। তারা রবীন্দ্রসঙ্গীত বেছে নিয়েছে। আরোপিত হননি কবি এখানে। 

ভাবগত চর্চার ফারাকের কথা বলতে পারছি না, কেননা সেটার জন্য জায়গার কোনো সম্পর্ক নেই। তবে দেহে নেই যে রবীন্দ্রনাথ তাঁকে উপলব্ধি করতে তাঁর বাসস্থান, শান্তি নিকেতন এবং নানান আয়োজনের কারণে পশ্চিমবঙ্গের মানুষের এক্সেস বেশি। 

আবার ধর্মীয় সংস্কৃতির কারণে ছোটবেলা থেকে কবিতা, গান বা নাটকের চর্চা পশ্চিমবঙ্গেই বেশি বলে ঠাহর করি। ফলে রবীন্দ্রনাথকে জানার সুযোগটা ওদেরই বেশি। আমার মনে পড়ে একবার দুর্গাপূজার বিসর্জনের দিনে কলকাতা ছিলাম। রাতে যখন বের হয়েছি প্যান্ডেলগুলোয় ভিড় কমেছে। কিন্তু রাস্তার মোড়ে মোড়ে মাইকে রবীন্দ্রসঙ্গীত বাজছিল। এটা আমি বাংলাদেশে কখনো দেখিনি। মাইকে নানা গান চলেছে কিন্তু রবীন্দ্রসঙ্গীত বাজতে শুনিনি। 

আবার ঠিক এই একই ধর্মীয় সংস্কৃতির কারণে পশ্চিমবঙ্গে রবীন্দ্রনাথ রাজনীতির একটা টুলে পরিণত হয়েছেন। নরেন্দ্র মোদির রবিসাজে ছবিগুলোর কথা ভুলবো না। তাছাড়া শান্তিনিকেতন বিশ্বভারতী তথা কেন্দ্রীয় সরকারের দখলে। ২০২৪ সালে আমি নিজেই শান্তিনিকেতনে যেয়ে তাদের নিজস্ব বইয়ের দোকানে রবীন্দ্রনাথের সব বই পাইনি। সাজানো গোছানোতেও চূড়ান্ত অবহেলা। বইয়ের যোগান না থাকাটাকে আমি গুরুতর অপরাধ বলে মনে করি। 

আজ যখন এই কথা বলছি ততক্ষণে পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের রায় দিয়েছে। এখন দেখার বিষয় যে রবীন্দ্রনাথকে সাধগুরুর ইশা আশ্রম দিয়ে প্রতিস্থাপন করবে তারা নাকি রবীন্দ্রনাথকেই  ব্যবহার করবে। দুই জায়গাতেই রবীন্দ্র চর্চার বিষয়টি সময়ের সাথে হাত ধরে পরিবর্তিত হচ্ছে। 

শোনা যায়, রবীন্দ্রনাথ নিজের গানের শুদ্ধ গায়নের পাশাপাশি যিনি গাইবেন তাঁর স্বাধীনতায়ও বিশ্বাস করতেন। আবার দেবব্রত বিশ্বাসের সাথে বিশ্বভারতীর দীর্ঘদিনের দূরত্বের খবর আমরা পাই। আপনার মতে, একজন শিল্পী কত দূর পর্যন্ত স্বাধীনতা নিতে পারেন?

সুপ্রভা জুঁই: শিল্পী কি স্বাধীনতার কথা চিন্তা করে সৃষ্টি করতে পারেন… পেশাগত পর্যায়ে পারেন। কিন্তু নিজের জন্য? কেউই পারে না। স্বাধীনতাটা হয়তো পরে তার আশেপাশের পরিবেশ ঠিক করে দেয়। সেলফ সেন্সর মেনে কেউ কেউ কাজ করেন তখন। রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে ক্যারিকেচার বা এক্সপেরিমেন্ট কোনোটাই কম হয়নি। ভালো-মন্দ মিলিয়েই এটা একটা শুভ চর্চা বলে মনে করি আমি। হিরো আলম রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইলে সেটা খারাপ কিছু লাগে না। বরং পপ কালচারে রবীন্দ্রনাথের প্রাসঙ্গিকতাটা টের পাই। তবে মানুষের এই চটে যাওয়া দেখতে আমার খুব মজা লাগে।   

তাঁর গানের মাঝে ‘উলালা’ কথাটা ঢোকানো, সুরে কিছুটা স্বাধীনতা নেওয়া এবং পশ্চিমা যন্ত্রসঙ্গীতের ব্যবহারে ফিউশন করে যে গানগুলো হয়েছে তার কিছু কিছু ব্যক্তিগতভাবে আমার শুনতে ভালো লাগে। যেগুলো ভালো লাগেনি সেগুলো বিরক্তি দেয়নি। আমাদের শ্রোতারা নিজেদের শিল্পী মনে করলে কোনো কিছুই বিরক্ত উৎপাদন করতে পারবে না, তাই না? যেকোনো আর্ট প্রডাক্টের গ্রাহকের মনেও শিল্পবোধ আছে বলেই তো এত সৃষ্টি। 

ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি কিউ (কৌশিক গাঙ্গুলী) এর চিত্রায়নে রবীন্দ্রনাথের ‘তাসের দেশ’ আমার দেখা সেরা অ্যাডাপ্টেশন। এখানে গানগুলো এবং গল্পের প্রেক্ষাপটের আকল্পনে একটা স্বাদ আছে যেটা খুব টু দ্য পয়েন্ট এবং ইউনিকও। 

তবে একটা প্রসঙ্গ আমাকে একটু ভীত করেছে। ফিল্ম কম্পানিয়ন নামের ইউটিউব চ্যানেলে অটোটিউন প্রসঙ্গে সুরকার ভিশাল দাদলানির একটা ভিডিও আছে, নয় বছর আগে দেখেছিলাম। সেটার শেষে তিনি এক কাণ্ড করেছেন। রবীন্দ্রনাথ জনগণমন গানটা গেয়েছেন এমন এক অরিজিনাল রেকর্ড ক্লিপ পেয়েছেন তিনি। তিনি বলছেন, রবীন্দ্রনাথ সুরে নেই। রবীন্দ্রনাথকে সুরেলা করতে অটোটিউন দিয়ে প্রচলিত সুরে গাওয়ালেন। এবং কি এক বিশাল কাজ করেছেন সেরকম ভাব করলেন। 

রবীন্দ্রনাথ কেন যার তার গলায় অটোটিউন বসিয়ে দেখার ইচ্ছে থাকতেই পারে। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের সময় কীভাবে গান গাওয়া হতো, রবীন্দ্রনাথ ও তাঁর নিকটজনেরা কীভাবে রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইতেন এবং সময়ের সাথে সাথে এই গাওয়ার ধরন কীভাবে বদলেছে সেটা আমরা জানার চেষ্টা করলাম না। ঐ গানের অডিও ক্লিপের কি মর্ম তা বুঝতে ভুল করলাম। সুর বেসুর এখানে মুখ্য নয়, এটা সারফেস লেভেলের আলাপ। মৌলিক বিষয়টির গুরুত্ব না বুঝে চলতি ধারায় তাকে ‘ফিক্স’ করার যে গৌরব তা আমাকে ভীত করে তোলে।

এটা রবীন্দ্রনাথ নয় কেবল, অন্যান্য যেকোনো ক্ষেত্রেই একটা পপুলার অপিনিয়নকে প্রতিষ্ঠিত করতে যেকোনো ভুল বিষয়কেও সঠিক বানিয়ে ফেলা হয়। এটা আমাকে ভীত করে। এখানে স্বাধীনতা তাই যার যার শিল্পবোধ তৈরি করে দিতে পারে, আর কেউ না।

আজকাল আমি মনে করি, এই গুণটি মানুষ তার পরিবেশ থেকে পায় শুধু এমন না। বরং বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সে এই গুণটি নিয়ে জন্ম নেয়, বা নেয় না।  

সাক্ষাৎকার দিয়েছেন সুপ্রভা জুঁই স্থপতি সুপ্রভা জুঁই সুফিগুরু পারমার্থিক স্কুলের একজন আশেকান, যেখানে তিনি নিয়মিত আধ্যাত্মিক শিক্ষায় অংশগ্রহণ করছেন। একই সঙ্গে তিনি এই স্কুলের ‘পারমার্থিক’ ওয়েবসাইটের প্রধান নির্বাহী সম্পাদক হিসেবে মিশনারি কার্যক্রমের সঙ্গেও সক্রিয়ভাবে যুক্ত। সুপ্রভা একজন বহুমাত্রিক গল্পকার, যিনি স্থাপত্য, গণমাধ্যম এবং সামাজিক পরিবর্তনের সংযোগস্থলে কাজ করে চলেছেন। তিনি ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশ থেকে কমিউনিকেশনে মাস্টার্স এবং ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিক থেকে স্থাপত্যবিদ্যায় ব্যাচেলর ডিগ্রি অর্জন করেছেন। বর্তমানে তিনি বন্ধন ম্যাগাজিন (আকিজ ব্রডকাস্ট অ্যান্ড মিডিয়া)-এ কর্মরত আছেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Share post:

সাবস্ক্রাইব

spot_img

সম্পাদকের নির্বাচিত

আরও পড়ুন
আরও পড়ুন

ঔপন্যাসিক ইয়াং যুয়ান জি’র সাক্ষাৎকার

অনুবাদ : স্বাতীলেখা মিত্র 'তাইওয়ান ট্রাভেলগ' লেখার পেছনের অনুপ্রেরণা সম্পর্কে...

পাপের প্রেত

লর্ড ডানসেনি ভাষান্তর: সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায় আমার ভাইয়ের সঙ্গে সেই বিশাল নির্জন...

তিন টুকরো চিন্তা : রবীন্দ্র প্রাসঙ্গিক

মার্ক্সিস্ট স্কুলের সামান্য ছাত্র হিসেবে জানি, একটা গল্প কে...

রবীন্দ্রমন : নানা বয়সে

রবীন্দ্রনাথ একের মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন জন। ভিন্ন জনের সমাবেশ...