শহরের হৃদয়গহ্বরে রাতের শিরা-উপশিরায় বয়ে চলে এক করুণ সানাইয়ের সুর। ইট-কাঠ-কংক্রিটের উপর দিয়ে ভেসে যায়,শীতল হাওয়ার মতো।একদল কুকুর সুউচ্চে বলেই যাচ্ছে কিছু। আওয়াজ যেন পাঁজরের হাড়ে হাড়ে কম্পন তোলে, তবু ঘুমন্ত জনতার কানে পৌঁছায় না। তারা অভ্যস্ত, নিদ্রাহীন চোখে টিভির পর্দায় রাষ্ট্রের মিষ্টি মিথ্যাগুলোকে সত্য বলে মেনে নেওয়ার চেষ্টা করে। রাত এখানে অনিদ্রা-আক্রান্ত প্রহরী, বিছানায় টং হয়ে বসে থাকে; তার হাতের লণ্ঠন আলো নয়, অন্ধকারের গায়ে আঁকে প্রশ্নবোধক চিহ্ন।
আর্কো, আমাদের নায়ক, তার একরুমের ফ্ল্যাটের জানালায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে। নিচের রাস্তায় পুলিশের ভ্যানের সাইরেন চিৎকার করে ওঠে। সে গগলসটা ঠিক করে নেয়।। গগলস কালো ফ্রেমের, লেন্সে ধূসর ফিল্টার। গগলসের চোখে ফিল্টার হওয়া তার হাসি বিকৃত প্রতিধ্বনি। এটি প্রেমিকার উপহার। তিন বছর আগে, যখন তার প্রেমিকা স্কয়ারে একটি কবিতা আবৃত্তি করার পর উধাও হয়ে গিয়েছিল। “ধরিয়ে দাও’’জনতা স্লোগান তোলে, তাদের উৎসব নাটক মাত্র। রাষ্ট্রের মন্ত্র: “নীরবতাই মহৎ। শব্দই অপরাধ । “
সেদিন কবিতা আবৃত্তির আগে সে আর্কোকে বলেছিল, “গগলস চোখের ঢাল। বাস্তবতা দেখতে চাইলে এগুলো খুলে ফেলো। কিন্তু বেঁচে থাকতে চাইলে পরেই থাকো। “ প্রেমিকা উধাও হয়ে যাওয়ার পর থেকে আর্কো গগলস ছাড়া বাইরে বেরোয় না।
গগলসের ভেতর দিয়ে শহরটাকে দেখতে যেমন, রাস্তার ল্যাম্পপোস্টগুলো নিঃসঙ্গ গলাফাঁড়া মানুষের মতো দাঁড়িয়ে, আর তাদের আলোয় ভেসে ওঠে দেয়ালে স্প্রে করা স্লোগান: “নীরবতাই মহৎ , শব্দই অপরাধ । “ আর্কোর দেহে ব্যথার মানচিত্র। কাঁধে দাগ ।এক বছর আগে পুলিশের লাঠির আঘাত। পেটে জ্বালা, ক্ষুধা নয়, লজ্জার আগুন। সে ভাবে, “শব্দের মূল্য এখন রক্ত।”
ভোরের বাজারে হাটবাজারের কলরোল। এক নারী, যার বয়স ত্রিশ পার হয়নি, লাইনে দাঁড়িয়ে আছে। তার হাতে একটি পাজামা, দাম দেখে চোখ বড় হয়। দোকানি চিৎকার করে, “মূল্যহ্রাসের জীবন! আজই কিনুন, কাল মিলবে না!” নারীর পাশে দাঁড়ানো এক যুবক ফিসফিস করে, “এই পণ্যটির জন্য ‘কুমারীত্ব সার্টিফিকেট’ লাগবে। ডাক্তারি রিপোর্ট আছে?” নারীর হাত কাঁপে। আর্কো দূর থেকে দেখে। মনে পড়ে তার মায়ের কথা , সে যেদিন স্কুল থেকে জিজ্ঞেস করেছিল, “মা, বাবা কেন চলে গেল?” মা তখন তাকে চাপা গলায় বলেছিল, “জিহ্বা বাঁকাতে শিখো। সত্য বললে তুমি উলঙ্গ হয়ে যাবে।”
আর্কোর গদ্য কাঁচা, রূপকগুলো অতিরিক্ত সত্য। সে এখন দুর্নীতিবাজ রাজনীতিবিদদের জন্য স্লোগান লেখে। গতকালই সে লিখেছিল, “আমাদের নেতা সূর্য, আলো ছাড়া আমরা অন্ধ!’’ লেখার সময় তার গলা শুকিয়ে গিয়েছিল। সে কবিতা লিখে ড্রয়ারে লুকিয়ে রাখে—কবিতার শিরোনাম “ফাঁসির মঞ্চে ইশ্বর”।
শহরের কেন্দ্রে একটি মিছিল এগোয়। নেতৃত্বে নীরবতার মন্ত্রী , যার কপালে ভাঁজ প্রচারণা পোস্টারের মতো কুচকে আছে। তার গলার স্বর লাউডস্পিকারের মতো বিকট: “শব্দই রাষ্ট্রদ্রোহ! নীরবতাই … ‘’ , তার সঙ্গীরা সোনার জারে রাখা বিস্কুট চিবোয়। একজন তরুণ, যার গায়ে বিপ্লবী ট্যাগ লাগানো, টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যাওয়া হয়। আর্কোর মুষ্টি শক্ত হয়। সে ভাবে, এই তরুণ কি তার প্রেমিকার মতোই উধাও হয়ে যাবে?
মিছিলের পাশে দাঁড়িয়ে এক বৃদ্ধা কাঁদে। তার হাতে একটি ফটো—ছেলের ছবি, যে গত বছর একটি কবিতা আলাপে অংশ নিয়েছিল। আর্কো চেনে ওই ছেলেটিকে। তার নাম ছিল একটি। ছেলেটির শেষ কবিতার লাইন: *”আমার কণ্ঠস্বর মাটির নিচে, অঙ্কুরোদগমের প্রতীক্ষায়।”* ছেলেটির নাম আর্কো ভুলে গেছে নিজের ছায়ার দিকে তাকিয়ে।
গলিতে পচা ফুল আর বিস্মৃত বিপ্লবের গন্ধ। আর্কো একটি লাশের সামনে দাঁড়ায় একজন কবি, যার মুখ চেনা। তার পকেটে শোল মাছের পেন্ডেন্ট, ক্ষুধায় কাতর চোখের পাতার প্রতীক। স্মৃতি ভেসে আসে: শৈশবে “শৈশব লজেন্স”ক্যান্ডি বেচাকেনা, যার মিষ্টি স্বাদ আজকের তেতো স্বাদের বিপরীত। সে শোল মাছের পেন্ডেন্টে আঙুল বুলায়, ভাবে গণতন্ত্র কি এখন যৌনপল্লীর মতোই সস্তা, ক্লান্ত, সর্বোচ্চ দরদাতার জন্য পা ছড়িয়ে শুয়ে আছে?
আর্কো স্মৃতিতে হারায়: শৈশবে সে এবং প্রেমিকা নদীতে শোল মাছ ধরত। প্রেমিকা বলত, “এদের লড়াই করতে হয় স্রোতের বিরুদ্ধে। আমাদের মতো।”
কবি আন্ডারগ্রাউন্ড পত্রিকা বের করত। গত মাসে আর্কো তার সাথে দেখা করেছিল লাইব্রেরিতে। কবি বলেছিল, “শব্দের সৈনিকরা কখনো মরে না। তারা শুধু পাতালে গান গায়।”এখন কবির মুখে মাছিরা ঘোরাফেরা করছে। আর্কো শোল মাছের পেন্ডেন্টটি উঠিয়ে নেয়।
ফুলের রাজা দোকানে টিনেজারদের ভিড়। তারা গোলাপের জন্য নয়, কিনে নিরোধ। দোকানের মালিক, নামের সাথে সাহেব যোগ করেছে সে নিজেই, ইনফরমার। তার ফুলদানিতে পদ্ম শুকোয়। আর্কো হাসে , প্রেমিকার সাথে প্রথমবার এখানে এসেছিল। তারা গাঁদা কিনতে এসে দেখেছিল লিলির পাশে নিরোধের স্টক। প্রেমিকা তখন বলেছিল, “এটাই জাদুবাস্তবতা। প্রেম আর প্রতিরোধ একই ডালিতে।”
লাইব্রেরির ধুলোমাখা বইয়ের আড়ালে এক অচেনার সাথে আর্কোর চোখাচোখি।
একটি মেয়ে, যার হাতে “নীরবতা ভাঙো” ট্যাটু, চুপিচুপি আর্কোর হাতে একটি পাতিকাকের স্কেচ গুঁজে দেয়। স্কেচে লেখা: “সানাই বাজে অদৃশ্য বাঁশিতে।”
কেউ একজন তার হাতে একটি কাগজ দেয়—পাতিকাকের স্কেচ, যার পিঠে লেখা “নীল দৃশ্যের বই, পৃষ্ঠা ১৪৩”। আর্কো বইটি খোঁজে। পৃষ্ঠা ১৪৩-এ একটি কবিতা: “আমাদের দেখা হবে না, কিন্তু সুরে সুর মিলবে। ফাটলে ফুল ফুটবে।”
অচেনা চোখে ইশারা করে: “তোমার গান শুরু করো।”
ভোরের রক্তলাল আকাশ। আর্কো দাঁড়ায় বেশ্যাপাড়ার প্রান্তে। এখানে গণতন্ত্র মাদকাসক্ত ঘুমে খড়্গড়ায়। সে গগলস খুলে ফেলে। পৃথিবী ঝাপসা ।আলো-ছায়ার লুকোচুরি। তার পকেটে শোল মাছের পেন্ডেন্ট আর পাতিকাকের স্কেচ।
সে রাস্তায় নামে। গলা ছেড়ে গান শুরু করে ।বাক্যহীন, শুধু সুর। প্রথমে কাঁপা কণ্ঠ, পরে দৃঢ়। কোথাও থেকে সানাইয়ের সুর জবাব দেয়। দূরের একটি বারান্দায় এক তরুণী হারমোনিকা বাজায়। রাস্তার কোণে এক নবজাতক তার অস্পষ্ট উচ্চারণে সুর মেলায়।
আর্কো বুঝতে পারে, নীরবতার সিম্ফনি আসলে বহু কণ্ঠের মেলবন্ধন। পৃথিবীর ফাটলে জোড়া লাগছে, বসন্তকে একবারে ঘুম করতে পারেনি কর্পোরেট পুঁজিপতিরা।
পুলিশের গাড়ির সাইরেন ভেঙে দেয় গান। কিন্তু সুরগুলো আকাশে মিশে যায়। আর্কো হাসে। প্রেমিকার কথা মনে পড়ে, সে হয়তো কোথাও এই সুর শুনছে।
“সুর অমর,” আর্কো মনে মনে বলে। সে জানে, আগামীকাল আবার লিখতে হবে স্লোগান। একইসাথে ড্রয়ারে কবিতা জমবে। পাতিকাকের স্কেচ বাড়বে। সানাইয়ের সুর দীর্ঘতর হবে। বিশ্বাস ক্রমাগত বদলাবে চাহনি। হাতে হাতে ফিরবে নীল দৃশ্যের বই।

