সুব্রত মিত্র সম্পর্কে

Date:

অনেক সময় সাংবাদিকরা বড়ো মানুষকে দেখলে অনেক কিছু গুলিয়ে ফেলেন। সাংবাদিক নিজে পরিণত বয়সের হলেও এমন হতে পারে । এই লেখায় তার একটা মজার চেহারা দেখা যাবে । কোথাও কোথাও প্রায় শিবরামীয় মজা!

সাংবাদিকদের মধ্যে একটা ভয় করে প্রায় সময় ,  পৃথিবীর কোনো জায়গায় একটা গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষাৎকারের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন । সমুদ্রে পড়া কুকুরের মতো আপনি আতংকিত কেন না এই শেষ মুহূর্তের চকিত দেখায়  হাজারো গবেষণা কোনো ফল দেয় না।

কি করা উচিত তখন ?

ক্যালিফোর্নিয়ায় দ্য পাম স্প্রিং ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে সত্যজিৎ রায়ের অপু ট্রিলজির সিনেমাটোগ্রাফার সুব্রত মিত্রের সামনে পড়ে আমার সেই দশাই ঘটেছিলো। পথের পাঁচালী, অপুর সংসার আর  অপরাজিত ছবির ক্যামেরার অসামান্য কবি কলকাতা থেকে এসেছেন এই উৎসবে। তখন ৬৯ বছর বয়স তাঁর।

আমার কি আলাপে লিপ্ত হবার সাহস করা উচিত? রায় সাহেবের অপু ট্রিলজি দেখেছিলাম বছর কয়েক আগে, সেই হাল্কা স্মৃতির উপর নির্ভর করে ভাবলাম কথা বলার একটা ঝুঁকি নেয়াই যায়।

‘আপনি কি আমার কাজ সম্পর্কে জানেন? নইলে কথা বলে খরচ করবার মতো শক্তি আমার নেই ।’ মিত্র আমায় সতর্ক করলেন ৷ তাঁর বয়স হচ্ছে , অশক্ত হয়ে পড়েছেন, লাঠির সাহায্য নিতে হচ্ছে হাঁটতে। ‘আমার সাক্ষাৎকার জিনিসটা একেবারেই পছন্দ নয়।’ তিনি যুক্ত করেন। ‘কেন না লোকজন প্রায়ই আমার মুখে ভুলভাল কথা বসিয়ে দেয়।’

আমি তাঁর সতর্ক বার্তায় কান দিলাম না ৷ ‘আমি আপনার অনেক ছবি দেখেছি ।’ বললাম, দেবী আর  চারুলতার কথা। সত্যি বলতে কি, তাঁর বলা  রায়ের ফিল্মোগ্রাফির অন্য কিছু কাজ নিয়ে আমার কোনো ধারণাই ছিলো না যেমন পরশপাথর, জলসাঘর , মহানগর ।

কিছু একটা বলবার তাগিদে, আমি আরেক পা এগিয়ে গেলাম,‘ আমার মনে আছে রায় বাবু ১৯৫১ সালে জা রেনোয়ার দ্য রিভারের সময় ক্যারিয়ার শুরু করেন । তিনি ছিলেন ছবিটার সহকারী পরিচালক । তোলা হয়েছিলো কলকাতায় । ’ মিত্র ভ্রু কুঁচকে আমার দিকে তাকালেন । ‘ এটা ভুল তথ্য । ’ -তিনি বলতে লাগলেন বিরক্তি নিয়ে –‘ তিনি একটা পত্রিকার শিল্প নির্দেশক ছিলেন তখন । সাপ্তাহিক ছুটির দিনগুলোতেই আসতে পারতেন তখন শুটিং দেখার জন্যে সেটে,দর্শক হিসেবেই। আমি প্রতিদিন যেতে পারতাম। আমি শুটিং এর ছবি তুলে এনে তাঁকে দেখাতাম। এভাবেই আমরা বন্ধু হয়ে উঠি আর এভাবেই যে কোনোদিন এক ফুট ফিল্ম তোলেনি সে সত্যজিতের প্রথম ফিচার পথের পাঁচালীর সিনেমাটোগ্রাফার হয়ে পড়লো ।’

‘ পাখিদের নিয়ে দৃশ্যটা আমার ভারি ভালো লেগেছিলো ।’ কোনো একজনের শেষ হৃদস্পন্দনের সময় মাটি থেকে পাখির উড়ে যাওয়ার দৃশ্য ঝাপসা মনে পড়ায় সাহস করে বলে ফেললাম ।

‘কিসের পাখি?’ মিত্র গভীর ধাঁধায় পড়ে গেলেন , বুঝতে পারছেন না আমি কি নিয়ে কথা বলছি ।

কিসের পাখি? আমি তখন আতঙ্কিত । ‘ আপনি তো জানেন, যখন পথের পাঁচালীতে অপুর মা চলে গেলেন ।’

‘ পথের পাঁচালীতে মা মারা যান নাই তো ।’ মিত্র আমায় শুদ্ধ করে দিলেন ।

‘দুঃখিত,’ ঢোঁক গেলা ছাড়া কোনো কিছুই করণীয় ছিলো না ,হঠাৎ অপরাজিততে অপুর মায়ের জ্যান্ত দশাটি মনে পড়লো ।

‘আপনি পায়রাদের কথা বলতে চাইছেন? ’ তাঁর কণ্ঠে ব্যাপারটা বুঝতে চাওয়ার ইচ্ছে স্পষ্ট ।

‘ ঠিক বলেছেন । যখন পথের পাঁচালীর বাবা চরিত্রটি মারা যান ।’ আমি উত্তেজিত হয়ে বলে ফেলি ।

‘বাবা পথের পাঁচালীতে বেঁচে ছিলেন,’ তিনি আবার আমায় শুদ্ধ করে দেন ।  

এই সময়, যা হোক, আমি আত্মবিশ্বাসী ছিলাম যে তিনি ভুল তথ্য দিচ্ছেন, কত কাল আগের কথা! সেসব নিশ্চয়ই তাঁর মনে নেই আর । ‘ অবশ্যই পথের পাঁচালীতে তিনি মারা গেছেন ।’ আমি আরেকবার বললাম । মিত্র আমার বললেন, ‘আপনি যদি এটা বিশ্বাস করেন তাহলে আমি আপনার সাথে তর্ক করতে যাবো না ভাই।’ তিনি পুরোপুরি পাথরের মত স্থির হয়ে গেলেন।   ‘বাবা…’- মাত্রই শুরু করতে যাচ্ছিলাম আমার কথাটা বোঝানোর  জন্যে, তিনি মাঝপথে থামিয়ে দিলেন –‘বললাম তো আপনার সাথে তর্ক করবো না আমি ।’

মিত্র সোজা তাকিয়ে রইলেন । আমাকে যেন পড়ে ফেলছেন । নীরব । আমি মরিয়া হয়ে চেষ্টা করলাম , ‘ রায় সাহেবের সাথে আপনার সিনেমার কোন দৃশ্যটি আমার সবচেয়ে প্রিয় আপনি কি জানেন? পৃথিবীর সেরা সুন্দর দৃশ্যগুলোর একটা । অপরাজিত সিনেমার অপু যখন বাড়ি থেকে বেরোয়, মায়ের কাছ থেকে , ট্রেন ধরতে, একলা মাকে ফেলে কেন না তাঁকে কলেজে ফিরতে হবে । কিন্তু হঠাৎ করেই সে বাড়ি ফেরে। মা আরেকবার আনন্দ পেলেন অপুকে দেখে ।’

এক সময় আমি বকবক বন্ধ করলাম । মিত্র আমার প্রশংসা শুনে কোনো প্রতিক্রিয়া দেখালেন না। চোখের পলক পর্যন্ত পড়লো না। তিনি সোজা তাকিয়ে রইলেন । আমি বসা থেকে দাঁড়িয়ে পিছিয়ে এলাম এবং প্রায় নিঃশব্দে কেটে পড়লাম ।

ক্যামব্রিজে নিজের বাড়িতে ফিরে, বইপত্র নিয়ে উপুড় হলাম । লজ্জা আর ভয় আমাকে ঘিরে ধরলো । রায় রেনোয়ার সহকারী পরিচালক ছিলেন না । পথের পাঁচালীতে বোন আর পিতামহী মারা গেছেন । বাবা মা দুজনেই অপরাজিততে মৃত্যু বরণ করেন, সেখানেই পায়রা উড়েছিলো।

সুব্রত মিত্র, বৃদ্ধ বাজ যেন, প্রত্যেক ক্ষেত্রেই সঠিক । ‘ প্রাকৃতিক আলো’-য় দৃশ্য ধারণের একজন পথিকৃৎ তিনি । পঞ্চাশের দশকে অ্যারিফ্লেক্স-নাগ্রা কম্বিনেশন জনপ্রিয় করবার একজন বিশিষ্ট ব্যক্তি । আইভরি মার্চেন্টের চারটে ছবিতে তিনি আলোকচিত্র পরিচালক ছিলেন – ‘দ্য হাউজহোল্ডার ( ১৯৬২), শেক্সপিয়রওয়ালা (১৯৬৪), দ্য গুরু (১৯৬৮) আর বম্বে টকি ( ১৯৭০) । তিনি খুব ভালো সেতার বাজাতেন ক্যামেরার পাশাপাশি। সত্যজিৎ আর আইভরির একাধিক সিনেমার সাউন্ড ট্র্যাকের শূন্যস্থান তিনি পূর্ণ  করে দিয়েছিলেন যখন কি না পণ্ডিত রবি শঙ্কর ব্যস্ত থাকতেন অন্য কাজে ।

মূল : জেরাল্ড পিয়েরি ( ফেব্রুয়ারি ২০০০)

জেরাল্ড আমেরিকান ফিল্ম ক্রিটিক । ইউনিভার্সিটি প্রেস অফ মিসিসিপি’র সম্পাদক । হার্ভার্ড ফিল্ম আর্কাইভের সাবেক কিউরেটর ।

অনুবাদকের সংযোজন : জা রেনোয়ার ‘দ্য রিভার’ চলচ্চিত্রের শুটিং চলাকালে সত্যজিৎ রায় বিজ্ঞাপনী সংস্থা ডি যে কিমারে কাজ করতেন । সংস্থার কর্তা দিলীপ কুমার গুপ্ত অধিক পরিচিত ছিলেন ডি কে নামে । সিগনেট নামে এক প্রকাশন সংস্থা প্রতিষ্ঠা করেন । প্রচ্ছদ অলংকরণ করতেন সত্যজিৎ । সে কথা অনেকের জানা । ডি কে  প্রকাশক আর পাঠকের সম্পর্ক আরো সুন্দর করতে ‘টুকরো কথা’ বলে একটি বিনামূল্যের পত্রিকা প্রকাশ করেন। এই পত্রিকায় সাহিত্যের ধাঁধা , সিগনেটের বইয়ের বিজ্ঞাপন আর আলোচনাসহ অন্য প্রকাশকের বইয়ের কথাও থাকতো । অনেকদিন পর সমরেন্দ্র সেনগুপ্ত সম্পাদিত বিভাব পত্রিকায় সবগুলো টুকরো কথা একত্রে প্রকাশিত হয় ।   টুকরো কথা সম্পাদনা করতেন নরেশ গুহ । সুব্রত মিত্র এই পত্রিকার কথা-ই বলেছিলেন ।

অনুবাদ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Share post:

সাবস্ক্রাইব

spot_img

সম্পাদকের নির্বাচিত

আরও পড়ুন
আরও পড়ুন

‘পাণ্ডুলিপি পোড়ে না’ : ইতিহাসের দিকে যাত্রা

বই পোড়ানোর ইতিহাসের সাথে সাম্রাজ্য বিজয় এবং বিস্তারের গল্প...

বৃত্ত

“সমস্যাটা কি খুব জটিল?” ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞাসা করলেন রহমান...

স্বপ্নমঙ্গলের কথা

ফেরদৌস আরা আলীম স্বপ্নদেবের উপর শচীদেবীর আস্থা আজও অবিচল। স্বপ্নের...

কবিতা বলতে আমি যা বুঝি

কবিতা এই সময়ে কারা লেখে এবং কেন লেখে এটাই...