এই লেখাটি যখন লিখছি প্রণম্য আলোকচিত্রী রঘু রাইয়ের নশ্বর শরীর প্রকৃতির আলো বাতাসে মিশে যেতে শুরু করেছে। তাঁর শরীরের শেষের পথের যাত্রা শুরু হয়েছে। আমরা যারা ফটোগ্রাফি ভালোবাসি আমাদের আরো কিছুটা সময় লাগবে আজ ভোর বেলা কোন সম্পদ হারিয়ে গেল সেই বিষয় উপলব্ধিতে আনতে। কেবল ভারতীয় আলোকচিত্রের দুনিয়া নয়, বিশ্বের যে সাংস্কৃতিক আকাশ সেই আকাশের একটি উজ্জ্বল নক্ষত্রের জৈব শরীর নিভে গেল।
তৎকালীন অবিভক্ত ব্রিটিশ ভারতের পাঞ্জাবের ঝাং।
বর্তমান পাকিস্তানের মধ্য পাঞ্জাবের ঝাং জেলার রাজধানী শহর। চেনাব নদীর পূর্ব তীরে অবস্থিত এই প্রাচীন শহরে, মহাত্মা গান্ধীর ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনের বছর ১৯৪২ সালে রঘু রাইয়ের জন্ম৷ চেনাব নদীর ঢেউ, শহরের প্রাচীনতা ঘিরে রেখেছিলো সদা কৌতূহলী শিশু রঘুকে। বিশ বছর বয়সে, দাদা এস পল তাঁকে আলোকচিত্রের প্রাথমিক দীক্ষা দেন। তেইশ বছর বয়সে, পেশাদার আলোকচিত্রী হিসেবে যুক্ত হন গুরুত্বপূর্ণ ভারতীয় পত্রিকা ‘দ্য স্টেটসম্যান’-এ।

ছবি: ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত
তিনি কিংবদন্তি আলোকচিত্রী অঁরি কার্তিয়ের ব্রেঁসোর মতোই সাদা কালোর ইন্দ্রজালে বিশ্বাস করতেন৷ অথচ, পরবর্তী সময়ে ডিজিটাল প্রযুক্তির উৎকর্ষের সুবিধা গ্রহণেও দ্বিধাহীন ছিলেন৷ তাঁর তোলা ইন্দিরা গান্ধী মন্ত্রীসভার একটি ছবি দেখলে বুঝতে পারা যায়, নিজস্ব শৈলীর ভেতর কেমন করে নিজস্ব রাজনৈতিক বোধ তিনি সঞ্চারিত করেছিলেন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ছবি যারা তুলেছেন, প্রত্যেকেই এক রকমের ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁদের মধ্যে প্রথম সারিতেই থাকবেন রঘু রাই। ‘দ্য স্টেটসম্যান’- এর আলোকচিত্রী হিসেবে মুক্তিযুদ্ধের সময় শরণার্থী ক্যাম্পগুলোতে ঘুরে ঘুরে যে ছবি তিনি তুলেছেন তা আজ ইতিহাসের অমূল্য দলিল। তাঁর ছবিতে মুক্তিযোদ্ধাদের দৃঢ় মনোবল ও স্থির প্রতিজ্ঞার যে ছবি পাওয়া যায় তা পরবর্তী প্রজন্মকে সাহস দিয়ে যাবে অনন্তকাল৷

তিনি চলচ্চিত্র থেকে শুরু করে অন্যান্য শিল্প মাধ্যম সম্পর্কে অনন্ত আগ্রহী একজন মাটির মানুষ৷ চলচ্চিত্রকার গৌতম ঘোষের এক সংক্ষিপ্ত রচনায় আমরা জানতে পারি, ক্যামেরার বিবর্তন তাঁকে খুব আনন্দ দিত। তিনি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে বুঝতে চাইতেন ক্যামেরার যান্ত্রিক প্রকৌশল। দৈনিক পত্রিকায় আলোকচিত্রীদের পারিশ্রমিকের স্বল্পতা তাঁকে ক্ষুব্ধ করেছিলো। তিনি প্রায়ই সুহৃদ, অনুজ আলোকচিত্রীদের রাজধানী শহর দিল্লী চলে যেতে বলতেন। আমাদের দেশের আলোকচিত্রী, পলিটিক্যাল অ্যাকটিভিস্ট শহিদুল আলমের এক স্মৃতিচারণায়, রঘু রাইয়ের বন্ধুত্বপ্রবণ মনের পরিচয় আরও নিবিড় করে পাই আমরা। একদিন তাঁর ক্লাস নেয়ার সময়ে রঘু রাইয়ের উত্তেজিত স্বরের ফোন ধরে জানতে পারেন, মুক্তিযুদ্ধকালীন কিছু ছবির নেগেটিভ তিনি খুঁজে পেয়েছেন, পঁয়ত্রিশ বছর পরে। পরবর্তী সময়ে, ভারত আর বাংলাদেশ যৌথভাবে প্রকাশ করে ‘দ্য প্রাইস অফ ফ্রিডম’ নামের অমূল্য ছবির বইটি৷ সত্যজিৎ রায়, মাদার তেরেসা থেকে শুরু করে অসংখ্য স্মরণীয় মানুষের ছবি তুলেছেন তিনি। আলোকচিত্র মুহূর্তের বিষয়, মুহূর্তকে ধরে রাখা। ছবিতে রঘু রাই প্রাণ প্রতিষ্ঠা করতে পারতেন।
প্রখ্যাত কথাসাহিত্যক সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়ের এক গুরুত্বপূর্ণ বই – ভারতের শেষ ভূখন্ড। সদ্য প্রয়াত এই আলোকচিত্রীর আন্দামানের অনেজ ছবি এই বইটির গ্রন্থসজ্জায় জরুরি ভূমিকা পালন করেছিলো।

বছর দুই আগে প্রস্টেট ক্যান্সার থেকে সেরে উঠেছিলেন। পাকস্থলীতেও ক্যান্সার ছড়ায় পরে৷ দৃঢ় মনোবল তাঁকে বার বার ফিরিয়ে আনছিল। কিন্তু মাথায় ক্যান্সারের আক্রমণ বয়সের কারণেই তিনি সামাল দিতে পারেননি৷ মৃত্যু সুনির্দিষ্ট সত্য ৷ তবু মনে হয়, কিছু মানুষ আরো কিছুকাল আমাদের মধ্যে থেকে থেকে যেতে পারতেন। রঘু রাই তেমন একজন৷
নিউজ থ্রি সিক্সটি পরিবার বিশ্ব আলোকচিত্রের কিংবদন্তির প্রয়াণে গভীর শোক প্রকাশ করছে৷ তাঁর কাজের প্রতি আমর্ম শ্রদ্ধা৷


