“সমস্যাটা কি খুব জটিল?” ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞাসা করলেন রহমান সাহেব।
“তেমন না,” চশমাটা খুললেন ডা. সুনেহরা, “অপারেশন সাকসেসফুল। মস্তিষ্কের এমন জটিল অপারেশনে খুব বেশি মানুষ বাঁচে না। আপনার মেয়ের ভাগ্য সেদিক থেকে ভালোই… তবে একটু সাবধানে থাকবেন, কেমন?”
“কেন?”
“এই ধরনের অপারেশনের ফলে অনেক ধরনের উদ্ভট সাইড-ইফেক্ট দেখা যায়। সেরকম কিছু দেখলে সোজাসুজি আমার সাথে যোগাযোগ করবেন? কেমন?”
“হুম!”
“আর সাবধানে থাকবেন।”
আতিকাকে স্কুলে নামিয়ে দিয়ে অফিসের জন্য সিএনজিতে চেপে বসলেন রহমান সাহেব। ছয়মাস হয়ে গেছে সেই অপারেশনের। এখনো কোনো বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি।
ওদিকে স্কুলের গেটে দাঁড়ানো বাদামওয়ালাটার দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে আছে আতিকা। লোকটার মাথার ওপর একটা অদ্ভুত লাল বৃত্ত।
আশেপাশের যতো মানুষ, সবার মাথার ওপরেই একটা বৃত্ত। কিন্তু সেগুলো হলুদ… শুধুমাত্র ওই লোকটারই লাল।
দাঁড়িয়ে রইলো আতিকা।
খানিক বাদেই দৈত্যের মতো একটা ট্রাক ছুটে এলো… ব্রেক ফেল করেছিলো সম্ভবত… বাদামওয়ালাকে একদম পিষে দিয়ে আতিকাদের স্কুলের প্রাচীরে ধাক্কা খেয়ে থামলো সেই যন্ত্রদানব।
মাথা নাড়লো আতিকা। এটাই হয়… যাদের মাথার ওপর লাল বৃত্ত দেখা যায় তারা মারা যায়। ওই অপারেশনের পর থেকেই এই অদ্ভুত বৃত্তগুলো দেখে আতিকা। হলুদ বৃত্তের অর্থ জীবন আর লাল বৃত্তের অর্থ? মৃত্যু!
কথাগুলো কাউকে বলেনি সে। মা-বাবাকেও না… এই যুগে কে বিশ্বাস করবে এসব?
নদীর ধারে চুপচাপ বসে রয়েছে আতিকা। প্রতিদিন স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পথে এদিকে আসে ও। বন্ধু-বান্ধব তেমন নেই আতিকার। কারো সাথে সেভাবে মিশতেও পারে না। তাই একাই ঘোরে।
হুট করেই ওর নজর পড়লো সামনে দাঁড়িয়ে থাকা কয়েকটা ছেলের দিকে। ওদের সবার মাথার ওপর লাল বৃত্ত।
চুপচাপ বসে রইলো আতিকা।
একটু পরেই একটা নৌকায় উঠলো ওরা। নৌকার মাঝির মাথাতে কিন্তু সবুজ বৃত্ত। বাড়ি চলে এলো আতিকা। ও জানে, এরপর কী হবে…
পরের দিন সকালের খবরের কাগজের এক কোনায় খবর এলো-
“নদীতে নৌকা ডুবে তিন ছাত্র নিহত, মাঝি অনেক কষ্টে সাঁতরে তীরে আসে।”
“ময়না আপু, তোমার কি কোনো অসুখ আছে?” অবাক হয়ে ময়নাকে প্রশ্ন করলো আতিকা।
“না গো আফা, এই প্রশ্ন কেন?” হাসলো ময়না, “গরীর মাইনষের অসুখ অয় না!”
“নাহ এমনিই।”
আতিকাদের বাড়ির কাজের মেয়ে ময়না। বয়সের ওর চেয়ে দুই-চার বছরের বড় হবে। কাছেরই একটা বস্তিতে থাকে মেয়েটা।
ওর মাথার ওপর সেই অদ্ভুত লাল বৃত্ত!
আতিকার সাথে কথা বলে রান্নাঘরের দিকে এগিয়ে চললো ময়না… রান্নাঘরের দরজার সামনে অল্প একটু পানি পড়ে ছিলো। খেয়াল না করেই পা দিলো আহ্লাদি ময়না… পিছলে গিয়ে ওর মাথাটা ওর জোরে লাগলো দেয়ালে… তারপর মাটিতে পড়ে গেলো ময়না।
ছুটে গেলেন আতিকার মা।
“ময়না, অ্যাই ময়না,” চিৎকার করতে লাগলেন তিনি।
চুপচাপ সোফায় বসে রইলো আতিকা। ও জানে ময়না আর কখনো উঠবে না… ও মারা গেছে।
রাত দশটার মতো বাজে। সারাদিনই বলতে গেলে বৃষ্টি হয়েছে। রাস্তা-ঘাট ফাঁকা।
আতিকাদের ফ্ল্যাট ছয়তলাতে। বারান্দায় বই নিয়ে বসে আছে সে। সামনেই পরীক্ষা… বারান্দায় বসে পড়ার অভ্যাস আতিকার। অনেকেই ব্যাপারটা নিয়ে হাসে, কিন্তু কান দেয় আতিকা… এভাবে পড়েই ও মজা পায়।
হুট করেই স্ট্রিট লাইটের আলোয় অদ্ভুত একটা দৃশ্য নজরে পড়লো ওর। ওদের বিল্ডিংয়ের বামপাশের গলিয়ে ঘাপটি মেরে বসে আছে দুটো লোক… দুজনের হাতেই দুটো চাপাতি।
ওদের মাথার দিকে তাকালো সে।
নাহ, দুজনের মাথাতেই হলুদ বৃত্ত।
তখনই ও দেখতে পেলো রাস্তার অপর দিক থেকে হেঁটে আসছে পাঞ্জাবি পরা একটা লোক। ওই লোকের মাথায় লাল বৃত্ত!
আতিকার ব্যাপারটা বুঝতে বাকি রইলো না।
সাথে সাথে হাত নেড়ে ইশারা করলো সে। কিন্তু ছয়তলার বারান্দায় নজর পড়লো না লোকটার। আতিকার খুব ইচ্ছা করছিলো চিৎকার দিতে। কিন্তু তাতে তো গলিতে লুকিয়ে থাকা ওই দুই বদমাশ ওকে দেখে ফেলবে!
লোকটা ধীরে ধীরে গলির কাছে আসছে… আরো কাছে…
ঝাঁপিয়ে পড়লো সেই শয়তানদুটো। এলোপাথারি কোপাতে লাগলো লোকটাকে।
চোখে পানি এসে গেলো আতিকার… ঘরে চলে এলো সে।
অবাক হয়ে আতিকার চেয়ে দিকে আছে ফারহিন। এমনিতে ক্লাসের কোনো মেয়ের সাথেই তেমন কথা বলে না আতিকা। মেয়েরাও ওর ব্যাপারে তেমন আগ্রহ দেখায় না।
কিন্তু আজ যখন ফারহিন বাথরুমে যাবার জন্য ক্লাস থেকে বের হচ্ছে, তখনই আতিকা এসে ওর হাতটা ধরে বললো, “ফারহিন, তুই আজ ক্লাস থেকে কোথাও যাস না!”
“কীরে আজ মুখে খুব কথা ফুটেছে?” হাসলো ফারহিন।
“যাস না তুই…”
“তো বাথরুমে যাবো না? কীসব কথা বলিস!” ঝটকা মেরে আতিকাকে সরিয়ে বাথরুমে এলো ফারহিন।
ওদের স্কুলের বাথরুমগুলো খুবই পুরনো।
ছাদের প্লাস্টার অনেক জায়গাতেই খসে পড়েছে… বাথরুমে বসার আগে ফারহিন খেয়ালও করলো না যে ওর মাথা বরাবর প্লাস্টারের একটা বড় টুকরো রীতিমতো নড়ছে…
কয়েক সেকেন্ড পড়েই ভেঙে পড়লো ওটা…
ওই অবস্থাতেই মৃত্যু হলো ফারহিনের। একটু পরে স্কুলের এক আয়া গিয়ে দেখতে পেলো ওর রক্তাক্ত মৃতদেহটা।
আতিকার কথা শুনলেই ভালো করতো ফারহিন। কিন্তু ওই যে… আজকের দিনে, কে ওসব আজগুবি কথা বিশ্বাস করে?
সাত বছর পর।
আজ ভার্সিটিতে আতিকার প্রথম দিন। এখনো ও মানুষের মাথার ওপর অদ্ভুত সেই বৃত্তগুলো দেখে। অসংখ্য মানুষের মৃত্যু দেখেছে এই কয় বছরে… ব্যাপারটা অনেকটাই গা-সওয়া হয়ে গেছে ওর জন্য।
ডানদিকের একটা বেঞ্চে চুপচাপ গিয়ে বসলো আতিকা। অন্য ছাত্র-ছাত্রীরাও আসতে শুরু করেছে। মোবাইলের ফ্রন্ট ক্যামেরায় ভালো করে নিজের মুখটা দেখলো আতিকা।
শ্যামলা রঙ, একমাথা কোঁকড়া চুল, চোখে চশমা। সব মিলিয়ে অপূর্ব রূপসী বলা যায় আতিকাকে। সামনের বেঞ্চের কয়েকটা ছেলে একটু পর পরই ওর দিকে তাকাচ্ছে।
মৃদু হেসে আতিকাও একবার তাকালো ওদের দিকে… সাথে সাথেই চমকে উঠলো সে!
ছেলেগুলোর সবার মাথায় সেই অদ্ভুত লাল বৃত্ত! বামে তাকালো আতিকা… সেখানে যারা বসে আছে তাদের মাথাতেও লাল বৃত্ত!
পুরো ক্লাসের সবার মাথাতেই লাল বৃত্ত!
কয়েকটা মেয়ে ঢুকলো ক্লাসে। তাদের মাথাতেও সেই লাল বৃত্ত!
কী হতে চলেছে? ভয়ে ভয়ে মোবাইলের ফ্রন্ট ক্যামেরার দিকে তাকালো আতিকা!
রীতিমতো কেঁপে উঠলো সে… ওর মাথাতেও সেই লাল বৃত্ত! পুরো ঘরে কারো মাথাতেই হলুদ বৃত্ত নেই… ওই লাল বৃত্তের অর্থ মৃত্যু! তাহলে কী আজকেই পৃথিবীতে আতিকার শেষ দিন?
কী করবে এখন ও? সবাইকে খুলে বলবে ব্যাপারটা? কিন্তু কেউই তো ওর কথা বিশ্বাস করবে!
তার চেয়ে এক কাজ করা যায়… ক্লাস থেকে বের হয়ে যাবে ও… ক্লাসে ঢোকার একটাই দরজা রয়েছে।
দ্রুত উঠে দাঁড়ালো আতিকা…
আরে… এ কী! পুরো ক্লাসের সবাই কেন দাঁড়িয়ে গেলো? সামনের দিকে তাকালো আতিকা। লম্বা একটা লোক ক্লাসে ঢুকলো, লোকটার পরনে কোট-প্যান্ট, হাতে অ্যাটেনডেন্স খাতা।
এই লোকটা কি তবে ওদের কোর্স টিচার? একে তো কোনোভাবেই শিক্ষক মনে হয় না… কেমন যেন ধূর্ত! তখনই লোকটার মাথার ওপর নজর গেলো আতিকার… আশ্চর্য! পুরো ক্লাসে একমাত্র এই লোকটার মাথাতেই হলুদ বৃত্ত!
কেন?
“তো সবাই এসেছো?” বললো লোকটা।
“জি স্যার,” একসাথে বলে উঠলো সবাই।
“বেশ বেশ,” এই বলে অ্যাটেনডেন্স খাতাটা টেবিলে রেখে দরজাটা লাগিয়ে দিলো লোকটা।
কেমন যেন ঘোরের মধ্যে চলে গেলো আতিকা… পালানোর আর কোনো উপায় নেই… কী হবে এখন এই ঘরে?
ধীরে ধীরে অদ্ভুত এক রহস্যময় হাসি ফুটে উঠলো সেই লোকটার মুখে…
লেখক পরিচিতি- লুৎফুল কায়সারের জন্ম ১৯৯২ সালে রাজশাহীতে। রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যন্ত্রকৌশলে স্নাতক করেছেন। অবসর সময়ে লিখতে এবং অনুবাদ করতে ভালোবাসেন। বর্তমানে তিনি একটি বেসরকারী কোম্পানিতে সহকারী প্রকৌশলী(যন্ত্র) হিসাবে কর্মরত আছেন।

